হজ্ব/উমরাহ উদ্দেশ্যে যখন বের হব, পথিমধ্যে কসর করতে হবে?
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
১। হজ্ব/উমরাহ উদ্দেশ্যে যখন বের হব, পথিমধ্যে যোহর/আসর/ এশা সালাতের ওয়াক্ত হলে তা কি কসর আদায় করতে হবে?
২| আরাফা থেকে মুজদালিফায় সূর্যাস্তের পর যাওয়ার পর সেখানে মাগরিবের ওয়াক্তে মাগরিব-এশা একসাথে আদায় করব নাকি এশা সালাতের ওয়াক্তে মাগরিব-এশা একসাথে আদায় করব?
৩| কোনো সুস্থ নারীর উপর হজ্ব ফরয হয়েছে, তবে তার মাহরাম নেই। এতে বদলী হজ্ব করাতে পারবেন?
৪| দারসে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলেছেন যে হজ্ব ফরয কিন্তু হজ্বে যাওয়ার মত অর্থ নেই, কিন্তু উমরাহ যাওয়ার মত অর্থ আছে, এক্ষেত্রে যদি এমন নিয়ত করেন আগে উমরাহ করলে আল্লাহ তা'য়ালা বরকত দিবেন, পরবর্তীতে হজ্বে যাওয়া সুযোগ হয়।
এখানে হজ্ব ফরয কিন্তু হজ্ব যাওয়ার মত অর্থ নেই, এই কথা দ্বারা কি বুঝিয়েছেন? হজ্বে যাওয়ার মত টাকাসহ কি হজ্ব ফরয হয় না?
৫| কেউ বার্থডে পালন করে কেক এনে দিলে তা খাওয়া কি জায়েজ?
৬| সোমবার এবং বৃহস্পতিবার আমল পেশ করা হয়। তো এটা কি শুধুই সোমবার এবং বৃহস্পতিবারের আমল পেশ করা কথা বলা হয়েছে নাকি পুরো সপ্তাহের আমল সোমবার এবং বৃহস্পতিবারে পেশ করা হয়?
৭| ওজু করার সময় ভুলে তারতীব রক্ষা না করলে অর্থাৎ নাক ধৌত করার আগে মুখ ধৌত করে ফেললে ওজু হবে? এজন্য
পরে পুনরায় যদি আবার ওজু করি তাহলে এরকম করা ঠিক হবে?
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নগুলোর জবাব নিম্নরূপ দেওয়া হলো:
১. সফরে কসর (সংক্ষিপ্ত) সালাত আদায়
হ্যাঁ, শরীয়তের দৃষ্টিতে উক্ত অবস্থায় চার রাকাতবিশিষ্ট ফরয সালাতগুলো দুই রাকাত করে আদায় করা ওয়াজিব। এটি কসর নামে পরিচিত। তবে ফজর ও মাগরিবের সালাতে কসর নেই; এগুলো পূর্ণ আদায় করতে হবে।
কসর করার জন্য সফরটি কমপক্ষে ৭৮ কিলোমিটার (প্রায় ৪৮ মাইল) দূরত্বের হতে হবে এবং সেখানে ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত থাকতে হবে।
হজ্ব বা উমরাহর উদ্দেশ্যে বের হলে সাধারণত এই শর্ত পূরণ হয়, তাই কসর আদায় করবেন।
দলিল: কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "আর যখন তোমরা জমিনে সফর করো, তখন সালাতে কসর করা তোমাদের উপর কোনো গুনাহ নয়..." (সূরা আন-নিসা: ১০১)। হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) সফরে দুই রাকাত করে আদায় করেছেন। (সহীহ বুখারী: ১০৮২)
২. মুযদালিফায় মাগরিব ও এশার সালাত
আরাফা থেকে মুযদালিফায় মাগরিবের এয়াক্তে পৌঁছে গেলে মাগরিবের ওয়াক্তে মাগরিব ও এশার সালাত একসাথে আদায় করতে পারবেন।
উল্লেখ্য সূর্য ডুবে যাওয়ার পর আরাফা হতে বের হয়ে মাগরিবের ওয়াক্তে মুজদালিফায় পৌঁছা অনেকটাই কষ্টকর,অসম্ভবও বটে।
দলিল: হাদীসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) মুযদালিফায় পৌঁছে মাগরিব ও এশা উভয় সালাত একত্রে আদায় করেছেন। (সহীহ মুসলিম: ১২১৮)। হানাফী মাযহাব মতে, এটি জাম' তাখীর (এশার ওয়াক্তে) নয়, বরং জাম' তাকদীম (মাগরিবের ওয়াক্তে) হিসেবে গণ্য হবে এবং উভয় সালাতের মধ্যে কোনো নফল সালাত আদায় করা যাবে না।
৩. মাহরাম ছাড়া নারীর হজ্ব ও বদলী হজ্ব
যে সুস্থ নারীর উপর হজ্ব ফরয হয়েছে কিন্তু তার সাথে যাওয়ার মতো কোনো মাহরাম (স্বামী বা নিকটাত্মীয় পুরুষ) নেই, তার জন্য হজ্বে যাওয়া ওয়াজিব নয়। তবে হজ্ব ফরয হওয়ার কারণে তার উপর হজ্বের দায়িত্ব থেকে যায়।
বদলী হজ্ব: এই অবস্থায় তার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করানো জায়েয হবে না, কারণ বদলী হজ্বের অনুমতি কেবল সেই ব্যক্তির জন্য, যে ব্যক্তি শারীরিকভাবে অক্ষম (বার্ধক্য, অসুস্থতা) বা মৃত। সুস্থ নারী নিজে হজ্ব করতে সক্ষম, কিন্তু মাহরাম না থাকার কারণে সফর করতে পারছে না—এই অবস্থায় তার জন্য বদলী হজ্ব করানো বৈধ নয়। বরং যখনই মাহরামের ব্যবস্থা হবে, তখনই তাকে নিজে হজ্ব আদায় করতে হবে।
দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি হজ্ব করতে সক্ষম নয় (শারীরিকভাবে), সে যেন তার পক্ষ থেকে অন্য কাউকে হজ্ব করায়।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৮১১)। এখানে "সক্ষম নয়" বলতে শারীরিক অক্ষমতাকে বোঝানো হয়েছে, মাহরামের অভাবকে নয়।
৪. "হজ্ব ফরয কিন্তু যাওয়ার মত অর্থ নেই" কথাটির ব্যাখ্যা
আপনি দারসে যে কথা শুনেছেন, তার অর্থ হলো: হজ্ব ফরয হওয়ার জন্য শর্ত হলো, ব্যক্তির কাছে হজ্বের সফরে যাওয়া থাকার খরচ বাবদ অতিরিক্ত অর্থ থাকা, যা তার পরিবারের ভরণপোষণ ও ঋণ পরিশোধের পর অবশিষ্ট থাকে। যদি কারো কাছে হজ্বের খরচের সমপরিমাণ অর্থ না থাকে, তাহলে তার উপর হজ্ব ফরয হয় না।
কিন্তু প্রশ্নে উল্লেখিত প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, "হজ্ব ফরয কিন্তু যাওয়ার মত অর্থ নেই"—এর অর্থ হলো, ব্যক্তির উপর হজ্ব ফরয হয়েছে (অর্থাৎ সে শর্ত পূরণ করেছে), কিন্তু বর্তমানে তার হাতে নগদ টাকা নেই বা সফরের সামর্থ্য নেই। এই অবস্থায় সে যদি উমরাহ করার নিয়ত করে এবং উমরাহ সম্পন্ন করে, তাহলে তা জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। তবে হজ্ব ফরয থাকায় তাকে পরবর্তীতে যখনই সামর্থ্য হবে, তখনই হজ্ব আদায় করতে হবে। উমরাহ করলে হজ্বের ফরয রহিত হবে না।
সারকথা: হজ্ব ফরয হওয়ার জন্য "যাওয়ার মত টাকা" থাকা শর্ত। টাকা না থাকলে হজ্ব ফরয হয় না। কিন্তু প্রশ্নের প্রসঙ্গে "ফরয হয়েছে" বলতে বোঝানো হয়েছে যে, তার উপর হজ্ব ফরয হয়েছে কিন্তু বর্তমানে সফরের সামর্থ্য নেই, তাই সে উমরাহ করছে এবং পরবর্তীতে হজ্ব করবে।
৫. বার্থডে পালন করে কেক খাওয়া
ইসলামে বার্থডে (জন্মদিন) পালন করা কোনো অনুষ্ঠান নয়। এটি অমুসলিমদের সংস্কৃতি থেকে প্রচলিত একটি রীতি। তাই ইসলামী দৃষ্টিতে বার্থডে পার্টি করা বা তাতে অংশগ্রহণ করা কেক কাটা সবই নাজায়েজ।
৬. সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমল পেশ করা
হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সোমবার ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়।" (সুনানে আবু দাউদ: ২৪৩৬)।
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন, পুরো সপ্তাহের আমল সোমবার ও বৃহস্পতিবার আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। অর্থাৎ, সপ্তাহের অন্যান্য দিনের আমলগুলো জমা হয়ে এই দুই দিন আল্লাহর কাছে উপস্থাপন করা হয়। তবে, ফজরের পর এবং আসরের পরের সময়গুলোতে আমল পেশ করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
৭. ওজুতে তারতীব (ধারাবাহিকতা) ভুলে গেলে
ওজুতে তারতীব (ধারাবাহিকতা) রক্ষা করা সুন্নত। অর্থাৎ, প্রথমে মুখ, তারপর নাক, তারপর মুখমণ্ডল ইত্যাদি ধোয়া সুন্নত। যদি কেউ ভুলে গিয়ে নাক ধোয়ার আগে মুখ ধুয়ে ফেলে, তাহলে তার ওজু আদায় হয়ে যাবে (বৈধ হবে), তবে সুন্নত তরিকা লঙ্ঘিত হওয়ার কারণে কিছুটা কম সওয়াব হবে।
পুনরায় ওজু করা: এই অবস্থায় পুনরায় ওজু করা ঠিক হবে এবং উত্তমও। কারণ, নতুন করে সঠিক তারতীবসহ ওজু করলে সুন্নতের অনুসরণ হবে এবং পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে। তবে, প্রথম ওজুটি ভুল হওয়ার কারণে বাতিল হবে না; বরং তা সহীহ ছিল। তাই নতুন ওজু করলে সেটিই চূড়ান্ত ওজু হিসেবে গণ্য হবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমিন)