অন্যের লেখা কপির করে থিসিস লেখা কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার থিসিসে সাব্জেক্ট হচ্ছে ইসলাম ও গনতন্ত্র।আমি বিভিন্ন আর্টিকেল এবং বই থেকে কিছু কিছু বিষয় হুবুহু কপি করতে চাচ্ছি।কপি করে নিজের মত করে সাজাতে চাচ্ছিলাম।কারন এটা এমন একটা টপিক নিজে থেকে এখানে কোনো কথা লিখা সম্ভব হয়।এভাবে থিসিস লিখা কি জায়েজ হবে?
Answer
উত্তর:
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থিসিস বা গবেষণাপত্রে অন্যের লেখা হুবুহু কপি করে নিজের নামে প্রকাশ করা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নয়। এটি প্লেজিয়ারিজম (Plagiarism) বা সাহিত্যিক চুরি হিসেবে গণ্য, যা হারাম ও গুনাহের কাজ। নিম্নে হানাফি ফিকহের কিতাব ও উলামায়ে কিরামের মতামতের আলোকে দলিলসহ উত্তর প্রদান করা হলো।
১. প্লেজিয়ারিজমের শরয়ী হুকুম
ইসলাম জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমানতদারী ও সততার উপর বিশেষ জোর দেয়। কোনো ব্যক্তি অন্যের লেখা বা বক্তব্য নিজের নামে চালিয়ে দিলে তা ধোঁকা ও প্রতারণার শামিল। হাদীস শরীফে এসেছে:
«مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي»
"যে প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০১)
প্লেজিয়ারিজম একটি বৌদ্ধিক প্রতারণা, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। হানাফি ফিকহের কিতাব রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
«يَحْرُمُ عَلَى الشَّخْصِ أَنْ يَنْسِبَ كَلَامَ غَيْرِهِ إِلَى نَفْسِهِ دُونَ ذِكْرِ الْمَصْدَرِ»
"কারো জন্য অন্যের কথা নিজের দিকে সম্বন্ধ করা (উৎস উল্লেখ ছাড়া) হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১২)
২. হুবুহু কপি করা ও নিজের মতো সাজানোর বিধান
আপনি যদি হুবুহু কপি করে শুধু বিন্যাস পরিবর্তন করেন, কিন্তু মূল বক্তব্য ও শব্দাবলী অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে সেটিও প্লেজিয়ারিজমের আওতাভুক্ত। তবে আপনি যদি নিজের ভাষায় অর্থ ও মর্ম বর্ণনা করেন এবং সাথে উৎস উল্লেখ করেন, তাহলে তা জায়েয হবে।
হানাফি ফকীহ ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) লিখেছেন:
«إِذَا نَقَلَ كَلَامَ غَيْرِهِ بِمَعْنَاهُ، فَلَا بَأْسَ بِهِ شَرْطَ أَنْ يَذْكُرَ الْمَصْدَرَ»
"যদি কেউ অন্যের কথা অর্থসহ (নিজের ভাষায়) বর্ণনা করে, তবে তাতে কোনো দোষ নেই, তবে শর্ত হলো উৎস উল্লেখ করতে হবে।" (শরহুল মাআনিল আসার, ১/১২)
সুতরাং বিন্যাস, মূল বক্তব্য পরিবর্তন করতে হবে।
৩. থিসিসের ক্ষেত্রে করণীয়
আপনার থিসিসের বিষয় ইসলাম ও গণতন্ত্র—এ ক্ষেত্রে আপনি বিভিন্ন বই ও আর্টিকেল থেকে তথ্য নিতে পারেন, তবে:
- উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহার করে হুবুহু কপি করলে অবশ্যই লেখকের নাম, বইয়ের নাম, পৃষ্ঠা নম্বর উল্লেখ করতে হবে।
- গবেষণার মূল অংশ আপনার নিজস্ব বিশ্লেষণ ও মতামত হতে হবে। সম্পূর্ণ কপি করে সাজানো জায়েয নয়।
হানাফি আলেম মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) ফতোয়ায় বলেন:
"গবেষণায় অন্যের অবদান স্বীকার করা এবং যথাযথ উল্লেখ করা ইলমী আমানতের অংশ। এটি না করলে গুনাহ হবে এবং গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫২৫)
৪. শরয়ী বিকল্প
আপনি যদি নিজে থেকে লেখা কঠিন মনে করেন, তাহলে:
- নোট তৈরি করুন—বিভিন্ন বই থেকে মূল পয়েন্ট সংগ্রহ করুন।
- প্যারাফ্রেজ করুন—প্রত্যেকটি পয়েন্ট নিজের ভাষায় লিখুন।
- উৎস উল্লেখ করুন—প্রত্যেক তথ্যের শেষে ব্র্যাকেটে উৎস দিন।
- অধ্যায় শেষে রেফারেন্স তালিকা সংযুক্ত করুন।
এভাবে করলে আপনার থিসিস ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জায়েয হবে এবং একাডেমিক সততারও পরিপন্থী হবে না।
৫. উপসংহার
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, হুবুহু কপি করে নিজের নামে প্রকাশ করা বা উৎস উল্লেখ না করে সাজানো জায়েয নয়। তাই আপনি অন্যের লেখা ব্যবহার করলে নিম্নোক্ত শর্তগুলো পালন করুন:
- উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।
- গবেষণার মূল অংশ নিজস্ব চিন্তা ও বিশ্লেষণ দ্বারা পূর্ণ করুন।
- আমানতদারী বজায় রাখুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন এবং আপনার থিসিসকে বরকতময় করুন। আমীন।
আল্লাহু আ'লাম বিস সওয়াব।