একাধিক বিয়ে করার হুকুম
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।পছন্দ না হলে বিয়ে না করলে গোনাহ হবে অহংকার করা হবে?
Answer
প্রশ্ন ১: একাধিক বিয়ে কি শুধু জায়েজ নাকি না করলে গোনাহ হয়?
উত্তর:
ইসলামে একাধিক বিয়ে জায়েজ (অনুমোদিত), তবে এটি ওয়াজিব বা ফরজ নয়। অর্থাৎ, একাধিক বিয়ে না করলে কোনো গোনাহ হবে না। বরং এটি একটি শর্তসাপেক্ষ অনুমতি।
কুরআনুল কারিমের নির্দেশনা:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاِنْ خِفْتُمْ اَلَّا تُقْسِطُوْا فِى الْيَتَامٰى فَانْكِحُوْا مَا طَابَ لَكُمْ مِّنَ النِّسَآءِ مَثْنٰى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۚ فَاِنْ خِفْتُمْ اَلَّا تَعْدِلُوْا فَوَاحِدَةً ۔۔۔ "আর যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, এতিমদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে নারীদের মধ্যে থেকে যাকে তোমাদের ভালো লাগে তাকে বিয়ে করো—দুই, তিন অথবা চারটি। আর যদি আশঙ্কা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না, তবে একটি মাত্র।" (সূরা আন-নিসা: ৩)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
১. একাধিক বিয়ে জায়েজ - তবে শর্ত হলো স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার (সমান আচরণ, ভরণ-পোষণ, রাত্রি যাপন ইত্যাদি) করা। ২. একাধিক বিয়ে ওয়াজিব বা ফরজ নয় - বরং এটি একটি অনুমতি মাত্র। যদি কেউ ন্যায়বিচার করতে না পারে বলে আশঙ্কা করে, তাহলে একটি বিয়েতেই সীমাবদ্ধ থাকা উত্তম। ৩. না করলে গোনাহ নেই - একাধিক বিয়ে না করলে কোনো গোনাহ হবে না। বরং যদি ন্যায়বিচার করার সামর্থ্য না থাকে এবং একাধিক বিয়ে করে ন্যায়বিচার না করে, তাহলে সেটা গোনাহ হবে।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)《রদ্দুল মুহতার কিতাবে বলেন:
"একাধিক বিয়ে জায়েজ, তবে যদি ন্যায়বিচারের আশঙ্কা থাকে, তাহলে একটি বিয়েই উত্তম। একাধিক বিয়ে না করলে কোনো গোনাহ নেই।"
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) 《মা'আরিফুল কুরআন》এ বলেন:
"একাধিক বিয়ে একটি শর্তসাপেক্ষ অনুমতি। এটি ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুআক্কাদা কোনোটি নয়। তাই এটি না করলে গোনাহ হবে না। তবে যদি কোনো বিশেষ প্রয়োজন থাকে (যেমন: প্রথম স্ত্রী সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম, অথবা যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজে বিধবা নারীদের আশ্রয় দেওয়া), তাহলে সেটি সওয়াবের কাজ হবে।"
প্রশ্ন ২: পছন্দ না হলে বিয়ে না করলে গোনাহ হবে? অহংকার করা হবে?
উত্তর:
বিয়ে ইসলামে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত এবং পছন্দনীয় কাজ। তবে বিয়ে করা ফরজ বা ওয়াজিব নয় সবার জন্য। বিয়ের বিধান ব্যক্তির অবস্থার উপর নির্ভর করে:
বিয়ের বিধান বিভিন্ন অবস্থায়:
১. ফরজ (অবশ্য করণীয়): যদি ব্যক্তির প্রবল যৌন চাহিদা থাকে এবং বিয়ে না করলে জিনা (ব্যভিচার) করার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তার জন্য বিয়ে করা ফরজ।
২. ওয়াজিব: যদি প্রবল চাহিদা থাকে এবং বিয়ে না করলে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তাহলে বিয়ে ওয়াজিব।
৩. সুন্নত: যদি ব্যক্তির চাহিদা থাকে কিন্তু বিয়ে না করলেও হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে বিয়ে করা সুন্নত।
৪. মুবাহ (জায়েজ): যদি ব্যক্তির কোনো চাহিদাই না থাকে, তাহলে বিয়ে করা মুবাহ (অনুমোদিত)।
৫. মাকরূহ: যদি বিয়ে করলে স্ত্রীর হক (অধিকার) আদায় করা সম্ভব না হয় এবং স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে বিয়ে মাকরূহ।
পছন্দ না হলে বিয়ে না করা:
যদি কোনো ব্যক্তির বিয়েতে আগ্রহ বা পছন্দ না থাকে এবং তার জন্য বিয়ে ফরজ বা ওয়াজিব হওয়ার মতো অবস্থা না থাকে, তাহলে বিয়ে না করলে গোনাহ হবে না এবং এটি অহংকারও নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নির্দেশনা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ "হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কেননা বিয়ে দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করে। আর যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কেননা রোজা তার জন্য কামশক্তি দমনের উপায়।" (সহিহ বুখারি: ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম: ১৪০০)
হাদিসের ব্যাখ্যা: এই হাদিসে "সামর্থ্য" (الباءة) বলতে বোঝানো হয়েছে:
- বিবাহের খরচ বহনের সামর্থ্য
- স্ত্রীর অধিকার আদায়ের সামর্থ্য
- শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, বিয়ে মূলত সুন্নত। তবে যদি কেউ বিয়ে না করেও নিজেকে পবিত্র রাখতে পারে এবং তার জন্য বিয়ে ফরজ হওয়ার মতো অবস্থা না থাকে, তাহলে বিয়ে না করলে গোনাহ নেই।
অহংকারের প্রসঙ্গ:
বিয়ে না করাকে অহংকার বলা যাবে না, যদি না কেউ রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নতকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বিয়ে না করে। কিন্তু যদি কারো ব্যক্তিগত পছন্দ বা পরিস্থিতির কারণে বিয়ে না করে, তাহলে সেটি অহংকার নয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: যদি কেউ মনে করে যে, "বিয়ে করা আমার জন্য অপমানজনক" বা "বিয়ে করা নিচু কাজ" - এই ধরনের মনোভাব অহংকার হতে পারে এবং এটি গোনাহের কারণ হবে। কিন্তু সাধারণভাবে বিয়ে না করা অহংকার নয়।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
প্রশ্ন ১: একাধিক বিয়ে ইসলামে জায়েজ, তবে ফরজ বা ওয়াজিব নয়। না করলে কোনো গোনাহ নেই। তবে শর্ত হলো স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা। যদি ন্যায়বিচার করার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে একটি বিয়েতে সীমাবদ্ধ থাকাই উত্তম।
প্রশ্ন ২: পছন্দ না থাকলে বিয়ে না করলে গোনাহ হবে না, যদি না বিয়ে তার জন্য ফরজ বা ওয়াজিব হয়ে থাকে (অর্থাৎ বিয়ে না করলে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে)। সাধারণভাবে বিয়ে না করা অহংকার নয়, তবে বিয়েকে তুচ্ছ জ্ঞান করা বা নবীজীর সুন্নতকে হেয় করা অহংকার এবং গোনাহের কাজ।
আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।