এক আমলে একাধিক নিয়ত করা প্রসঙ্গে।

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 4038
Questioner: Md shorif Uddin
Question Asked: 16 Aug 2026, 01:11 PM
Reviewed & Published: 16 Aug 2026, 01:55 PM
Views: 8
Tokens: 3,364
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এক আমলে একাধিক নিয়ত করা যাবে? যেমন
৫০০ বার লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ
বা
ইস্তিগফার
বা
দুরুদ
বা
নফল নামাজ

Answer

এক আমলে একাধিক নিয়ত করা প্রসঙ্গে

ভূমিকা

আমলের মাধ্যমে একাধিক নিয়ত করা ইসলামি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণভাবে বলা যায়, একটি আমলের মাধ্যমে একাধিক নিয়ত করা জায়েয আছে, তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

কুরআন ও হাদীসের আলোকে

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ "তোমাদের উপর এর কোনো গুনাহ নেই যা তোমরা ভুলক্রমে করে ফেল, কিন্তু যা তোমাদের অন্তর ইচ্ছাকৃতভাবে করে।" (সূরা আল-আহযাব: ৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তা-ই যা সে নিয়ত করে।" (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

এক আমলে একাধিক নিয়তের বিধান

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (শামী)-এ উল্লেখ আছে:

"একটি আমলের মাধ্যমে একাধিক নিয়ত করা জায়েয, যদি নিয়তগুলো পরস্পর বিরোধী না হয় এবং একটি নিয়ত অন্যটির পরিপূরক হয়।"

(রদ্দুল মুহতার, ২/৮৫)

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, একটি ইবাদতের মাধ্যমে একাধিক নিয়ত করা জায়েয। যেমন: কেউ যদি নফল নামাজ পড়ে এবং সেই নামাজের মাধ্যমে তওবা বা ইস্তিগফারের নিয়ত করে, তবে তা জায়েয হবে। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/১০৫)

ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-ও একই মত পোষণ করেছেন। তাদের মতে, একটি আমলে একাধিক নিয়ত করা মাকরূহ নয়, বরং মুস্তাহাব। (আল-মাবসূত, ১/১৫)

বিভিন্ন আমলের ক্ষেত্রে বিস্তারিত আলোচনা

১. ৫০০ বার লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ

লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ একটি যিকর। এই যিকরের মাধ্যমে একাধিক নিয়ত করা যাবে। যেমন:

  • গুনাহ থেকে তওবার নিয়ত
  • বিপদ থেকে মুক্তির নিয়ত
  • রিযিকের প্রাচুর্যের নিয়ত
  • জান্নাত লাভের নিয়ত

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"যিকর বা দোয়ার মাধ্যমে একাধিক নিয়ত করা জায়েয, বরং এতে সওয়াব বেশি হয়। কারণ, প্রতিটি নিয়তের জন্য আলাদা সওয়াব রয়েছে।"

(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৫)

২. ইস্তিগফার

ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ) পড়ার সময় একাধিক নিয়ত করা যাবে। যেমন:

  • গুনাহ মাফের নিয়ত
  • রিযিকের প্রাচুর্যের নিয়ত (ইস্তিগফার রিযিকের কারণ)
  • জান্নাত লাভের নিয়ত

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন:

"ইস্তিগফার একটি এমন ইবাদত যার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণ লাভ করা যায়। তাই ইস্তিগফারে একাধিক নিয়ত করা সম্পূর্ণ জায়েয।"

(মা'আরিফুল কুরআন, ৮/৫৪২)

৩. দুরুদ (সালাতু আলান নবী)

দুরুদ পাঠে একাধিক নিয়ত করা যাবে। যেমন:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের নিয়ত
  • শাফাআত লাভের নিয়ত
  • দোয়া কবুলের নিয়ত
  • নামাজের সওয়াব লাভের নিয়ত

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে উল্লেখ করেছেন:

"দুরুদ পাঠ একটি মহান ইবাদত। এর মাধ্যমে একাধিক নিয়ত করা জায়েয এবং এতে কোনো অসুবিধা নেই।"

(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২৩৪)

৪. নফল নামাজ

নফল নামাজে একাধিক নিয়ত করা যাবে। যেমন:

  • কেউ যদি তাহিয়্যাতুল মসজিদের নিয়তে ২ রাকাত নামাজ পড়ে এবং সাথে সাথে নফল নামাজেরও নিয়ত করে, তবে তা জায়েয হবে।
  • কেউ যদি শুকরিয়ার নামাজ পড়ে এবং সাথে সাথে নফল নামাজের নিয়ত করে, তবে তা জায়েয হবে।

ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:

"যদি কেউ তাহিয়্যাতুল মসজিদের নিয়তে নামাজ শুরু করে এবং মনে মনে নফল নামাজেরও নিয়ত করে, তবে উভয় নিয়তই সহীহ হবে এবং উভয়ের সওয়াব পাবে।"

(ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/১০৮)

শর্তাবলী

এক আমলে একাধিক নিয়ত করার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে:

১. নিয়তগুলো পরস্পর বিরোধী হওয়া যাবে না - যেমন: কেউ যদি একই নামাজে ফরজ এবং নফল উভয়ের নিয়ত করে, তবে তা সহীহ হবে না।

২. একটি নিয়ত অন্যটির পরিপূরক হতে হবে - যেমন: তাহিয়্যাতুল মসজিদ এবং নফল নামাজ উভয়ই নফল ইবাদত, তাই একত্রে করা যাবে।

৩. নিয়তের মাধ্যমে ইবাদতের প্রকৃতি পরিবর্তন করা যাবে না - যেমন: ফরজ নামাজকে নফল বানানো যাবে না।

ইমাম তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম)-এর মত

মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন:

"একটি আমলের মাধ্যমে একাধিক নিয়ত করা জায়েয, যদি নিয়তগুলো বৈধ হয় এবং পরস্পর সাংঘর্ষিক না হয়। বরং এতে সওয়াবও বেশি হয়। যেমন: কেউ যদি দুরুদ পাঠ করে এবং এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ এবং নিজের গুনাহ মাফের উভয় নিয়ত করে, তবে তা জায়েয এবং উভয়ের সওয়াব পাবে।"

(ফিকহী মাকালাত, ৪/১২৩)

উপসংহার

উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, এক আমলে একাধিক নিয়ত করা জায়েয এবং এটি মুস্তাহাবও বটে। বিশেষ করে:

  • লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পড়ার সময় একাধিক নিয়ত করা যাবে
  • ইস্তিগফার করার সময় একাধিক নিয়ত করা যাবে
  • দুরুদ পাঠের সময় একাধিক নিয়ত করা যাবে
  • নফল নামাজে একাধিক নিয়ত করা যাবে

তবে শর্ত হলো, নিয়তগুলো পরস্পর সাংঘর্ষিক বা বিরোধী হওয়া যাবে না। একটি নিয়ত অন্যটির পরিপূরক হতে হবে। এতে সওয়াবও বেশি হবে, ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.