কথার সত্যতা প্রমাণে আল্লাহর কসম করলে সেটা কি ভবিষ্যতের কসম বলে বিবেচিত হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কেনে একটি টপিকে আলোচনা করতে গিয়ে ওয়াসওয়াসা আক্রান্ত হই। এবং মনে আসা ওয়াসওয়াসার চিন্তা দূর করার জন্য বলি, আল্লাহর কসম ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কথা বলবো না... এটা ভেবে যে একজন মুসলমান তো কখনোই তার জীবনে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কথা বলবে না। এতে তো ঈমান চলো যাবে এই চিন্তায় কসম করি।
এখন এটা কি ভবিষ্যতের কসম বলে বিবেচিত হয়ে যাবে?? এটার জন্য কাফফারা দিতে হবে?
Answer
উত্তর: ওয়াসওয়াসা ও ভবিষ্যতের কসম (ইয়ামিনুল মুস্তাকবাল) সংক্রান্ত মাসআলা
উত্তর প্রদানে: মুফতি আব্দুল্লাহ আল-মামুন আল-হানাফি (হাফিজাহুল্লাহ)
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি একটি বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় ওয়াসওয়াসায় (মনের খারাপ চিন্তা) আক্রান্ত হয়েছেন। সেই ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য আপনি বলেছেন: "আল্লাহর কসম, আমি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কথা বলবো না।" এখন আপনার প্রশ্ন হলো, এটি কি ভবিষ্যতের কসম হিসেবে গণ্য হবে? এবং এর জন্য কি কাফফারা (শরীয়তসম্মত প্রায়শ্চিত্ত) দিতে হবে?
মূল ফতোয়া ও ব্যাখ্যা
১. কসমের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ (হানাফি ফিকহের আলোকে): ইসলামি ফিকহে কসম (ইয়ামিন) প্রধানত দুই প্রকার:
- ইয়ামিনুল মুস্তাকবাল (ভবিষ্যতের কসম): কোনো ভবিষ্যতের কাজ করা বা না করার দৃঢ় সংকল্পের সাথে আল্লাহর নাম নিয়ে কসম করা। যেমন: "আগামীকাল আমি এই কাজ করবো" বা "আমি আর কখনো মিথ্যা বলবো না"। এই কসম ভঙ্গ করলে কাফফারা ওয়াজিব হয়।
- ইয়ামিনুল মাযী (অতীতের কসম): কোনো অতীতের ঘটনার সত্যতা প্রমাণের জন্য কসম করা। যেমন: "আল্লাহর কসম, আমি গতকাল ওই কাজ করিনি।" এই কসমে সত্য বলা হলে কোনো সমস্যা নেই, মিথ্যা বলা হলে গুনাহ হয়, তবে কাফফারা ওয়াজিব হয় না।
২. আপনার প্রশ্নের বিশ্লেষণ: আপনি যে কসমটি করেছেন, তা মূলত ভবিষ্যতের কসম (ইয়ামিনুল মুস্তাকবাল)-এর অন্তর্ভুক্ত। কারণ, আপনি ভবিষ্যতে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কথা না বলার সংকল্প করেছেন। এটি একটি ভবিষ্যতের কাজের সাথে সম্পর্কিত।
৩. কাফফারার বিধান: যেহেতু এটি একটি ভবিষ্যতের কসম, তাই যদি আপনি ভবিষ্যতে কখনো (ইচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলে) ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কথা বলে ফেলেন, তাহলে আপনার কসম ভঙ্গ হবে এবং কাফফারা ওয়াজিব হবে। কাফফারা হলো:
- দশজন মিসকিনকে (গরিব) দুই বেলা পেট ভরে খাওয়ানো, অথবা
- দশজন মিসকিনকে দুই জোড়া (মোট ২০টি) সাধারণ মানের কাপড় দেওয়া, অথবা
- একজন মুসলিম দাস/দাসী মুক্ত করা।
- বিকল্প: এর মধ্যে কোনোটি সামর্থ্য না থাকলে, তিন দিন রোজা রাখা।
৪. ওয়াসওয়াসা ও কসমের সম্পর্ক: আপনি ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য এই কসম করেছেন। এটি একটি ভালো উদ্দেশ্য। তবে মনে রাখবেন, ওয়াসওয়াসা (মনের খারাপ চিন্তা) কোনো গুনাহ নয় এবং এটি আপনার ঈমান নষ্ট করে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের মনের কথা (ওয়াসওয়াসা) ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা মুখে উচ্চারণ করে বা কাজে পরিণত করে।" (সহিহ বুখারি: ৫২৬৯, সহিহ মুসলিম: ১২৭)।
৫. বর্তমান অবস্থায় করণীয়:
- আপনার কসম এখনো ভঙ্গ হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কথা বলেননি, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার উপর কোনো কাফফারা ওয়াজিব হয়নি।
- ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতা: যেহেতু আপনি ভবিষ্যতের জন্য কসম করেছেন, তাই চেষ্টা করবেন যেন কখনো এমন কথা না বলেন। তবে, যদি ভুলে বা অসাবধানতাবশত এমন কিছু হয়ে যায়, তাহলে সেই সময় কাফফারা আদায় করা আপনার উপর ওয়াজিব হবে।
- ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার উপায়: ওয়াসওয়াসা আসলে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং এ বিষয়ে বেশি ভাববেন না। ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়াই হলো এর সঠিক চিকিৎসা। এটি একটি মানসিক রোগের মতো, যা উপেক্ষা করলে দূর হয়ে যায়।
দলিল ও রেফারেন্স (হানাফি কিতাব থেকে)
১. কসমের প্রকারভেদ ও কাফফারা: * সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৮৯): "আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন না তোমাদের সেই সব কসমের জন্য যা তোমাদের মুখে উচ্চারিত হয় (অর্থাৎ অনিচ্ছাকৃত), কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন সেই কসমের জন্য যা তোমাদের অন্তর দৃঢ়ভাবে করেছে (অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত কসম)। এর কাফফারা হলো দশজন মিসকিনকে মধ্যম ধরনের খাদ্য খাওয়ানো... অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা, অথবা একজন দাস মুক্ত করা। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোজা রাখবে।" * আল-হিদায়াহ (১ম খণ্ড, কিতাবুল আইমান): ইমাম আল-মারগিনানী (রহ.) বলেছেন, "কসম হলো ভবিষ্যতে কোনো কাজ করা বা না করার দৃঢ় সংকল্পের সাথে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা।" (আল-হিদায়াহ, ৩:৬০) * রদ্দুল মুহতার (৩য় খণ্ড, কিতাবুল আইমান): আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেছেন, "যদি কেউ ভবিষ্যতে কোনো কাজ না করার কসম করে, তাহলে তা ইয়ামিনুল মুস্তাকবাল। এই কসম ভঙ্গ করলে কাফফারা ওয়াজিব হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৩:৭০৫)
২. ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে: * সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের মনের কথা (ওয়াসওয়াসা) ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা মুখে উচ্চারণ করে বা কাজে পরিণত করে।" (সহিহ বুখারি: ৫২৬৯, সহিহ মুসলিম: ১২৭)। * ফতোয়ায়ে উসমানি (২য় খণ্ড, কিতাবুল আইমান): মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন, "মানসিক উদ্বেগ বা ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য কসম করলে তা একটি বৈধ কসম। তবে এই কসম ভঙ্গ হলে কাফফারা ওয়াজিব হবে।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২:৪৫০)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
- আপনার কসমটি কি ভবিষ্যতের কসম? হ্যাঁ, এটি ভবিষ্যতের কসম (ইয়ামিনুল মুস্তাকবাল) হিসেবে গণ্য হবে।
- এখন কি কাফফারা দিতে হবে? না, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কথা বলেননি, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কাফফারা ওয়াজিব হয়নি।
- ভবিষ্যতে কাফফারা কখন ওয়াজিব হবে? যদি ভবিষ্যতে কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কথা বলেন, তাহলে সেই কসম ভঙ্গের কারণে কাফফারা ওয়াজিব হবে।
আপনার জন্য উপদেশ: ওয়াসওয়াসা নিয়ে চিন্তা করবেন না। এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা। "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আপনার ঈমান ঠিক আছে, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমিন)