পারিবারিক
Family Life · Hanafi
Question
জানি না পতিত হয়েছে কিনা তবুও রুজু করি।
এরপর হঠাৎ শুনি আমার আত্নীয়রা গুজব ছড়ায় আমার তালাক হয়ে গেছে। এবং তখন থেকেই আমার মধ্যে ভয় ও ওয়াস ওয়াসা শুরু হতে থাকে এবং চিন্তা করতে থাকি আসলেই কি তালাক হয়ে গেছে।
সেই ভয় থেকেই ভয় ও ওয়াস ওয়াসা বাড়তে থাকে এবং এভাবে তিন চার দিন অতিবাহিত হয়। এরপর অফিসে কাজ শুরু করার কিছুক্ষণ পর মনে হচ্ছে ভিতর থেকে তালাক শব্দ বের হতে চাচ্ছিল কিন্তু আমি জিকির শুরু করি। মনে হচ্ছিল আমাকে দিয়ে বলাবে কিন্তু আমি বলব না। আমার কষ্ট হচ্ছিল এবং মাথা ব্যাথাও হচ্ছিল। এভাবে প্রায় ৪/৫ ঘন্টা কাজ, জিকির ও তালাক শব্দ বের হবে এমন পরিস্থিতি অতিবাহিত হবার পর অফিসের কাজ শেষ করে একটু রিল্যাক্স হই। এরপর কেমন যেন একটা চিন্তায় ঢুকে যাই যে অতীতে আব্বা আম্মার ঝগড়া হচ্ছে ঐ মুহুর্তে আমি তালাক দিলাম মৃদু শব্দে ফিস ফিস করে বলে ফেলি এবং এই ফিসফিসানি আমি শুনি এবং ঘটনাটি ছিল ৫/৬ সেকেন্ডের মত। ততক্ষণতই আমি নিজেই নিজেকে বলি আরে আমি এসব কি বলতেছি। ভয়ে আমি স্ত্রীর সাথে চ্যাটিং বা ফোনে কথা বলতে চাইতাম না।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় --অফিসে বলা ঐ তালাক দিলাম শব্দটা সাথে সাথে মনে হয়েছিল স্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু দুই মাস পর ওষুধ গ্রহণের পর এখন দ্বিধায় আছি আসলে তালাক দিলাম শব্দটা স্ত্রীর দিকে ছিল নাকি আব্বা আম্মার ঐ ঝগড়ার প্রেক্ষাপটে ছিল।
Answer
তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: আমি আমার স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার সময় রাগের মাথায় "তালাক" বলে ফেলি। পরে অফিসে কাজ করার সময় মনে হচ্ছিল ভিতর থেকে তালাক শব্দ বের হতে চাচ্ছিল, কিন্তু আমি জিকির শুরু করি। এরপর এক সময় ফিসফিস করে "তালাক দিলাম" বলে ফেলি। এখন আমি দ্বিধায় আছি যে আসলে তালাক হয়েছে কি না?
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করতে চাই:
১. প্রথম ঘটনা: ঝগড়ার সময় "তালাক" বলা
আপনি যখন স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার সময় রাগের মাথায় "তাকে এক তালাক" বলেছেন, এটি একটি স্পষ্ট তালাক। রাগের অবস্থায় বলা তালাকও শরীয়তে কার্যকর হয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, রাগ যত তীব্রই হোক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তি তার কথা ও কাজ সম্পর্কে সচেতন থাকে, ততক্ষণ তালাক পতিত হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৭০)
তবে যদি রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে যায় বা তার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পায়, তাহলে তালাক পতিত হবে না। কিন্তু আপনার বিবরণ অনুযায়ী, আপনি সচেতন ছিলেন এবং নিজের মুখ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তালাক বলেছেন—এটি সচেতন অবস্থায় বলা হয়েছে বলে গণ্য হবে।
২. দ্বিতীয় ঘটনা: অফিসে ফিসফিস করে "তালাক দিলাম" বলা
আপনি অফিসে কাজ করার সময় ফিসফিস করে "তালাক দিলাম" বলেছেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:
- আপনি কি স্ত্রীর উদ্দেশ্যে এটি বলেছেন?
- নাকি এটি শুধু একটি চিন্তা বা ওয়াসওয়াসা ছিল?
আপনি নিজেই বলেছেন যে "মনে হচ্ছিল ভিতর থেকে তালাক শব্দ বের হতে চাচ্ছিল কিন্তু আমি জিকির শুরু করি" এবং "মনে হচ্ছিল আমাকে দিয়ে বলাবে কিন্তু আমি বলব না"। এরপর আপনি ফিসফিস করে বলে ফেলেন।
হানাফি ফিকহের নিয়ম: তালাকের জন্য নিয়ত (ইচ্ছা) অপরিহার্য। যদি কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলে তালাক শব্দ উচ্চারণ করে, তবে তালাক পতিত হবে না। কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তালাকের নিয়তে উচ্চারণ করে, তবে তালাক পতিত হবে।
আপনার বিবরণে আপনি বলেছেন: "অফিসে বলা ঐ তালাক দিলাম শব্দটা সাথে সাথে মনে হয়েছিল স্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু দুই মাস পর ওষুধ গ্রহণের পর এখন দ্বিধায় আছি আসলে তালাক দিলাম শব্দটা স্ত্রীর দিকে ছিল নাকি আব্বা আম্মার ঐ ঝগড়ার প্রেক্ষাপটে ছিল।"
৩. গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি নীতি
হানাফি ফিকহে একটি মূলনীতি হলো: স্পষ্ট তালাকের (তালাকে সরীহ) জন্য নিয়তের প্রয়োজন নেই, কিন্তু ইঙ্গিতপূর্ণ তালাকের (তালাকে কিনায়া) জন্য নিয়ত প্রয়োজন।
"তালাক দিলাম" শব্দটি স্পষ্ট তালাকের অন্তর্ভুক্ত। তবে প্রশ্ন হলো—আপনি কি এটি স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেছেন নাকি অন্য প্রসঙ্গে?
৪. আপনার অবস্থার বিশ্লেষণ
আপনার বিবরণ থেকে মনে হচ্ছে আপনি ওয়াসওয়াসা (সন্দেহপ্রবণতা) এবং অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD)-এ ভুগছেন। আপনি নিজেই বলেছেন যে তালাকের ভয় থেকে আপনার মধ্যে ওয়াসওয়াসা শুরু হয়েছে এবং বাড়তে থাকে। এমনকি আপনি ওষুধও গ্রহণ করেছেন।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেছেন: "যদি কেউ ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হয় এবং তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে কিন্তু তার নিয়ত স্পষ্ট না থাকে, তবে তালাক পতিত হবে না।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৫)
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা জরুরি:
১. প্রথম তালাক: ঝগড়ার সময় আপনি সচেতনভাবে "তাকে এক তালাক" বলেছেন—এটি পতিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। তবে আপনি বলেছেন "জানি না পতিত হয়েছে কিনা তবুও রুজু করি"—এটি ভালো উদ্যোগ।
২. দ্বিতীয় ঘটনা: অফিসে ফিসফিস করে "তালাক দিলাম" বলা—এখানে আপনার নিয়ত স্পষ্ট ছিল না। আপনি নিজেই দ্বিধায় আছেন যে এটি স্ত্রীর উদ্দেশ্যে ছিল নাকি অন্য প্রসঙ্গে। যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন এবং এটি ওয়াসওয়াসার কারণে হয়েছে, তাই এই তালাক পতিত হওয়ার বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন: "যদি কেউ তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে কিন্তু নিশ্চিত না হয় যে সে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেছে, এবং তার মধ্যে ওয়াসওয়াসা থাকে, তবে তালাক পতিত হবে না। কারণ তালাক একটি গুরুতর বিষয় এবং সন্দেহের ভিত্তিতে তা প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/৩৪৫)
৬. করণীয়
১. প্রথম তালাকের ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনি সচেতনভাবে তালাক বলেছেন, তাই এটি পতিত হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। আপনি যদি ইতিমধ্যে রুজু (ফিরিয়ে নেওয়া) করে থাকেন, তাহলে তা বৈধ হয়েছে। তবে মনে রাখবেন, এক তালাকের পর রুজু করা যায় এবং দাম্পত্য জীবন চলতে পারে।
২. দ্বিতীয় ঘটনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন এবং ওয়াসওয়াসার কারণে এটি হয়েছে, তাই এটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। তবে নিরাপদ থাকার জন্য আপনি একজন বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির সাথে পরামর্শ করুন।
৩. ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির জন্য:
- নিয়মিত নামাজ ও জিকির করুন
- কুরআন তিলাওয়াত করুন
- মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন
- প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
৪. ভবিষ্যতে সতর্কতা: রাগের সময় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা অনুসরণ করুন—দাঁড়ানো অবস্থায় থাকলে বসে পড়ুন, বসা অবস্থায় থাকলে শুয়ে পড়ুন, এবং "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন। (সুনানে আবু দাউদ, ৪৭৮২)
আল্লাহ তায়ালা আপনার অবস্থা বুঝতে সাহায্য করুন এবং আপনার দাম্পত্য জীবনকে সুখময় করুন। আমিন।