ফজরের জামাত চলাকালীন ইমাম ২য় রাকাতের রুকুতে যাওয়ার আগ মুহূর্তেও যদি মুক্তাদি ২ রাকাত সুন্নত নামাজ শেষ করতে না পারে, তাহলে করণীয় কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
ফজরের সুন্নত নামাজ ছেড়ে জামাতে শরিক হওয়ার বিধান
উত্তর: হ্যাঁ, ফজরের জামাত শুরু হয়ে গেলে এবং ভয় থাকে যে, সুন্নত নামাজ শেষ করলে জামাতের তাকবিরে উলার (প্রথম তাকবির) অংশগ্রহণ বা জামাত পাওয়া যাবে না, তাহলে সুন্নত নামাজ ছেড়ে দিয়ে জামাতে শরিক হওয়া উচিত। এটি হানাফি মাজহাবের স্পষ্ট মত।
দলিল ও প্রমাণ:
১. হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِذَا أُقِيمَتِ الصَّلَاةُ فَلَا صَلَاةَ إِلَّا الْمَكْتُوبَةَ" "যখন নামাজের ইকামত দেওয়া হয়, তখন ফরজ নামাজ ছাড়া অন্য কোনো নামাজ (সুন্নত/নফল) নেই।" (সহিহ মুসলিম: ৭১০; আবু দাউদ: ১২৬৬; তিরমিজি: ৪২১)
২. হাদিস: আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِذَا أُقِيمَتِ الصَّلَاةُ فَلَا صَلَاةَ إِلَّا الْمَكْتُوبَةَ" (সহিহ মুসলিম: ৭১০)
হানাফি ফিকহের ব্যাখ্যা:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, যখন ইকামত দেওয়া হয়, তখন সুন্নত নামাজ শুরু করা মাকরুহে তাহরিমি। আর যদি সুন্নত নামাজ শুরু করে থাকে, তাহলে দুই রাকাত ফজরের সুন্নতের ক্ষেত্রে—যদি জামাত পাওয়ার আশঙ্কা থাকে—সুন্নত ছেড়ে দিয়ে জামাতে শরিক হওয়া জরুরি।
ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, ফজরের সুন্নত শুরু করলে তা সম্পন্ন করা উচিত, তবে জামাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে ছেড়ে দেওয়া উত্তম। কিন্তু অধিকাংশ হানাফি ফুকাহার মতে, জামাতের গুরুত্ব বেশি।
ইবনে আবিদিন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
"إذا أقيمت الصلاة فلا صلاة إلا المكتوبة، فلو كان في سنة الفجر يتمها إن لم يخف فوات الجماعة، وإن خاف فواتها يقطعها ويدخل في الجماعة" "যখন ইকামত দেওয়া হয়, তখন ফরজ ছাড়া অন্য নামাজ নেই। যদি কেউ ফজরের সুন্নত শুরু করে থাকে, তাহলে জামাত ছুটে যাওয়ার ভয় না থাকলে তা সম্পন্ন করবে; আর জামাত ছুটে যাওয়ার ভয় থাকলে তা ছেড়ে দিয়ে জামাতে শরিক হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ২/৮৭)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে বলা হয়েছে:
"إذا خاف فوت الجماعة في سنة الفجر يقطعها ويدخل في الجماعة" "ফজরের সুন্নতে জামাত ছুটে যাওয়ার ভয় থাকলে তা ছেড়ে দিয়ে জামাতে শরিক হবে।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/১০৮)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:
"ফজরের সুন্নত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জামাতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। জামাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে সুন্নত ছেড়ে দিয়ে জামাতে শরিক হওয়া উচিত।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২৫৩)
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"যদি মুক্তাদি দেখে যে, সুন্নত শেষ করলে জামাতের প্রথম তাকবির বা রুকু পাওয়া যাবে না, তাহলে সে সুন্নত ছেড়ে দিয়ে জামাতে শরিক হবে। তবে যদি নিশ্চিত হয় যে, সুন্নত শেষ করার পরও জামাত পাবে, তাহলে সুন্নত শেষ করে জামাতে যাবে।" (ফিকহুল বুখারী, ২/১২৫)
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
১. ইমাম ২য় রাকাতে রুকুতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে যদি মুক্তাদি ২ রাকাত সুন্নত শেষ করতে না পারে, তাহলে সে সুন্নত ছেড়ে দিয়ে জামাতে শরিক হবে। কারণ, ইমামের রুকুতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে জামাতে শরিক হলে সে ঐ রাকাত পেয়ে যাবে।
২. সুন্নত ছেড়ে দেওয়ার পর জামাতে শরিক হলে, সে ইমামের সাথে নামাজ আদায় করবে। ফজরের ফরজ শেষে সুন্নতের কাজা করার প্রয়োজন নেই (হানাফি মাজহাব মতে ফজরের সুন্নতের কাজা নেই, তবে সূর্যোদয়ের পর চাশতের সময় ২ রাকাত পড়তে পারে)।
৩. জামাতের প্রথম তাকবির পাওয়া অত্যন্ত ফজিলতের বিষয়। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ৪০ দিন জামাতের প্রথম তাকবির পাবে, তার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও মুনাফিকি থেকে মুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। (তিরমিজি: ২৪১)
সারসংক্ষেপ:
ফজরের জামাত শুরু হয়ে গেলে এবং সুন্নত শেষ করলে জামাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে, সুন্নত ছেড়ে দিয়ে জামাতে শরিক হওয়াই সঠিক সিদ্ধান্ত। এটি হানাফি মাজহাবের প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত।
والله أعلم بالصواب