অমুসলিম গৃহ পরিচারিকার সামনে পর্দার বিধান
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
অমুসলিম গৃহ পরিচারিকার সামনে পর্দার বিধান
ভূমিকা
ইসলামে পর্দা (হিজাব) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। পর্দার ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিম নারীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অমুসলিম গৃহ পরিচারিকার সামনে পর্দার বিধান সম্পর্কে জানার আগে আমাদেরকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়টি বুঝতে হবে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিধান
কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ...
"আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের পুত্র, বোনের পুত্র, তাদের (ধর্মীয়) নারীদের অথবা তাদের মালিকানাধীন দাসীদের সামনে ছাড়া..." (সূরা আন-নূর: ৩১)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা যাদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন, তাদের মধ্যে "নিসাইহিন্না" (তাদের নিজেদের নারী) এবং "মা মালাকাত আইমানুহুন্না" (তাদের মালিকানাধীন দাসী) উল্লেখ করেছেন।
অমুসলিম নারীদের সামনে পর্দার বিধান
উপরোক্ত আয়াতে "নিসাইহিন্না" (তাদের নিজেদের নারী) বলতে কী বুঝায়—তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে:
প্রথম মত: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, "নিসাইহিন্না" বলতে শুধুমাত্র মুসলিম নারীদের বুঝানো হয়েছে। অমুসলিম নারীদের সামনে মুসলিম নারীর পর্দা করা আবশ্যক। কারণ, অমুসলিম নারীরা মুসলিম নারীদের সৌন্দর্যের বর্ণনা অমুসলিম পুরুষদের কাছে দিতে পারে।
দ্বিতীয় মত: কিছু আলেমের মতে, "নিসাইহিন্না" বলতে সকল নারীকে বুঝানো হয়েছে, তবে নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনায় রাখতে হবে।
হানাফি ফিকহের দলিল
রদ্দুল মুহতার (শামী)-এর বক্তব্য
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
"মুসলিম নারীর জন্য অমুসলিম নারীর সামনে পর্দা করা আবশ্যক। কারণ, সে (অমুসলিম নারী) তার (মুসলিম নারীর) সৌন্দর্যের বর্ণনা তাদের (অমুসলিম) পুরুষদের কাছে করতে পারে।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭০)
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি)
ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে উল্লেখ আছে:
"মুসলিম নারীর জন্য অমুসলিম নারীর সামনে পর্দা করা আবশ্যক, কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন, 'অথবা তাদের ধর্মীয় নারীদের সামনে' (নিসাইহিন্না)। এখানে 'নিসাইহিন্না' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুসলিম নারীগণ।"
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮)
ফাতাওয়া উসমানি
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেন:
"অমুসলিম নারীর সামনে মুসলিম নারীর পর্দা করা আবশ্যক। কারণ, অমুসলিম নারীকে বিশ্বস্ত মনে করা যায় না। সে মুসলিম নারীর সৌন্দর্যের বর্ণনা অমুসলিম পুরুষদের কাছে দিতে পারে। তাই মুসলিম নারীর জন্য অমুসলিম নারীর সামনে পূর্ণ পর্দা করা আবশ্যক।"
(ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৩৫)
ইমদাদুল ফাতাওয়া
হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে বলেন:
"অমুসলিম নারীরা মুসলিম নারীদের জন্য মাহরাম নয়। তাদের সামনে পর্দা করা আবশ্যক। কারণ, তারা মুসলিম নারীর সৌন্দর্যের বর্ণনা অমুসলিম পুরুষদের কাছে দিতে পারে।"
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/১৮৫)
গৃহ পরিচারিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, অমুসলিম গৃহ পরিচারিকার সামনে মুসলিম নারীর পর্দা করা আবশ্যক। কারণ:
১. অমুসলিম নারী "নিসাইহিন্না" (আমাদের ধর্মীয় নারী) এর অন্তর্ভুক্ত নয়। ২. অমুসলিম নারীরা মুসলিম নারীর সৌন্দর্যের বর্ণনা অমুসলিম পুরুষদের কাছে দিতে পারে। ৩. ইসলামে অমুসলিম নারীদেরকে বিশ্বস্ত হিসেবে গণ্য করা হয় না।
করণীয় ও বর্জনীয়
করণীয়:
- অমুসলিম গৃহ পরিচারিকার সামনে মুসলিম নারীদের পূর্ণ পর্দা করা।
- পরিচারিকার সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ না করা।
- পরিচারিকার সাথে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা পর্দার আড়াল থেকে বলা।
বর্জনীয়:
- পরিচারিকার সামনে খোলা অবস্থায় থাকা।
- পরিচারিকার সামনে সাজসজ্জা প্রদর্শন করা।
- পরিচারিকার সাথে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও মেলামেশা করা।
মাসয়ালা
১. অমুসলিম গৃহ পরিচারিকার সামনে মুসলিম নারীর পর্দা করা ফরজ (আবশ্যক)।
২. অমুসলিম পরিচারিকার সামনে মুসলিম নারী তার চেহারা, হাত, পা ইত্যাদি ঢেকে রাখবে।
৩. প্রয়োজনে কথা বলার সময় পর্দার আড়াল থেকে বলবে।
৪. যদি পরিচারিকা মুসলিম হয়ে যায়, তবে সে "নিসাইহিন্না"-এর অন্তর্ভুক্ত হবে এবং তার সামনে পর্দার বিধান শিথিল হবে।
উপসংহার
ইসলামে পর্দার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অমুসলিম গৃহ পরিচারিকার সামনে মুসলিম নারীর পর্দা করা ফরজ। কারণ, অমুসলিম নারী মুসলিম নারীর জন্য মাহরাম নয় এবং তাকে বিশ্বস্ত মনে করা যায় না। হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহে এই বিধান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই মুসলিম নারীদের উচিত অমুসলিম গৃহ পরিচারিকার সামনে পূর্ণ পর্দা করা এবং ইসলামের এই বিধান মেনে চলা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ইসলামের বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।