বর্তমান সময়ে আর্থিক সংকটে সন্তান নেয়ার ব্যাপারে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কারো কোনো সম্পদ নেই শুধু ছোট একটা জায়গা আছে যেখানে বাড়ি বানানো যাবে মাথা গুঁজানো যায় মতো । ইমামতির ৮হাজার বেতনে ১টা বাচ্চা জন্ম দেয়াতেই রীতিমতো কষ্টকর হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন খরচ চালানোর জন্য, এমন সম্ভাবনাও নেই যে সামনে বড় আয় হবে, এখন যদি পুনরায় বাচ্চা নেয়া হয় আশংকা করা যায় তাদের বড় করা ও পড়ালেখার খরচ চালানোই রীতিমতো অসম্ভব হয়ে যাবে, সন্তান পেটে আসলেইতো বিভিন্ন অসুস্থতার জটিলতা শুরু হয় আজকাল ।
এতসব বিবেচনা করে বাচ্চা না নিলে কী গুনাহ হতে পারে? বা বাবু নেয়ার নিয়মটা কেমন ইসলামে? যদিও রিজিক আল্লহ দেন৷।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার উদ্বেগটি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং বাস্তবসম্মত। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে সন্তান লালন-পালনের খরচ নিয়ে চিন্তা করা প্রতিটি দায়িত্বশীল পিতামাতার জন্যই স্বাভাবিক। ইসলাম এ বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে।
১. সন্তান না নেওয়ার গুনাহ সম্পর্কে:
ইসলামে সন্তান ধারণ করা একটি সুন্নত (নবীজীর ﷺ এর আদর্শ) এবং ইবাদত। তবে এটি ফরজ (অবশ্য করণীয়) নয়। অর্থাৎ, সন্তান না নেওয়া সরাসরি গুনাহের কাজ নয়, যদি না কোনো শরয়ী (ধর্মীয়) কারণে তা নিষিদ্ধ হয়।
তবে, গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা (যেমন: কনডম, বড়ি ইত্যাদি) ব্যবহার করে সাময়িকভাবে সন্তান না নেওয়ার অনুমতি ইসলামে আছে, বিশেষত:
- দুর্বল স্বাস্থ্য বা শারীরিক অক্ষমতার কারণে।
- অর্থনৈতিক সংকট বা জীবিকা নির্বাহের চরম অসুবিধার কারণে (যদিও রিজিকের মালিক আল্লাহ, তবুও চেষ্টা-তদবির করা জরুরি)।
- সন্তান লালন-পালনের সামর্থ্য না থাকার আশঙ্কায়।
কিন্তু স্থায়ীভাবে সন্তান ধারণ বন্ধ করে দেওয়া (নসব বন্ধ করা) ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি কবিরা গুনাহ। কারণ এটি আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ও বংশবৃদ্ধির পথ রুদ্ধ করা।
আপনার ক্ষেত্রে: আপনি যদি সাময়িকভাবে (যেমন: ২-৩ বছর) সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যতক্ষণ না আপনার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ এতে কোনো গুনাহ হবে না। তবে স্থায়ীভাবে সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
২. বাবু নেওয়ার নিয়ম (ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি):
ইসলামে সন্তান নেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট "নিয়ম" বা "পদ্ধতি" নেই, তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে:
- নিয়ত (ইন্তেনশন): সন্তান নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর ইবাদত করা, উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং নবীজীর ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা।
- দুআ: সন্তান নেওয়ার আগে ও পরে আল্লাহর কাছে নেক সন্তানের জন্য দুআ করা। যেমন: কুরআনে বর্ণিত দুআ— "রাব্বি হাবলি মিনাল সালিহীন" (সূরা আস-সাফফাত: ১০০)।
- বিবাহ: ইসলামে সন্তান নেওয়ার বৈধ পথ হলো বিবাহ। বিবাহ ছাড়া সন্তান নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম।
- গর্ভনিরোধক: সাময়িক গর্ভনিরোধক ব্যবহার করা জায়েয, তবে তা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতিতে হতে হবে। একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
৩. রিজিকের বিষয়ে:
আপনি ঠিকই বলেছেন, রিজিক আল্লাহ তায়ালা দেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
"আর আমি তাদের (সন্তানদের) এবং তোমাদের রিজিক দেই।" (সূরা আল-আনআম: ১৫১)
তবে এর অর্থ এই নয় যে, আমরা চেষ্টা-তদবির করব না। ইসলামে তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা) এবং তাদবির (পরিকল্পনা ও চেষ্টা) দুটোই জরুরি। আপনি যদি বর্তমানে আর্থিকভাবে সক্ষম না হন, তাহলে সাময়িক বিরতি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ, তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না।
৪. হানাফি ফিকহের দলিল:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): এতে বলা হয়েছে, "যদি কোনো ব্যক্তি সন্তান লালন-পালনের সামর্থ্য না রাখে, তবে তার জন্য আজল (গর্ভনিরোধ) করা জায়েয।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫:৩৫৮)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ইমাম ইবনে আবিদীন রহ. লিখেছেন, "দুর্বলতা বা অসুবিধার কারণে আজল করা জায়েয, তবে তা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ।" (রদ্দুল মুহতার, ২:৩৯৮)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): তিনি লিখেছেন, "অর্থনৈতিক সংকট বা সন্তান লালন-পালনের অক্ষমতার কারণে সাময়িক গর্ভনিরোধক ব্যবহার করা জায়েয, তবে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হারাম।"
৫. আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ:
১. স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন না: শুধুমাত্র বর্তমান সংকটের কারণে স্থায়ীভাবে সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হারাম। সাময়িক বিরতি নিন। ২. স্বামীর সাথে আলোচনা করুন: এই বিষয়ে স্বামীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন এবং পারস্পরিক সম্মতিতে সিদ্ধান্ত নিন। ৩. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন: মনে রাখবেন, আল্লাহ প্রতিটি সন্তানের সাথে তার রিজিকও পাঠান। অনেক সময় সন্তান আসার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিকের নতুন দরজা খুলে যায়। ৪. দুআ করতে থাকুন: আল্লাহর কাছে নেক সন্তান এবং আর্থিক উন্নতির জন্য দুআ করতে থাকুন।
সারসংক্ষেপ:
- সাময়িকভাবে সন্তান না নেওয়া (গর্ভনিরোধক ব্যবহার) জায়েয, গুনাহ নয়।
- স্থায়ীভাবে সন্তান ধারণ বন্ধ করা হারাম।
- বর্তমান সংকটে আপনি সাময়িক বিরতি নিতে পারেন, তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না।
আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ও আপনার পরিবারকে উত্তম রিজিক দান করুন এবং ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দিন। আমিন।