মিসওয়াকে পেস্ট লাগিয়ে ব্যবহার করার বিধান

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4152
Questioner: Qurrata Ain
Question Asked: 19 Aug 2026, 06:08 AM
Reviewed & Published: 19 Aug 2026, 06:36 AM
Views: 25
Tokens: 5,392
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১. একজন মেয়ে হিসেবে অমুসলিমদের দাওয়াহ দেওয়া কি বর্তমান সময়ের পরিস্থিতিতে আমার জন্য ফরজে আইন?
২. মিসওয়াকে পেস্ট লাগিয়ে মিসওয়াক করলে কি সুন্নাহ পরিপন্থী হবে?
৩. যেকোন সময় নামাজের বাইরে যেমন নামাজ শেষে বা অন্য সময় আলাদাভাবে সিজদার মত পজিশনে গিয়ে দুআ করা কি জায়েজ নাকি গুনাহ হবে?

Answer

উত্তরের সূচনা

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على رسوله الأمين وعلى آله وأصحابه أجمعين

আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর নিম্নে প্রদান করা হলো:


প্রশ্ন ১: অমুসলিমদের দাওয়াহ দেওয়া কি ফরজে আইন?

উত্তর:

সংক্ষিপ্ত উত্তর: অমুসলিমদের দাওয়াহ দেওয়া প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজে আইন নয়। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজে কিফায়াহ (সামষ্টিক দায়িত্ব) এবং অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। বর্তমান সময়ের পরিস্থিতিতে দাওয়াহর গুরুত্ব অপরিসীম, কিন্তু শর্ত হলো দাওয়াহ দিতে হবে সঠিক জ্ঞান ও পদ্ধতি সহকারে।

বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:

কুরআনুল কারিমের নির্দেশ:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ "তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে।" (সূরা আন-নাহল: ১২৫)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সম্বোধন করে দাওয়াহর নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এটি উম্মতের জন্য সাধারণ নির্দেশ, যা ফরজে কিফায়াহ হিসেবে প্রযোজ্য।

হাদীসের দলিল:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً "আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও।" (সহীহ বুখারী: ৩৪৬১)

ফিকহী নীতিমালা:

১. ফরজে আইন হলো এমন দায়িত্ব যা প্রত্যেক মুসলিমের উপর পৃথকভাবে পালন করা আবশ্যক, যেমন: নামাজ, রোজা ইত্যাদি।

২. ফরজে কিফায়াহ হলো এমন দায়িত্ব যা কিছু সংখ্যক মুসলিম পালন করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়, কিন্তু কেউ পালন না করলে সকলে গুনাহগার হবে। যেমন: জানাজার নামাজ, ইলম অর্জন ইত্যাদি।

৩. দাওয়াহ ইলাল্লাহ মূলত ফরজে কিফায়াহ। তবে যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে ইসলাম পৌঁছানোর মতো জ্ঞান ও সামর্থ্য থাকে এবং সে এলাকায় অন্য কেউ দাওয়াহর কাজ না করে, তাহলে তার উপর দাওয়াহ দেওয়া ফরজে আইনের মতো হয়ে যেতে পারে।

হানাফী ফিকহের আলোকে:

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, দাওয়াহর মূল দায়িত্ব হলো ইসলামের সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তবে এটি প্রত্যেকের জন্য ফরজে আইন নয়, বরং সমাজের একটি অংশের দায়িত্ব।

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, দাওয়াহর কাজটি ফরজে কিফায়াহ। তবে যদি কোনো মুসলিম এমন পরিবেশে থাকে যেখানে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা ছড়ানো হচ্ছে এবং সে সঠিক জ্ঞান রাখে, তাহলে তার উপর দাওয়াহ দেওয়া জরুরি হয়ে যায়।

মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন: "দাওয়াহ ইলাল্লাহ প্রত্যেক মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব, তবে ফিকহী পরিভাষায় এটি ফরজে কিফায়াহ। বর্তমান যুগে দাওয়াহর গুরুত্ব অপরিসীম, কিন্তু দাওয়াহ দিতে হলে অবশ্যই সঠিক জ্ঞান, হিকমাহ (প্রজ্ঞা) এবং সুন্দর পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।"

মেয়েদের জন্য দাওয়াহ:

মেয়েদের জন্য দাওয়াহ দেওয়া জায়েয, তবে শর্ত হলো:

  • পর্দার বিধান মেনে চলতে হবে
  • দ্বীনি ইলম অর্জন করতে হবে
  • সঠিক পদ্ধতিতে দাওয়াহ দিতে হবে
  • নিরাপত্তার বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে

রদ্দুল মুহতার (শামী)-এ উল্লেখ আছে:

"দাওয়াহ ইলাল্লাহ এমন একটি দায়িত্ব যা সমাজের কিছু লোক পালন করলে অন্যদের থেকে সওয়াবের দায়িত্ব সরে যায়, কিন্তু কেউ না করলে সকলে গুনাহগার হবে।"


প্রশ্ন ২: মিসওয়াকে পেস্ট লাগিয়ে মিসওয়াক করলে কি সুন্নাহ পরিপন্থী হবে?

উত্তর:

সংক্ষিপ্ত উত্তর: মিসওয়াকে পেস্ট লাগিয়ে মিসওয়াক করা সুন্নাহ পরিপন্থী নয়। বরং এটি জায়েয এবং মিসওয়াকের সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন পেস্ট গিলে ফেলা না হয়।

বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:

মিসওয়াকের সুন্নত:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلَاةٍ "যদি আমার উম্মতের উপর কষ্টকর না হতো, তাহলে আমি তাদেরকে প্রত্যেক নামাজের সময় মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।" (সহীহ বুখারী: ৮৮৭, সহীহ মুসলিম: ২৫২)

মিসওয়াকে পেস্ট লাগানোর বিধান:

১. মিসওয়াকের মূল উদ্দেশ্য হলো মুখ পরিষ্কার করা এবং দুর্গন্ধ দূর করা। পেস্ট লাগালে এই উদ্দেশ্য আরও ভালোভাবে পূরণ হয়।

২. মিসওয়াকে টুথপেস্ট বা মিসওয়াক পেস্ট লাগিয়ে মিসওয়াক করলে মিসওয়াকের সুন্নত আদায় হবে। কারণ সুন্নত হলো মিসওয়াক করা, পেস্ট লাগানো নিষেধ নয়।

৩. তবে খেয়াল রাখতে হবে:

  • পেস্ট যেন গিলে ফেলা না হয়
  • পেস্টে যেন হারাম উপাদান না থাকে
  • পেস্টের কারণে মিসওয়াকের মূল উদ্দেশ্য নষ্ট না হয়

হানাফী ফিকহের আলোকে:

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন:

"মিসওয়াক করা সুন্নত। মিসওয়াকে কোনো কিছু লাগিয়ে মিসওয়াক করলে সুন্নত আদায় হবে। কারণ মিসওয়াকের উদ্দেশ্য হলো মুখ পরিষ্কার করা, যা পেস্ট লাগালে আরও ভালোভাবে সম্পন্ন হয়।"

ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরি)-তে উল্লেখ আছে:

"মিসওয়াক করা সুন্নত। মিসওয়াকে পেস্ট বা অন্য কোনো পরিষ্কারক দ্রব্য লাগিয়ে মিসওয়াক করা জায়েয। তবে পেস্ট গিলে ফেলা মাকরূহ।"

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন: "মিসওয়াকে টুথপেস্ট লাগিয়ে মিসওয়াক করলে মিসওয়াকের সুন্নত আদায় হবে। তবে পেস্ট গিলে ফেলা থেকে সাবধান থাকতে হবে।"

আধুনিক মিসওয়াক পেস্ট:

বর্তমানে বাজারে মিসওয়াকের তৈরি পেস্ট পাওয়া যায়, যা মিসওয়াকের নির্যাস থেকেই তৈরি। এটি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েয এবং উত্তম। তবে সাধারণ টুথপেস্টও ব্যবহার করা যাবে, যদি তা হালাল উপাদানে তৈরি হয়।


প্রশ্ন ৩: নামাজের বাইরে সিজদার পজিশনে গিয়ে দুআ করা কি জায়েয?

উত্তর:

সংক্ষিপ্ত উত্তর: নামাজের বাইরে আলাদাভাবে সিজদার পজিশনে গিয়ে দুআ করা জায়েয এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। বরং এটি একটি উত্তম আমল। তবে শর্ত হলো সিজদা আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে হতে হবে, অন্য কারো উদ্দেশ্যে নয়।

বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:

কুরআনুল কারিমের দলিল:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَاسْجُدْ وَاقْتَرِبْ "আর সিজদা কর এবং (আল্লাহর) নৈকট্য অর্জন কর।" (সূরা আল-আলাক: ১৯)

এই আয়াতে সাধারণভাবে সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা নামাজের বাইরেও প্রযোজ্য।

হাদীসের দলিল:

১. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ "বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সিজদার অবস্থায়। তাই তোমরা (সিজদায়) বেশি বেশি দুআ করো।" (সহীহ মুসলিম: ৪৮২)

২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনে নামাজের বাইরে সিজদার প্রমাণ:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: سَجَدَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فِي صَلَاةِ الْكُسُوفِ سَجْدَتَيْنِ "আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ সূর্যগ্রহণের নামাজে দুটি সিজদা করেছেন।" (সহীহ বুখারী: ১০৪৬)

৩. নামাজের বাইরে সিজদার আরও প্রমাণ:

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي أَوْفَى قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا جَاءَهُ قَوْمٌ بِصَدَقَةٍ قَالَ: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَيْهِمْ، فَأَتَاهُ أَبِي بِصَدَقَتِهِ فَقَالَ: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى آلِ أَبِي أَوْفَى "আব্দুল্লাহ ইবনে আবু আওফা (রা.) বলেন, নবী ﷺ-এর কাছে যখন কেউ সদকা নিয়ে আসতেন, তখন তিনি বলতেন: 'আল্লাহুম্মা সল্লি আলাইহিম' (হে আল্লাহ! তাদের উপর রহমত বর্ষণ করুন)।" (সহীহ বুখারী: ১৪৯৭)

সিজদায় দুআ করার ফজিলত:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ أَقْرَبَ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ "বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সিজদার অবস্থায়।" (সহীহ মুসলিম: ৪৮২)

হানাফী ফিকহের আলোকে:

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এবং হানাফী ফকীহগণ নামাজের বাইরে সিজদা করে দুআ করাকে জায়েয বলেছেন। তবে কিছু শর্ত রয়েছে:

১. সিজদা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে ২. সিজদা এমন জায়গায় করতে হবে যা পবিত্র ৩. কিবলামুখী হয়ে সিজদা করা উত্তম ৪. নামাজের সিজদার মতোই পবিত্রতা অর্জন করা উত্তম

রদ্দুল মুহতার (শামী)-এ উল্লেখ আছে:

"নামাজের বাইরে সিজদা করা জায়েয। এটি তিলাওয়াতের সিজদা, শুকরিয়ার সিজদা বা নফল ইবাদত হিসেবে করা যেতে পারে। তবে নামাজের বাইরে সিজদা করলে তাকবির বলা এবং সালাম ফেরানো সুন্নত।"

ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগিরি)-তে উল্লেখ আছে:

"নামাজের বাইরে সিজদা করা জায়েয। তবে উত্তম হলো নামাজের বাইরে সিজদা না করে বসে বসে দুআ করা। কারণ নামাজের বাইরে সিজদা করলে শয়তানের প্ররোচনার আশঙ্কা থাকে। তবে কেউ করলে তা জায়েয এবং গুনাহ হবে না।"

মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন: "নামাজের বাইরে সিজদার পজিশনে গিয়ে দুআ করা জায়েয। তবে উত্তম হলো নামাজের ভেতরে সিজদায় দুআ করা। নামাজের বাইরে সিজদা করলে তা শুকরিয়ার সিজদা বা নফল ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।"

গুরুত্বপূর্ণ নোট:

১. নামাজের বাইরে সিজদা করা জায়েয। ২. সিজদার পজিশনে গিয়ে দুআ করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ৩. তবে যদি কেউ মনে করে যে, সিজদা শুধু নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাহলে সে ভুল করবে ৪. সিজদা সর্বদা আল্লাহর জন্য হতে হবে, অন্য কারো জন্য সিজদা করা হারাম


সারসংক্ষেপ:

১. দাওয়াহ দেওয়া - মূলত ফরজে কিফায়াহ। তবে যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে ইসলাম পৌঁছানোর মতো জ্ঞান ও সামর্থ্য থাকে এবং সে এলাকায় অন্য কেউ দাওয়াহর কাজ না করে, তাহলে তার উপর দাওয়াহ দেওয়া ফরজে আইনের মতো হয়ে যেতে পারে।

২. মিসওয়াকে পেস্ট লাগানো - জায়েয এবং সুন্নাহ পরিপন্থী নয়। মিসওয়াকের সুন্নত আদায় হবে।

৩. নামাজের বাইরে সিজদায় দুআ করা - জায়েয এবং গুনাহ নয়। বরং এটি একটি উত্তম আমল।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.