কাঁতার সোজা করার নির্দেশনা কোন ভাষায় দিবেন?
Salah-Prayer · Ahle Hadith / Salafi
Question
বাংলা ভাষাভাষী মুসল্লিদের সামনে সালাতের আগে ইমাম সাহেব নিম্নোক্ত নির্দেশনা কোন ভাষায় দেবেন? আরবি নাকি বাংলায় বলবেন?
"ইবাদাল্লাহ, সাউ সুফুফাকুম, ওয়া তারাসসু, ওয়া সুদ্দুল খালাল... রহিমাকুল্লাহ।"
নাকি বাংলায় বলবেন, "হে আল্লাহর বান্দাগণ, তোমরা তোমাদের সারিগুলোকে সোজা করো, একে অপরের সাথে মিলে দাঁড়াও এবং ফাঁকা জায়গাগুলো বন্ধ করে দাও... আল্লাহ আপনাদের ওপর রহম করুন।"
নাকি বাংলায় অন্য কোনো নির্দেশনা দেবেন?
প্রশ্ন ০২
দুই সিজদা দিয়ে দাঁড়ানোর সময় ইমাম সাহেব কি পরবর্তী রাকাতের জন্য 'আল্লাহু আকবার' বলে একসাথে দাঁড়িয়ে যাবেন, নাকি 'আল্লাহু আকবার' বলে সোজা হয়ে একটু বসে এরপর দাঁড়াবেন? নাকি অন্য কোনো নিয়ম রয়েছে?
প্রশ্ন ০৩
সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা মেলানোর মাঝে কি 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' পড়তে হবে? সশব্দ কিরাতের সময় এই 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' পড়তে হলে কি আস্তে পড়বেন নাকি জোরে পড়বেন? মূলত দুই সূরার মধ্যে কতটুকু সময় বিরতি দেবেন—কত সেকেন্ড?
Answer
সালাত সংক্রান্ত তিনটি প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন ০১: সালাতের আগে ইমামের নির্দেশনা কোন ভাষায় দেবেন?
উত্তর: ইমাম সাহেব সালাতের আগে মুসল্লিদেরকে সারিবদ্ধ হওয়ার যে নির্দেশনা দেবেন, তা আরবি ভাষায় বলা সুন্নাহসম্মত। কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে শব্দগুলো ব্যবহার করতেন, সেগুলো হুবহু আরবিতে বলা উত্তম। তবে মুসল্লিরা যদি আরবি না বুঝেন, তাহলে ইমাম তাদেরকে বাংলা ভাষায় বুঝিয়ে দিতে পারেন—এতে কোনো দোষ নেই।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সালাতের আগে সাহাবাদেরকে বলতেন:
"سَوُّوا صُفُوفَكُمْ فَإِنَّ تَسْوِيَةَ الصُّفُوفِ مِنْ إِقَامَةِ الصَّلَاةِ"
"তোমাদের সারিগুলো সোজা করো, কারণ সারি সোজা করা সালাত কায়েমের অন্তর্ভুক্ত।" (সহীহ বুখারী: ৭২৩, সহীহ মুসলিম: ৪৩৩)
আরও বর্ণিত আছে:
"أَقِيمُوا الصُّفُوفَ وَتَرَاصُّوا وَسُدُّوا الْخَلَلَ"
"সারিগুলো সোজা করো, পরস্পর মিলে দাঁড়াও এবং ফাঁকা জায়গাগুলো বন্ধ করো।" (সুনানে আবু দাউদ: ৬৬৭, সুনানে নাসাঈ: ৮১৫—শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন)
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "সালাতের মধ্যে যে সকল যিকর ও দোয়া রয়েছে, সেগুলো আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় বলা জায়েয নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে শব্দগুলো শিখিয়েছেন, সেগুলোই পড়তে হবে।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ২২/৫৩৮)
তবে শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: "যদি মুসল্লিরা আরবি না বোঝে, তাহলে ইমাম সালাতের আগে তাদেরকে নিজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতে পারেন—এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সালাতের ভেতরে যিকর ও দোয়াগুলো আরবিতেই পড়তে হবে।" (আশ-শারহুল মুমতি': ৩/১০৫)
সারকথা: ইমাম সাহেব আরবিতে সুন্নাহসম্মত শব্দগুলো বলবেন এবং প্রয়োজনে বাংলায় অর্থ বুঝিয়ে দেবেন।
প্রশ্ন ০২: দুই সিজদা দিয়ে দাঁড়ানোর নিয়ম
উত্তর: দুই সিজদা শেষ করে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ানোর সময় ইমাম "আল্লাহু আকবার" বলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সিজদা থেকে উঠে দাঁড়াতেন এইভাবে:
"كَانَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ السَّجْدَةِ كَبَّرَ وَنَهَضَ مِنْ غَيْرِ جُلُوسٍ"
"তিনি সিজদা থেকে মাথা উঠিয়ে 'আল্লাহু আকবার' বলতেন এবং না বসেই দাঁড়িয়ে যেতেন।" (সহীহ বুখারী: ৮২৩, সহীহ মুসলিম: ৪৭৪)
ইমাম বুখারী (রহ.) তাঁর সহীহ গ্রন্থে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন: "بَابُ يَنْهَضُ فِي الرَّكْعَةِ الثَّانِيَةِ" অর্থাৎ "দ্বিতীয় রাকাতে না বসে দাঁড়ানোর অধ্যায়।"
শাইখ আলবানী (রহ.) বলেন: "সিজদা থেকে উঠে না বসে সরাসরি দাঁড়ানো—এটাই সুন্নাহ। সিজদা থেকে উঠে বসে তারপর দাঁড়ানো বিদ'আত।" (সিফাতু সালাতিন নাবী: ১৩০)
শাইখ ইবনে বায (রহ.) বলেন: "সুন্নাহ হলো সিজদা থেকে উঠে 'আল্লাহু আকবার' বলে সরাসরি দাঁড়িয়ে যাওয়া, না বসে। তবে যদি কেউ দুর্বলতা বা অসুস্থতার কারণে একটু বসে নেয়, তাহলে দোষ নেই।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ১১/৮৩)
সারকথা: সিজদা থেকে উঠে "আল্লাহু আকবার" বলে সরাসরি দাঁড়িয়ে যাবেন, মাঝখানে বসবেন না।
প্রশ্ন ০৩: সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা মেলানোর সময় বিসমিল্লাহ পড়া
উত্তর: সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা শুরু করার সময় বিসমিল্লাহ পড়া সুন্নাহ। তবে সশব্দ কিরাতে (জাহরি সালাতে) ইমাম বিসমিল্লাহ আস্তে পড়বেন, জোরে নয়।
এ বিষয়ে দলিল:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: "صَلَّيْتُ خَلْفَ النَّبِيِّ ﷺ وَأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ وَعُثْمَانَ فَكَانُوا لَا يَجْهَرُونَ بِبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ"
"আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন: আমি নবী (ﷺ), আবু বকর, উমর ও উসমানের (রা.) পেছনে সালাত আদায় করেছি—তারা কেউই 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' জোরে পড়তেন না।" (সুনানে নাসাঈ: ৮৭৭, সহীহ)
শাইখ আলবানী (রহ.) বলেন: "সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা শুরু করার সময় বিসমিল্লাহ পড়া সুন্নাহ, কিন্তু তা আস্তে পড়তে হবে—জোরে নয়।" (সিফাতু সালাতিন নাবী: ১০৫)
দুই সূরার মধ্যে বিরতির সময়: দুই সূরার মধ্যে তেমন দীর্ঘ বিরতি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সাধারণত যে পরিমাণ সময়ে "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" পড়া যায়, ততটুকু বিরতিই যথেষ্ট। এর বেশি বিরতি দেওয়া বা দীর্ঘ নীরবতা রাখা সুন্নাহসম্মত নয়।
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: "সূরা ফাতিহা শেষ করে অন্য সূরা শুরু করার সময় বিসমিল্লাহ পড়া মুস্তাহাব। তবে তা আস্তে পড়তে হবে, জোরে নয়। দুই সূরার মধ্যে দীর্ঘ বিরতি দেওয়া ঠিক নয়।" (আশ-শারহুল মুমতি': ৩/১২০)
সারকথা: সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা শুরু করার সময় বিসমিল্লাহ আস্তে পড়বেন। দুই সূরার মধ্যে বিসমিল্লাহ পড়ার মতো সময়টুকুই বিরতি দেবেন, এর বেশি নয়।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।