আত্মশুদ্ধি ও তাহাজ্জুদ

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4160
Questioner: Maymona Jahan Tanny
Question Asked: 19 Aug 2026, 11:40 AM
Reviewed & Published: 19 Aug 2026, 12:42 PM
Views: 4
Tokens: 4,329
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।১/আমি আত্মশুদ্ধি কিভাবে করতে পারি।অন্তর থেকে হিংসা বিদ্বেষ,অহংকার,মন্দ চিন্তা,কেউর সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা,এগুলো কিভাবে দূর করতে পারি,অন্তরকে কিভাবে পরিশুদ্ধ করতে পারি।
২/আমি নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়তে পারি না।আমি রাতে এশার নামাজের পর পর ঘুমিয়ে গেলেও ঘুমের কারণে নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়া হয় না।ঘুমের কারণে কোনোভাবে নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়তে পারি না।নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য আনি কি করতে পারি

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

১/ আত্মশুদ্ধি ও অন্তর পরিশুদ্ধির উপায়:

আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়ায়ে নাফস) একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এর কিছু কার্যকরী পদ্ধতি নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

ক. হিংসা-বিদ্বেষ দূর করার উপায়:

  • হিংসা (হাসাদ) একটি মারাত্মক রোগ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "হিংসা আগুন যেমন কাঠ খেয়ে ফেলে, তেমনি নেক আমল খেয়ে ফেলে।" (আবু দাউদ)
  • হিংসা দূর করার জন্য প্রথমে এটা চিনতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা যাকে যা দিয়েছেন তা তাঁরই ইচ্ছায়। কারো প্রতি হিংসা করলে নিজের ইবাদত নষ্ট হয়।
  • হিংসার বিপরীতে অন্যের জন্য কল্যাণ কামনা করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে যা নিজের জন্য পছন্দ করে।" (বুখারি ও মুসলিম)

খ. অহংকার দূর করার উপায়:

  • অহংকার (কিবর) সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও দাম্ভিকদের পছন্দ করেন না।" (সূরা নাহল: ২৩)
  • অহংকার দূর করার জন্য নিজের দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব স্মরণ করা। আমরা মাটি থেকে সৃষ্ট, আমাদের শেষ ঠিকানা কবর।
  • রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (মুসলিম)

গ. মন্দ চিন্তা ও খারাপ ধারণা দূর করার উপায়:

  • মন্দ চিন্তা দূর করার জন্য বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "স্মরণ করো আমাকে, আমি স্মরণ করবো তোমাদের।" (সূরা বাকারা: ১৫২)
  • কারো সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বিরত থাকো, নিশ্চয়ই কিছু ধারণা গুনাহ।" (সূরা হুজুরাত: ১২)
  • কারো সম্পর্কে খারাপ ধারণা মনে এলে তার জন্য ভালো দোয়া করা এবং নিজেকে ব্যস্ত রাখা।

ঘ. অন্তর পরিশুদ্ধির সাধারণ পদ্ধতি:

  • নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার: প্রতিদিন অন্তত ১০০ বার "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়া।
  • নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থসহ বুঝে পড়া: ইমাম গাযযালী (রহ.) বলেছেন, কুরআন তিলাওয়াত অন্তরকে আলোকিত করে।
  • নফল ইবাদত: নিয়মিত নফল নামাজ, রোজা, দান-সদকা করা।
  • সৎ সঙ্গী নির্বাচন: ভালো মানুষের সাহচর্য অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সৎ সঙ্গী হলো আতর বিক্রেতার মতো, সে তোমাকে আতর দেবে অথবা তার সুগন্ধি তোমাকে প্রভাবিত করবে।" (বুখারি ও মুসলিম)
  • মৃত্যুর স্মরণ: বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে দুনিয়ার মোহ ও অহংকার কমে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা বেশি বেশি লেজ্জাতের ধ্বংসকারী (মৃত্যু) স্মরণ করো।" (তিরমিজি)

২/ নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ার উপায়:

তাহাজ্জুদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত। ঘুমের কারণে নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়া না হলে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন:

ক. ঘুমানোর আগে নিয়ত করা: ঘুমানোর আগে দৃঢ় নিয়ত করুন যে, আপনি তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য উঠবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি রাতে ঘুমানোর সময় নিয়ত করে যে, সে তাহাজ্জুদ পড়বে, তারপর ঘুমিয়ে যায়, তার জন্য তার নিয়তের সওয়াব লেখা হয় এবং তার ঘুমও তার জন্য সদকা হয়ে যায়।" (নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)

খ. অ্যালার্ম ব্যবহার করা: ঘুমানোর আগে মোবাইল বা ঘড়িতে অ্যালার্ম সেট করুন। রাতের শেষ তৃতীয়াংশে (তাহাজ্জুদের সময়) অ্যালার্ম দিন।

গ. এশার পরপর না ঘুমানো: এশার নামাজের পরপর ঘুমালে তাহাজ্জুদ উঠা কঠিন হয়। কিছু সময় জাগ্রত থাকুন, কুরআন তিলাওয়াত করুন বা জিকির করুন, তারপর ঘুমান। এতে ঘুম গভীর হবে না এবং উঠতে সুবিধা হবে।

ঘ. বেশি খাবার না খাওয়া: রাতে বেশি খেলে ঘুম গভীর হয়। তাই রাতে হালকা খাবার খান।

ঙ. কুনুতুল ওয়িতর ও দোয়া: বিশেষ দোয়া আছে তাহাজ্জুদে উঠার জন্য। ঘুমানোর আগে এই দোয়া পড়ুন: اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ نَفْسِي إِلَيْكَ وَوَجَّهْتُ وَجْهِي إِلَيْكَ وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ "আল্লাহুম্মা আসলামতু নাফসী ইলাইকা ওয়া ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহী ইলাইকা ওয়া ফাওওয়াদতু আমরী ইলাইকা" (আমি আমার নফসকে আপনার কাছে সোপর্দ করলাম, আমার চেহারা আপনার দিকে ফিরালাম, আমার কাজ আপনার কাছে সমর্পণ করলাম)

চ. ধারাবাহিকতা বজায় রাখা: প্রথমে সপ্তাহে ২-৩ দিন তাহাজ্জুদ পড়ার চেষ্টা করুন। ধীরে ধীরে বাড়ান। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আল্লাহর কাছে সেই আমল সবচেয়ে প্রিয়, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।" (বুখারি ও মুসলিম)

ছ. পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা: পরিবারের কাউকে বলুন, আপনাকে তাহাজ্জুদের সময় ডেকে দিতে।

জ. ঘুমানোর আগে অজু করা: ঘুমানোর আগে অজু করে ঘুমালে ফেরেশতারা আপনার জন্য দোয়া করেন এবং ঘুম থেকে উঠতে সহজ হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা যখন ঘুমাতে যাও, তখন অজু করো যেমন নামাজের জন্য অজু করো।" (বুখারি)

মনে রাখবেন: তাহাজ্জুদ পড়া সুন্নত, ফরজ নয়। তাই যদি কোনো কারণে পড়া না হয়, তাতে গুনাহ নেই। তবে নিয়মিত পড়ার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা সহজ করে দেবেন ইনশাআল্লাহ।

দলিলভিত্তিক রেফারেন্স:

  • সূরা হুজুরাত: ১২
  • সূরা নাহল: ২৩
  • সূরা বাকারা: ১৫২
  • সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
  • আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
  • বাহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
  • মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে আত্মশুদ্ধি ও নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.