কিভাবে নামাজ পড়বো
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমাদের দুপুর থেকে পানি নেই।আর আমি যেহেতু সিজারের রোগী আমার পক্ষে অনেক দূর থেকে পানি টেনে আনা কষ্টকর।
আর ৪ তলায় থাকি কাউকে তেমন চিনিও না যে সেখান থেকে গোসল করে আসব।
আর আমার ননদের বাসায় গেলে যাদি পানি থাকে তা দিয়ে হয়তো ১ জনের গোসল হবে কিন্তু আমরা ২ জন। আমার গোসল ফরজ।
আসলে আসলে আমরা জানতাম না যা পানি থাকবে না এখন কিভাবে সালাত আদায় কবরবো বুঝতে পারছি না৷খুবই পেরেশানিতে আছি।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় বোন, আপনার সমস্যা বুঝতে পেরেছি এবং আপনার উদ্বেগ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। পানি না থাকা অবস্থায় পবিত্রতা অর্জন এবং নামাজ আদায়ের বিধান ইসলামে স্পষ্টভাবে দেওয়া আছে। মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, "আল্লাহ তোমাদের উপর কোনো প্রকার সংকীর্ণতা (কঠিনতা) করতে চান না; বরং তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের উপর তার নেয়ামত সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।" (সূরা আল-মায়িদা: ৬)
আপনার পরিস্থিতিতে নিম্নোক্ত সমাধানগুলো ইসলামি শরিয়ত দিয়েছে:
১. তায়াম্মুম করার বিধান: যেহেতু আপনার কাছে পানি নেই এবং দূর থেকে পানি আনা আপনার জন্য (সিজার রোগী হওয়ায়) কষ্টকর, তাই আপনি পবিত্র মাটি বা মাটিযুক্ত বস্তু (যেমন: ধুলোবালি, পাথর, ইটের টুকরো, দেয়ালের মাটি ইত্যাদি) দ্বারা তায়াম্মুম করতে পারবেন। এটি পানি দ্বারা অজু/গোসলের বিকল্প। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "যদি তোমরা রোগী হও বা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা থেকে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর, আর পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করবে—মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করবে।" (সূরা আল-মায়িদা: ৬)
- প্রথমে নিয়ত করুন (মনে মনে) যে, আমি পবিত্রতা অর্জনের জন্য তায়াম্মুম করছি।
- দুই হাতের তালু পবিত্র মাটিতে/ধুলায় মারুন বা রাখুন।
- উভয় হাত দিয়ে পুরো মুখমণ্ডল মাসেহ করুন।
- আবার হাত মাটিতে মারুন এবং বাম হাত দিয়ে ডান হাত কনুই পর্যন্ত মাসেহ করুন, এরপর ডান হাত দিয়ে বাম হাত কনুই পর্যন্ত মাসেহ করুন।
- (বিস্তারিত নিয়ম হানাফি ফিকহের কিতাবে আছে, যেমন: বেহেশতী জেওর, ফাতাওয়া হিন্দিয়া)
৩. গোসল ফরজ অবস্থায় তায়াম্মুম: যেহেতু আপনার গোসল ফরজ (অর্থাৎ আপনি জুনুব বা হায়েজ-নিফাস থেকে পবিত্র হওয়া প্রয়োজন), সেক্ষেত্রে গোসলের পরিবর্তে একইভাবে তায়াম্মুম করলেই আপনার পবিত্রতা অর্জিত হবে এবং নামাজ পড়া জায়েজ হবে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, অপবিত্রতা (হাদাসে আকবর) দূর করার জন্যও তায়াম্মুম যথেষ্ট। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩২১)
৪. ননদের বাসায় পানি থাকলে: আপনি যদি ননদের বাসায় যান এবং সেখানে পানি থাকে, কিন্তু তা দিয়ে মাত্র ১ জনের গোসল সম্ভব, তাহলে আপনি সেই পানি দিয়ে গোসল করবেন এবং আপনার সাথে থাকা অন্য ব্যক্তি (যেমন: আপনার ননদ বা অন্য কেউ) তায়াম্মুম করে নামাজ পড়বে। অথবা আপনি তায়াম্মুম করে নামাজ পড়বেন এবং অন্য জন গোসল করবে। তবে মনে রাখবেন, পানি যদি অপরের জন্য নির্ধারিত হয় বা অপরের প্রয়োজন থাকে, তাহলে আপনার জন্য তায়াম্মুম করাই উত্তম, যদি পানি ব্যবহারে অন্যের ক্ষতি হয়। কিন্তু যদি পানি আপনার নিজের জন্য ব্যবহার করা যায়, তাহলে গোসল করাই উত্তম।
৫. পানি না পাওয়ার ক্ষেত্রে: আপনি যদি পানির অভাবে তায়াম্মুম করে নামাজ পড়েন, তাহলে আপনার নামাজ সহীহ হবে। পরে যখন পানি পাওয়া যাবে, তখন আপনাকে গোসল করতে হবে এবং ভবিষ্যতের নামাজগুলো পানি দিয়েই পড়তে হবে। তবে ইতিমধ্যে পড়া নামাজগুলো পুনরায় পড়তে হবে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৫; ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৪৩)
৬. গুরুত্বপূর্ণ নোট:
- তায়াম্মুম করার জন্য পানি না পাওয়া বা পানি ব্যবহারে অক্ষম হওয়া শর্ত। আপনার ক্ষেত্রে দুটোই প্রযোজ্য।
- তায়াম্মুমের পর আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত পানি না পান বা তায়াম্মুম ভঙ্গকারী কিছু না ঘটে, ততক্ষণ পর্যন্ত একাধিক নামাজ পড়তে পারবেন।
- পানি পাওয়া গেলে বা পানি ব্যবহারে সক্ষম হলে তায়াম্মুম ভেঙে যাবে।
৭. মানসিক প্রশান্তি: আল্লাহ তায়ালা কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে বাধ্য করেন না। (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬) আপনি এই পরিস্থিতিতে যা করতে পারছেন, আল্লাহ তা-ই গ্রহণ করবেন। আপনি পেরেশান হবেন না। ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
উপসংহার: আপনি এখনই পবিত্র মাটি বা ধুলা দিয়ে তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করুন। এটি আপনার জন্য সম্পূর্ণ জায়েজ। ননদের বাসায় গেলে সেখানে পানি থাকলে গোসল করে নেবেন, আর না থাকলে সেখানেও তায়াম্মুম করবেন। আল্লাহ আপনার অসুবিধা দূর করুন। আমিন।
দলিল:
- সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৬
- সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৮৬
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ১/৩২১
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৫
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী), পবিত্রতা অধ্যায়
- ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৪৩