ওমরাহর জন্য ছুটিতে ঘুষ দেওয়া কি জায়েজ
Hajj and Umrah · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমি একজন সরকারী চাকুরীজীবি।সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে ওমরাহ পালনের জন্য ছুটির আবেদন করতে হয়।এক্ষেত্রে ছুটির আবেদনের বিভিন্ন ধাপে কাজটি দ্রুত করে দেয়ার জন্য অনুরোধের পাশাপাশি টাকাও দেয়া লাগে। তা না হলে কাজটি তারা করে দেয় না,করলেও অনেক দেরিতে করে,ফেলে রাখে ফাইলগুলো।সচিব/মন্ত্রণালয় পর্যন্ত তারা আর পৌছে দেয় না সহজে।একটা সিস্টেম হয়ে গেছে যেখানে সবাই জিম্মি,যেখানে তারা টাকা ছাড়া কোনো কাজ করে দেয় না।এক্ষেত্রে টাকা দেয়া হলে কি গুনাহ হবে?না পারতে টাকা দেয়া লাগে।টাকা ছাড়া কাজ করে না।ফাইলগুলো ফেলে রাখে।
এক্ষেএে টাকা দিয়ে কাজ করালে কি গুনাহ হবে?ওমরাহ কবুল হবে?
Answer
ওমরাহ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি সরকারি চাকুরিজীবী হিসেবে ওমরাহ পালনের জন্য ছুটির আবেদন করেন। কিন্তু ছুটির আবেদন প্রক্রিয়াকরণের বিভিন্ন ধাপে কর্মকর্তারা টাকা ছাড়া কাজ করেন না। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখেন, দেরি করেন। এখন প্রশ্ন হলো—এভাবে টাকা দিয়ে কাজ করালে কী গুনাহ হবে? ওমরাহ কি কবুল হবে?
উত্তর
১. ঘুষ (রিশওয়াত) এর শারঈ বিধান
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, কর্মকর্তারা টাকা ছাড়া কাজ না করা এবং ফাইল আটকে রাখা—এটি স্পষ্টতই ঘুষ (রিশওয়াত) এর অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে ঘুষ দেওয়া-নেওয়া উভয়ই হারাম।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ "রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতাকে অভিশাপ দিয়েছেন।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৮০, সুনানে তিরমিযী: ১৩৩৭, ইবনে মাজাহ: ২৩১৩ — শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন)
অন্য হাদিসে এসেছে:
لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي "ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার উপর আল্লাহর অভিশাপ।" (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪১৭)
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "ঘুষ দেওয়া-নেওয়া হারাম এবং এটি কবিরা গুনাহ।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ৩০/৩৬৭)
২. জোরপূর্বক ঘুষ দেওয়ার বিধান
আপনার ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো—যদি কাজ না হলে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হন (ছুটি না পাওয়া, ফাইল আটকে থাকা), তখন কি ঘুষ দেওয়া জায়েজ হবে?
এ প্রসঙ্গে ইসলামি পণ্ডিতদের মতামত হলো:
যদি কেউ আপনার প্রাপ্য অধিকার আদায়ের জন্য ঘুষ দাবি করে এবং আপনি তা না দিলে আপনার ক্ষতি হয়, তাহলে জোরপূর্বক ঘুষ দেওয়ার ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে অবকাশ থাকতে পারে। তবে এটিও সর্বশেষ উপায় হিসেবে এবং প্রয়োজনীয়তার সীমার মধ্যে হতে হবে।
শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন: "যদি কোনো ব্যক্তি তার প্রাপ্য অধিকার আদায়ের জন্য ঘুষ দিতে বাধ্য হয়, যেমন—জালিম শাসক বা কর্মকর্তা তার কাজ না করলে, তাহলে সে ঘুষ দিতে পারে, তবে গুনাহ হবে ঘুষগ্রহীতার উপর, দাতার উপর নয়। কারণ দাতা তার প্রয়োজনীয় কাজ আদায়ের জন্য বাধ্য হয়েছে।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান: ২/২৮৫)
তবে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো:
১. এটি হতে হবে প্রয়োজনের তাগিদে — মানে কাজটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্য কোনো বৈধ উপায় না থাকলে। ২. সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে — আগে বৈধ উপায়ে চেষ্টা করতে হবে, যেমন—উপরের কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা, আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ইত্যাদি। ৩. ঘুষের পরিমাণ ন্যূনতম হতে হবে — যা দাবি করা হয়, তার বেশি নয়। ৪. উপরের কর্তৃপক্ষকে জানানো — সম্ভব হলে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়ার বিষয়টি জানানো।
৩. ওমরাহ কবুল হওয়ার শর্ত
ওমরাহ কবুল হওয়ার জন্য মূল শর্ত হলো:
১. ঈমান ও আখলাস (একনিষ্ঠতা) — শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ওমরাহ করা। ২. সুন্নাহ মোতাবেক সম্পাদন — রাসূলুল্লাহ ﷺ যেভাবে ওমরাহ করেছেন সেভাবে করা। ৩. হালাল উপার্জন থেকে খরচ — ওমরাহর খরচ হালাল হতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের কাছ থেকে কবুল করেন।" (সূরা আল-মায়িদা: ২৭)
৪. ঘুষ দিয়ে ওমরাহ করলে তা কি কবুল হবে?
আপনার ক্ষেত্রে ঘুষ দেওয়া হচ্ছে ছুটি পাওয়ার জন্য, ওমরাহর জন্য নয়। অর্থাৎ ঘুষের টাকা ওমরাহর অংশ নয়, বরং এটি প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য দেওয়া হচ্ছে। তাই:
- ওমরাহ নিজে সহীহ হবে — ইনশাআল্লাহ, যদি ওমরাহর শর্তগুলো পূরণ হয়।
- কিন্তু ঘুষ দেওয়ার গুনাহ থেকে বাঁচতে হবে — যতটুকু সম্ভব বৈধ উপায়ে কাজটি করার চেষ্টা করতে হবে।
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যদি কেউ ঘুষ দিয়ে হজ বা ওমরাহ করে, তবে তার হজ সহীহ হবে, কিন্তু সে গুনাহগার হবে ঘুষ দেওয়ার কারণে। তাকে তওবা করতে হবে।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন: ২৪/৩৮)
৫. ব্যবহারিক সমাধান
আপনার জন্য কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ:
১. বৈধ উপায়ে চেষ্টা করুন — প্রথমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করুন, প্রয়োজনে মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ বিভাগে জানান। ২. প্রয়োজনের সীমা নির্ধারণ করুন — যদি সত্যিই অন্য কোনো উপায় না থাকে এবং ওমরাহ করা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে ন্যূনতম পরিমাণে দিতে পারেন, তবে মনে রাখবেন এটি গুনাহের কাজে সহযোগিতা হচ্ছে। ৩. তওবা করুন — ঘুষ দিতে বাধ্য হলেও পরে তওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। ৪. অন্য উপায় খুঁজুন — ওমরাহর জন্য ছুটি না পেলে সাপ্তাহিক ছুটি বা অন্যান্য ছুটিতে ওমরাহ করার চেষ্টা করুন।
৬. গুরুত্বপূর্ণ নসীহত
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যদি কোনো ব্যক্তি তার প্রাপ্য অধিকার আদায়ের জন্য ঘুষ দিতে বাধ্য হয়, তবে সে ঘুষ দিতে পারে এবং গুনাহ হবে ঘুষগ্রহীতার উপর। কিন্তু দাতার উচিত যতটুকু সম্ভব এড়িয়ে চলা এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা।" (মাজমু' ফাতাওয়া: ৩০/৩৬৭)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
ঘুষ দেওয়া হারাম, তবে আপনার ক্ষেত্রে যদি সত্যিই বাধ্য হয়ে দিতে হয় (কাজ না হলে ক্ষতি হয়), তাহলে গুনাহ প্রধানত ঘুষগ্রহীতার উপর হবে, দাতার উপর নয়—ইনশাআল্লাহ। তবে দাতাকেও চেষ্টা করতে হবে যেন বৈধ উপায়ে কাজটি সম্পন্ন হয়।
ওমরাহ কবুল হবে ইনশাআল্লাহ, যদি তা একনিষ্ঠভাবে এবং সুন্নাহ মোতাবেক সম্পাদন করা হয়। ঘুষ দেওয়ার কারণে ওমরাহ বাতিল হবে না, তবে ঘুষের গুনাহ থেকে তওবা করা জরুরি।
আল্লাহ তাওফিক দিন।
দলিলসমূহ:
- সহীহ বুখারী: ৬৭৮২ (ঘুষ প্রসঙ্গে)
- সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৮০ (ঘুষের অভিশাপ)
- সুনানে তিরমিযী: ১৩৩৭ (ঘুষের অভিশাপ)
- মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪১৭ (ঘুষের অভিশাপ)
- সূরা আল-মায়িদা: ২৭ (কবুলের শর্ত)