ইন্টারভিউয়ে পর্দার ব্যাপারে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার পরিবার তেমন দ্বীনি না, আমি একাই পর্দা মেইনটেইন করি যতটুকু পারি। আত্মীয়দের সামনে করলপ মা রাগ করে তাই করা হয় না, কোথাও পরিবারের সাথে বেড়াতে গেলেও।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে চাকরির ইন্টারভিউয়ে মুখ দেখাতে বলে বাট চাকরি হয়ে গেলে আর নিকাব নিয়ে সমস্যা করে না।
আমি কি মুখ দেখাতে পারবো যেহেতু পুরোপুরি পর্দা আমার করা হয় না?
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার দ্বীনি আমল ও পর্দা করার আগ্রহ দেখে আমরা খুবই খুশি। আল্লাহ তাআলা আপনার ইচ্ছাশক্তিকে আরও শক্তিশালী করুন এবং আপনার পরিবারকেও দ্বীনের পথে পরিচালিত করুন।
প্রশ্নের উত্তর:
ইসলামী শরিয়তে পর্দা ফরজ। কোরআন ও হাদিসের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, নারীদের জন্য অমাহরাম পুরুষের সামনে পূর্ণ পর্দা করা আবশ্যক। হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, নারীর চেহারা ও হাত পায়ের তালু ব্যতীত তার সমস্ত দেহ আবৃত করা ফরজ। তবে চেহারা ও হাত পায়ের তালু সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, এগুলো অমাহরামের সামনে ঢেকে রাখা ওয়াজিব (প্রয়োজনীয়) নয়, তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে ঢেকে রাখা উত্তম। অন্যদিকে, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, চেহারা ও হাত পায়ের তালুও অমাহরামের সামনে ঢেকে রাখা ওয়াজিব। অধিকাংশ হানাফি আলেমদের মতে, বর্তমান যুগে ফিতনা ও ফাসাদের প্রাচুর্যের কারণে চেহারা সহ সম্পূর্ণ দেহ ঢেকে রাখাই সুন্নত ও নিরাপদ পদ্ধতি।
আপনার বিশেষ পরিস্থিতি:
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনি বর্তমানে পরিবারের কারণে পূর্ণ পর্দা করতে পারছেন না এবং চাকরির ইন্টারভিউতে মুখ দেখাতে বলা হয়। এই প্রসঙ্গে হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নরূপ:
১. ইন্টারভিউতে মুখ দেখা: যদি ইন্টারভিউতে আপনি অমাহরাম পুরুষদের সামনে মুখ দেখান, তাহলে এটি শরিয়তে জায়েজ হবে না, যেহেতু চেহারা ঢেকে রাখা আবশ্যক। । ফিতনার আশঙ্কা থাকলে বিশেষ করে বর্তমান যুগে চেহারা ঢেকে রাখা জরুরি।
২. প্রয়োজনীয়তা: যদি চাকরি পাওয়া আপনার জন্য একান্তই জরুরি হয় (যেমন: নিজের এবং পরিবারের ভরণপোষণের জন্য অন্য কোনো উপায় না থাকে), তাহলে কিছু হানাফি আলেম নিম্নোক্ত শর্তে ইন্টারভিউতে মুখ দেখানোর অনুমতি দিয়েছেন:
- শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় পরিমাণে মুখ খোলা (পুরো চেহারা না দেখানো)।
- যত দ্রুত সম্ভব পুনরায় নিকাব বা পর্দা করা।
- চাকরি হওয়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে পর্দা লঙ্ঘন না করা।
তবে সাধারণ অবস্থায় ইন্টারভিউতে মুখ দেখানো জায়েজ নয়, কারণ এটি একটি অপশনাল বিষয় (চাকরি), যা আপনি বিনা পর্দায় পেতে বাধ্য নন। আপনি যদি পর্দা মেইনটেইন করে চাকরি না পান, তাহলে এতে আপনার কোনো পাপ নেই, বরং এটি আপনার ঈমানের পরীক্ষা।
পরামর্শ:
১. পূর্ণ পর্দার চেষ্টা করুন: আপনি বর্তমানে যতটুকু পর্দা করছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকুন এবং আল্লাহর কাছে পূর্ণ পর্দার তৌফিক চান। কোনো অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে পর্দা ভাঙবেন না।
২. ইন্টারভিউতে নিকাব রাখার চেষ্টা করুন: যদি ইন্টারভিউতে নিকাব রাখা সম্ভব হয়, তাহলে তা রাখুন। যদি কোম্পানি সরাসরি নিকাব নিষেধ করে, তাহলে বিকল্প চাকরি খোঁজার চেষ্টা করুন।
৩. পরিবারের সাথে ধৈর্য: আপনার মা বা পরিবারের সদস্যদের সামনে আপনি পর্দা না করলেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ইচ্ছাকে শক্ত রাখুন। ধীরে ধীরে তাদের দ্বীনি বিষয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
কোরআন ও হাদিসের দলিল:
- সূরা নূর (২৪:৩১): “আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া…”
- সূরা আহযাব (৩৩:৫৯): “হে নবী! আপনার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তাদেরকে কষ্ট দেওয়া হবে না।”
- হাদিস: আবু দাউদ ও তিরমিজি (হাদিস নং: ৪০৪১), আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, “মহিলারা পুরুষদের সামনে কাপড় দিয়ে নিজেদের আবৃত করবে।”
উপসংহার:
আপনার জন্য উচিত হলো ইন্টারভিউতে নিকাব বা পর্দা বজায় রাখার চেষ্টা করা। যদি এটি সম্ভব না হয় এবং চাকরি পাওয়া বাধ্যতামূলক হয় (যেমন: আর্থিক সংকট অত্যন্ত তীব্র), তাহলে শুধুমাত্র প্রয়োজনের তাগিদে ইন্টারভিউতে মুখ দেখাতে পারেন, কিন্তু চাকরি হওয়ার পর অবশ্যই পূর্ণ পর্দা মেইনটেইন করবেন। তবে আল্লাহর কাছে উত্তম ও বিনা পর্দায় চাকরি পেতে বাধ্য না হওয়াটাই অধিক নিরাপদ।
দোয়া:
“রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতে হাসানাতাও ওয়া ক্বিনা আজাবান নার”
(হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় স্থানে কল্যাণ দান করুন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।)
আল্লাহ তাআলা আপনার দ্বীনি আমল কবুল করুন এবং পূর্ণ পর্দা করার তৌফিক দান করুন।
(আমিন)
রেফারেন্স:
- কোরআন: সূরা নূর (২৪:৩১), সূরা আহযাব (৩৩:৫৯)
- হাদিস: আবু দাউদ, তিরমিজি, মিশকাত
- ফতোয়া: ফতোয়া উসমানি, রদ্দুল মুহতার, ইমদাদুল ফতোয়া
- হানাফি ফিকহ: আল-হিদায়া, ফতোয়া আলমগীরী