যাকাত, ফিতরা, কুরবানি প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার বিয়ে হয়েছে ২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। বিয়েতে মোহরানা বাবদ শশুরবাড়ি থেকে পাঁচ ভরি স্বর্ণ এবং বাবার বাড়ি থেকেও প্রায় পাঁচ ভরি স্বর্ণ পাই।
এর মধ্যে শশুরবাড়ি থেকে প্রাপ্ত স্বর্ণগুলোর একটা অংশ পরিবর্তন করে আনায় স্বর্ণের পরিমাণ একটু কমে "৪ ভরি+" হয় এবং সাথে ৫২০০ টাকা নগদ পাই।
আর আমার বাবার ইনকাম সোর্স সুদ সম্পৃক্ত হওয়ায় বাবার বাড়ি থেকে দেওয়া স্বর্ণের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ হারাম অর্থের।
মূল কথা এখন আমার কাছে ওই স্বর্ণগুলো রয়েছে সাথে ৫২০০ টাকা রয়েছে। এছাড়া আমার হাজব্যান্ড মাসিক হাতখরচ বাবদ কিছু দিয়ে থাকেন সেগুলোর কিছু জমা আছে। আর ঈদে কিছু সালামি পেয়েছি সেগুলোর টাকা আছে।
১. এই অবস্থায় আমার ওপর কি যাকাত আসে? এলে কীভাবে আসে এবং আদায়ের জন্য কী উপায় রয়েছে (যেহেতু হাতে যাকাত আদায়ের জন্য পর্যাপ্ত নগদ অর্থ নেই) একটু বুঝিয়ে বললে উপকৃত হতাম ইন শা আল্লাহ।
২. হারাম স্বর্ণগুলোর ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে? উল্লেখ্য, দুই পরিবারেই নিকটাত্মীয়দের অবস্থা এমন যে সেগুলো বিক্রি করে দিতে চাইলে সমস্যা তৈরি করবে।
৩. আমার ওপর কি ফিতরা ওয়াজিব হয়েছিলো?( উল্লেখ্য, ঈদুল ফিতরের সময় হাতে টাকা বলতে শুধুমাত্র হাজব্যান্ড এর দেওয়া হাতখরচ এর টাকাগুলো ছিলো, কারণ স্বর্ণ পরিবর্তন করা হয়েছে তার পরবর্তী সময়ে)
৪. আমার ওপর কি কুরবানি করা জরুরি?
সেক্ষেত্রেও কীভাবে সেটা আদায় করা যেতে পারে বললে ভালো হয় ইন শা আল্লাহ।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি স্মরণ করিয়ে নিই:
- যাকাত, ফিতরা ও কুরবানি—সবই ফরজ/ওয়াজিব হয় শুধুমাত্র হালাল মালের উপর। হারাম মালের কোনো ইবাদত আদায় হয় না, বরং তা থেকে নিষ্পত্তি করতে হবে।
- মোহর হিসেবে প্রাপ্ত স্বর্ণ (শ্বশুরবাড়ি থেকে) সম্পূর্ণ হালাল ও আপনার মালিকানাধীন। এটি যাকাত, ফিতরা ও কুরবানির হিসাবে গণ্য হবে।
- বাবার কাছ থেকে পাওয়া স্বর্ণ যদি নিশ্চিতভাবে সুদযুক্ত হারাম উপার্জন থেকে হয়, তবে তা আপনার জন্য বৈধ নয়; আপনাকে তা সাদাকাহ করে দিতে হবে।
প্রশ্নগুলোর উত্তর নিচে দেয়া হলো:
১. যাকাতের বিধান
উত্তর:
যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হলো: মাল হালাল হওয়া, নেসাব পরিমাণ থাকা (৭.৫ ভরি বা ৮৭.৪৮ গ্রাম স্বর্ণের মূল্য), এবং চান্দ্রবর্ষ পূর্ণ হওয়া।
আপনার হালাল সম্পদ:
- স্বর্ণ: শ্বশুরবাড়ি থেকে পরিবর্তনকৃত ৪ ভরি+ (ধরা যাক ৪.৫ ভরি)
- নগদ: ৫,২০০ টাকা + স্বামীর হাতখরচ জমা + ঈদের সালামি (মোট টাকার পরিমাণ জানা নেই, ধরে নিচ্ছি কিছু আছে)
হিসাব:
- বর্তমান বাজারমূল্যে (ধরা যাক ১ ভরি স্বর্ণের মূল্য ১ লক্ষ টাকা) ৪.৫ ভরি স্বর্ণের মূল্য = ৪,৫০,০০০ টাকা।
- আপনার হাতে থাকা নগদ (৫,২০০+অন্যান্য) ধরুন ১০,০০০ টাকা।
- মোট হালাল সম্পদ: ৪,৫০,০০০ + ১০,০০০ = ৪,৬০,০০০ টাকা।
সুতরাং আপনি নেসাব পরিমান সম্পদের মালিক, তাই বছর পূর্ণ হলে আপনার উপর যাকাত ফরজ।
২. হারাম স্বর্ণের ব্যবস্থা
উত্তর:
বাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত স্বর্ণ (প্রায় ৫ ভরি) যেহেতু সুদযুক্ত উপার্জন থেকে কেনা, তাই তা আপনার জন্য হারাম। এর শরয়ি বিধান:
- উত্তম পদ্ধতি: স্বর্ণটি গলিয়ে বা অলংকারের আকৃতি পরিবর্তন করে কোনো গরিব মুসলিমকে সাদাকাহ করে দিন।
- বিকল্প: যদি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন হয়, তবে আপনি এটি নিজে ব্যবহার করবেন না, বরং নাম প্রকাশ না করে কোনো নির্ভরযোগ্য সাদাকাহ প্রতিষ্ঠান (যেমন এতিমখানা, মাদরাসা) অথবা প্রতিবেশী গরিবকে দিয়ে দিন।
- মনে রাখবেন: এই স্বর্ণ বিক্রি করে টাকা নিজের কাজে লাগানো যাবে না। বিক্রি করলেও পুরো টাকা সাদাকাহ করতে হবে।
- সতর্কতা: বাবাকে জানিয়ে না দিলেও চলবে, তবে হারাম মাল নিজে ভোগ করা যাবে না।
(সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৫৩৪; রদ্দুল মুহতার, ৪/২৪১; ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২৪০)
৩. ফিতরা ওয়াজিব ছিল কি?
উত্তর:
ঈদুল ফিতরের দিন ফজর শুরু হওয়ার সময় যার কাছে নেসাব পরিমাণ হালাল সম্পদ থাকে (প্রয়োজনের অতিরিক্ত), তার উপর ফিতরা ওয়াজিব হয়।
আপনার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব।
(সূত্র: বেহেশতি জেওর, ফিতরা অধ্যায়; ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪৭৫)
৪. কুরবানি করা জরুরি কি?
উত্তর:
কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত: ঈদুল আজহার (১০ জিলহজ) তারিখে নেসাব পরিমাণ হালাল সম্পদের মালিক হওয়া।
বর্তমানে আপনার হালাল সম্পদ (৪.৫ ভরি স্বর্ণ + ৫,২০০ টাকা + জমা টাকা) যাহা নেসাব পরিমান।
তাই **আপনার ওপর কুরবানি ওয়াজিব।
- টাকা না থাকলে স্বর্ণ বিক্রি করে টাকা জোগাড় করতে পারেন। কিন্তু হারাম স্বর্ণ থেকে কুরবানি করা যাবে না।
(সূত্র: হিদায়া, ৩/৩২৫; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২২)
আল্লাহ তাআলা আপনার মালকে হালাল করে দিন এবং বরকত দান করুন।