উমারহ্ যাওয়ার আগে পিরিয়ড হলে করণীয়

Hajj and Umrah · Hanafi

Question No: 4138
Questioner: Nl A
Question Asked: 18 Aug 2026, 08:35 PM
Reviewed & Published: 18 Aug 2026, 08:56 PM
Views: 47
Tokens: 5,705
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার কালকে ভোরেই উমরাহ এর ফ্লাইট। কিন্তু আজই আমার পিরিয়ড শুরু হয়ে গিয়েছে। এখন আমার করণীয় কি? প্লেনে তো মিকাত মসজিদের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় ইহরাম বাঁধতে হবে, আমি কি তখন ইহরাম বাঁধবো? কিভাবে সেটা করবো? এছাড়াও, আমার নরমালি ৬ দিন পিরিয়ড চলে এবং ৭ দিনে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাই। তবে ৫ এবং ৬ নং দিনে খুবই কম ব্লাড যায়, কম মানে খুবই কম! বোঝাও যায় না তেমন একটা। তাহলে আমি কখন থেকে তাওয়াফ করতে পারবো? ৫/৬ নং দিন থেকে কি শুরু করতে পারবো? নাকি ৭ নং দিন হতেই শুরু করতে হবে? আর পিরিয়ড চলাকালীন দিনগুলোতে কি কি আমল করতে পারবো? আমি কি নিয়ত করা, সাঈ করা এগুলো করতে পারবো আগে? মানে তাওয়াফের আগে পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে এগুলো করা জায়েজ আছে? চুল কখন কাটতে হবে? তাওয়াফের আগে নাকি পরে? এছাড়াও, কাবার সামনে ও রিয়াজুল জান্নাতে, মক্কায় জাবালে নূর (হেরা গুহা), জাবালে সাওড়, জান্নাতুল মুয়াল্লা ইত্যাদি স্থানে কি আমি যেতে পারবো? আমার পিরিয়ড অবস্থায় আসলে করণীয় গুলো কি কি বিস্তারিত বলবেন দয়া করে!

Answer

উমরাহ ও হায়েজ (মাসিক) সংক্রান্ত বিস্তারিত মাসআলা

প্রশ্নকারীর বিবরণ: উমরাহর ফ্লাইট আগামীকাল ভোরে, কিন্তু আজই পিরিয়ড শুরু হয়েছে। নরমালি ৬ দিন পিরিয়ড চলে এবং ৭ম দিনে সম্পূর্ণ পবিত্র হন। ৫ম ও ৬ষ্ঠ দিনে খুবই কম রক্ত যায়।


১. ইহরাম বাঁধা সংক্রান্ত বিধান

উত্তর: হায়েজ অবস্থায় ইহরাম বাঁধা সম্পূর্ণ বৈধ। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মহিলাদের হায়েজ অবস্থায় ইহরাম বাঁধার ঘটনা প্রমাণিত।

হাদিসে বর্ণিত, আসমা বিনতে উমাইস (রা.) নবী করিম (সা.)-এর নির্দেশে হায়েজ অবস্থায় ইহরাম বাঁধেন এবং পরবর্তীতে পবিত্র হয়ে তাওয়াফ করেন। (সহিহ মুসলিম: ১২১১)

প্লেনে ইহরাম বাঁধার নিয়ম:

  • প্লেনে ওঠার আগেই ইহরামের কাপড় (ইজার ও রিদা) পরে নিন
  • মিকাত অতিক্রম করার ১৫-২০ মিনিট আগে নিয়ত করুন
  • নিয়তের সময় বলুন: "لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ عُمْرَةً" (লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা উমরাতান)
  • এরপর তালবিয়াহ পড়ুন: "لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ"
  • ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টকে জানিয়ে রাখুন, প্রয়োজনে তিনি মিকাত অতিক্রমের সময় জানিয়ে দেবেন

গুরুত্বপূর্ণ: হায়েজ অবস্থায় ইহরাম বাঁধা, তালবিয়াহ পড়া, দোয়া করা, যিকির করা—সবই জায়েজ।


২. তাওয়াফ কখন করতে পারবেন?

হানাফি মাযহাবের বিধান: তাওয়াফের জন্য পবিত্রতা (হায়েজ থেকে পবিত্র হওয়া) শর্ত। হায়েজ অবস্থায় তাওয়াফ করা হারাম।

আপনার ক্ষেত্রে:

  • ৫ম ও ৬ষ্ঠ দিনে খুবই কম রক্ত গেলে, যতক্ষণ না রক্ত সম্পূর্ণ বন্ধ হয় এবং গোসল করে পবিত্র না হন, ততক্ষণ তাওয়াফ করতে পারবেন না
  • ৭ম দিনে রক্ত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে, গোসল করে পবিত্র হয়ে তাওয়াফ করতে পারবেন
  • মনে রাখবেন: রক্তের রং হলুদ বা সাদা স্রাব হলে তা হায়েজ হিসেবে গণ্য নয়, তবে রক্তের অস্তিত্ব থাকলে হায়েজ চলমান থাকবে

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে: হায়েজের সর্বনিম্ন সময় ৩ দিন এবং সর্বোচ্চ ১০ দিন। আপনার ক্ষেত্রে ৬ দিন হায়েজ চলার পর ৭ম দিনে পবিত্র হওয়া স্বাভাবিক।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি ১০ দিনের মধ্যে রক্ত বন্ধ হয়, তাহলে গোসল করে পবিত্র হয়ে তাওয়াফ করবেন। ১০ দিনের বেশি চললে ইস্তিহাজা (অস্বাভাবিক রক্তস্রাব) হিসেবে গণ্য হবে এবং তখন তাওয়াফ করতে পারবেন।


৩. হায়েজ অবস্থায় করণীয় আমলসমূহ

যা করতে পারবেন:

  • ইহরাম বাঁধা ও তালবিয়াহ পড়া
  • দোয়া, যিকির, তাসবিহ, দরুদ পাঠ
  • কুরআন তিলাওয়াত (মুখস্থ থেকে, স্পর্শ না করে)
  • সাঈ করা (সাফা-মারওয়ায়) — হ্যাঁ, হায়েজ অবস্থায় সাঈ করা জায়েজ কারণ সাঈয়ের জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়
  • হেরা গুহা, জাবালে সাওর, জান্নাতুল মুয়াল্লা, রিয়াজুল জান্নাত প্রভৃতি জিয়ারত করা
  • কাবা শরিফ দেখা ও দোয়া করা

যা করতে পারবেন না:

  • তাওয়াফ করা (পবিত্রতা শর্ত)
  • নামাজ পড়া
  • কুরআন স্পর্শ করা
  • রোজা রাখা
  • মসজিদে অবস্থান করা (মসজিদে প্রবেশের প্রয়োজন হলে মাসনুন পদ্ধতিতে প্রবেশ করতে পারেন)

রিয়াজুল জান্নাত সম্পর্কে: রিয়াজুল জান্নাত মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে অবস্থিত। হায়েজ অবস্থায় মসজিদে প্রবেশের ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাবের বিধান হলো—প্রয়োজনবশত মসজিদে প্রবেশ করা যাবে, তবে সেখানে অবস্থান করা যাবে না। রিয়াজুল জান্নাতে প্রবেশ করে দোয়া করা যাবে, তবে সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করাই উত্তম।


৪. সাঈ করার বিধান

সাঈ হায়েজ অবস্থায় করা জায়েজ। কারণ সাঈর জন্য পবিত্রতা (ওজু/গোসল) শর্ত নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, হায়েজ অবস্থায় সাঈ করা বৈধ।

তবে তাওয়াফের আগে সাঈ করা যাবে না—এই বিষয়ে সতর্ক থাকুন। সাঈ করতে হবে তাওয়াফের পর। যদি কেউ তাওয়াফের আগে সাঈ করে ফেলে, তাহলে পরবর্তীতে তাওয়াফের পর আবার সাঈ করতে হবে।


৫. চুল কাটার সময়

চুল কাটতে হবে তাওয়াফ ও সাঈ সম্পন্ন করার পর। হালক করা বা ছোট করা—উভয়টিই বৈধ। মহিলাদের জন্য মাথার চুল থেকে সামান্য পরিমাণ (আঙুলের অগ্রভাগের সমান) কাটা বা ছোট করা সুন্নত।

মনে রাখবেন: চুল কাটার আগ পর্যন্ত ইহরামের অবস্থায় থাকতে হবে। ইহরামের নিষেধাজ্ঞাগুলো (সুন্দর দ্রব্য ব্যবহার, চুল-নখ কাটা ইত্যাদি) চুল কাটার পরেই শিথিল হবে।


৬. হায়েজ অবস্থায় জিয়ারত

নিম্নোক্ত স্থানগুলোতে যাওয়া জায়েজ:

  • জাবালে নূর (হেরা গুহা)
  • জাবালে সাওর
  • জান্নাতুল মুয়াল্লা (কবরস্থান)
  • কাবা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া করা
  • মসজিদে হারামে প্রবেশ করে দোয়া করা (প্রয়োজন অনুযায়ী)

মনে রাখবেন: হায়েজ অবস্থায় মসজিদে হারামে প্রবেশ করা যাবে, তবে সেখানে অবস্থান করা যাবে না। তাওয়াফ করা যাবে না, তবে কাবা শরিফ দেখে দোয়া করা যাবে।


৭. সংক্ষিপ্ত করণীয় তালিকা

| দিন | অবস্থা | করণীয় | |-----|--------|--------| | ১ম-৪র্থ দিন | হায়েজ চলমান | ইহরাম, তালবিয়াহ, দোয়া, যিকির, জিয়ারত | | ৫ম-৬ষ্ঠ দিন | হায়েজ চলমান (কম রক্ত) | উপরোক্ত আমলসমূহ, সাঈ করা যাবে | | ৭ম দিন | রক্ত বন্ধ | গোসল করে পবিত্র হয়ে তাওয়াফ, সাঈ, চুল কাটা |


৮. অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা

যদি ১০ দিনের মধ্যে রক্ত বন্ধ না হয়: তাহলে ইস্তিহাজা হিসেবে গণ্য হবে। তখন গোসল করে নামাজ ও তাওয়াফ করতে পারবেন। (রদ্দুল মুহতার: ১/২৮৭)

মহিলাদের জন্য ইহরামের বিশেষ বিধান: মহিলারা ইহরামে সাধারণ পোশাক পরতে পারবেন, তবে মুখমণ্ডল ও হাত ছাড়া শরীর ঢাকতে হবে। গ্লাভস ও নেকাব ব্যবহার করা যাবে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২২৪)

আল্লাহ তায়ালা আপনার উমরাহ কবুল করুন এবং সহজ করুন। আমিন।


সূত্রসমূহ: রদ্দুল মুহতার (১/২৮৭, ২/৪২৩), ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/২২৪), বেহেশতি জেওর, ফাতাওয়া উসমানি, সহিহ মুসলিম (১২১১), আল-হিদায়া


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.