অন্য কারো মাছ খেয়ে ফেললে কীভাবে দাম পরিশোধ করবেন?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
একজনের একটি পুকুর সেখানে অন্য একজন নেট জালের মধ্যে মাছের পোনা রেখেছিলো কয়েকদিন পরে উঠিয়ে বিক্রি করবে এজন্য। তো হঠাৎ রাতে ঝড় ওঠায় মাছের পোনা গুলো পুকুরের পানিতে চলে যায়। এর বেশ কিছু দিন পরে মাছ কিছুটা বড়ো হলে,যাদের মাছের পোনা চলে গেছিলো তারা ছিপ ফেলে রাখে মাছ ধরার জন্য। উক্ত পুকুরের মালিকের অনুমতি নিয়েছিলো কিনা সেটা জানি না। তো ছিপে মাছ বিধলে মাছটা ছিপ নিয়ে পুকুরের তলদেশে চলে যায়। অন্য একজন ব্যক্তি ছিপসহ মাছটা পেয়ে উক্ত ছিপ ওয়ালাকে না জানিয়ে মাছটা রান্না করে খেয়ে ফেলেন। যিনি মাছটা খেয়েছেন তার সন্তান এর দাম পরিশোধ করে দিতে চান যাতে করে তার পিতা মাতাকে আল্লাহ্ ক্ষমা করে দেন। এমতাবস্থায় কিভাবে সে এই মাছের দাম টা পরিশোধ করবেন.?
উক্ত পুকুরের মালিক ও মাছের পোনার মালিকের কাছে এই বিষয়ে জানতে বা জানাতে গেলে ফিতনার আশঙ্কা করছেন। যেহেতু তারা কেউই এই বিষয়ে জানেন না। আর মাছের পোনার মালিক যদি পুকুর মালিকের অনুমতি না নিয়ে থাকেন তাহলে এখানেও ঝগড়া বা ফিতনার আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় কিভাবে এই মাছের দাম পরিশোধ করে আল্লাহর কাছে অভিযোগ মুক্ত হওয়া যাবে.?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি অন্যের পুকুরে মাছের পোনা রেখেছিলেন (অনুমতি নিয়ে বা না নিয়ে), পরে ঝড়ে সেই পোনা পুকুরে মিশে যায়। এরপর ছিপ দিয়ে মাছ ধরার সময় একটি মাছ ছিপসহ হারিয়ে যায় এবং অন্য একজন তা পেয়ে রান্না করে খেয়ে ফেলেন। এখন সেই মাছের দাম কীভাবে পরিশোধ করতে হবে, তা জানতে চেয়েছেন।
হানাফি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী:
১. মাছের মালিকানা নির্ধারণ:
- যদি মাছের পোনার মালিক পুকুরের মালিকের অনুমতি নিয়ে পোনা রেখে থাকেন, তাহলে সেই পোনা থেকে উৎপন্ন মাছের মালিক পোনার মালিকই হবেন। কারণ, পুকুরে পোনা রাখার অনুমতি নেওয়ার অর্থ হলো সেখানে মাছ চাষের অনুমতি নেওয়া।
- যদি অনুমতি ছাড়া পোনা রাখা হয়ে থাকে, তাহলে পুকুরের মালিকের অনুমতি ছাড়া অন্য কারো সম্পদ তার পুকুরে রাখা জায়েজ নয়। তবে মাছের পোনা যেহেতু পুকুরে মিশে গেছে এবং সেখানে বড় হয়েছে, এতে পুকুরের মালিকেরও কিছুটা অংশ থাকতে পারে। কিন্তু শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, যে ব্যক্তি পোনা রেখেছিল, সে যদি প্রমাণ করতে পারে যে পোনা তার ছিল, তাহলে মাছের মালিক সে-ই হবে। তবে পুকুরের মালিকের অনুমতি ছাড়া পোনা রাখার কারণে সে গুনাহগার হবে এবং পুকুর ব্যবহারের জন্য পুকুরের মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
২. মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে:
- যে ব্যক্তি ছিপসহ মাছটি পেয়ে তা রান্না করে খেয়ে ফেলেছেন, তিনি যদি জানতেন না যে এটি কারো সম্পদ, তাহলে তার ওপর গুনাহ নেই, তবে তাকে মূল্য পরিশোধ করতে হবে। কারণ, অন্যের সম্পদ ভুলবশত হলেও খাওয়া জায়েজ নয় এবং মূল্য পরিশোধ করা ফরজ।
- যেহেতু মাছটি ছিপসহ ছিল, ছিপের মালিকও মাছের ওপর দাবি রাখতে পারেন। তবে মাছটি যদি ছিপ থেকে ছুটে গিয়ে অন্য কেউ পেয়ে থাকে, তাহলে ছিপের মালিক মাছের মালিক নন, বরং মাছের প্রকৃত মালিকই মাছের দাবিদার।
৩. দাম পরিশোধের নিয়ম:
- যিনি মাছটি খেয়েছেন, তার সন্তান যদি পিতার পক্ষ থেকে দাম পরিশোধ করতে চান, তাহলে তাকে মাছের প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করে তার কাছে মাছের মূল্য পরিশোধ করতে হবে। যদি মাছের মালিক জানা না যায়, তাহলে সাদকা করে দিতে হবে।
- কিন্তু এখানে মাছের মালিক কে, তা নির্ধারণ করা জরুরি। মাছের পোনার মালিক যদি পুকুরের মালিকের অনুমতি নিয়ে পোনা রেখে থাকেন, তাহলে মাছের মালিক তিনি। আর যদি অনুমতি না নিয়ে থাকেন, তাহলেও মাছের মালিক তিনি, তবে পুকুরের মালিকের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং পুকুর ব্যবহারের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
পুকুরের মালিকের খোঁজ পাওয়া গেলে তার জীবদ্দশায় এই টাকা তার কাছেই পৌঁছাতে হবে। প্রয়োজনে তার ব্যাংক একাউন্টে বা বিকাশ নগদে পাঠিয়ে দিতে হবে।
৪. পুকুরের মালিকের অংশ:
- পুকুরের মালিক যদি মাছের পোনা রাখার অনুমতি না দিয়ে থাকেন, তাহলে পুকুরের মালিকেরও কিছু অংশ প্রাপ্য হতে পারে। কারণ, তার পুকুরে মাছ বড় হয়েছে। তবে যেহেতু পোনা অন্য কারো ছিল, তাই মাছের মালিক পোনার মালিকই হবেন। পুকুরের মালিক শুধু পুকুর ব্যবহারের জন্য ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।
সারসংক্ষেপ:
- মাছের প্রকৃত মালিক হলেন মাছের পোনার মালিক। তাকে মাছের মূল্য পরিশোধ করতে হবে।
- পুকুরের মালিকের অনুমতি ছাড়া পোনা রাখা হয়ে থাকলে, পুকুরের মালিকের কাছেও ক্ষমা চাইতে হবে এবং পুকুর ব্যবহারের জন্য প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
পুকুরের মালিকের খোঁজ পাওয়া গেলে তার জীবদ্দশায় এই টাকা তার কাছেই পৌঁছাতে হবে। প্রয়োজনে তার ব্যাংক একাউন্টে বা বিকাশ নগদে পাঠিয়ে দিতে হবে।
দলিল:
- কুরআন: "আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেন যে, আমানতসমূহ তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
- হাদিস: "অন্যের সম্পদ ব্যবহার করা তার অনুমতি ছাড়া জায়েজ নয়।" (সুনানে আবু দাউদ)
- ফতোয়ায়ে শামী: "যে ব্যক্তি অন্যের জিনিস ভুলবশত খেয়ে ফেলে, তার ওপর মূল্য পরিশোধ করা ওয়াজিব।" (রদ্দুল মুহতার, ৫:১০২)