ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করা যাবে কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এখন প্রশ্ন হচ্ছে অজু করার সময় ও কি ব্যান্ডেজ এর উপরে এবং তার আশেপাশে মাসেহ করে নিবে নাকি ব্যান্ডেজ খুলেই ওর অজু করতে হবে?
Answer
ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করার বিধান
প্রশ্নের উত্তর:
আপনার ভাইয়ের পায়ের বৃদ্ধা আঙুলের নখ অপারেশনের মাধ্যমে উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। ক্ষতস্থানে পানি লাগানো যাবে, কিন্তু ধূলোবালি থেকে রক্ষার জন্য ব্যান্ডেজ করা প্রয়োজন। এখন প্রশ্ন হলো, অজু করার সময় ব্যান্ডেজ খুলে অজু করতে হবে নাকি ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করলেই চলবে?
ইসলামী বিধান:
হানাফী মাযহাবের নিম্নোক্ত বিধান অনুযায়ী:
১. ক্ষতস্থান ঢাকা থাকলে মাসেহ করার নিয়ম:
যদি ক্ষতস্থানে পানি লাগানো ক্ষতির কারণ হয় বা ক্ষত সারাতে বাধা সৃষ্টি করে, তবে ক্ষতস্থানের উপর মাসেহ করা জায়েয। কিন্তু যদি পানি লাগানো ক্ষতির কারণ না হয় (যেমন ডাক্তার বলেছেন পানি লাগানো যাবে), তাহলে ক্ষতস্থান ধুয়ে ফেলতে হবে।
২. ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ:
যেহেতু ডাক্তার বলেছেন ক্ষতস্থানে পানি লাগানো যাবে, তাই মূলত ক্ষতস্থান ধোয়ার প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হলো বারবার ব্যান্ডেজ খুললে অসুবিধা হয় এবং নিজে ব্যান্ডেজ করতে পারে না।
৩. হানাফী ফিকহের নিয়ম:
হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (শামী) এবং ফাতাওয়া হিন্দিয়া তে উল্লেখ আছে:
- যদি ক্ষতস্থানে পানি লাগানো ক্ষতির কারণ হয়, তবে ক্ষতস্থানের উপর মাসেহ করা যাবে।
- যদি পানি লাগানো ক্ষতির কারণ না হয়, তবে ধোয়া আবশ্যক।
- তবে যদি বারবার ব্যান্ডেজ খোলা-বাঁধা কষ্টকর হয় এবং রোগীর জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করে, তবে ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করার অনুমতি রয়েছে।
৪. জরুরতের ক্ষেত্রে:
যেহেতু আপনার ভাই নিজে ব্যান্ডেজ করতে পারেন না এবং বারবার ব্যান্ডেজ খুললে অনেক ব্যান্ডেজ লাগবে এবং অসুবিধা হবে, তাই এই অবস্থায় ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করা জায়েয হবে।
মাসেহ করার নিয়ম:
১. অজুর সময় পায়ের অন্যান্য অংশ (সুস্থ অংশ) ধুয়ে ফেলবেন। ২. ব্যান্ডেজের উপর ভেজা হাত দিয়ে মাসেহ করবেন। ৩. ব্যান্ডেজের আশেপাশের সুস্থ অংশ ধুয়ে ফেলবেন। ৪. ক্ষতস্থান যদি ব্যান্ডেজের বাইরে কিছু অংশ থাকে, সেটুকু ধুয়ে ফেলতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ শর্ত:
- মাসেহ শুধুমাত্র ক্ষতস্থানের উপর ঢাকা ব্যান্ডেজের উপরই করা যাবে, পুরো পায়ে নয়।
- ব্যান্ডেজ খোলা সম্ভব হলে এবং অসুবিধা না হলে খুলে ধোয়াই উত্তম।
- এই মাসেহের বিধান শুধুমাত্র ঐ সময় পর্যন্ত প্রযোজ্য যতক্ষণ ক্ষত না শুকায় বা ব্যান্ডেজের প্রয়োজন থাকে।
দলিল:
কুরআনুল কারীম: "আল্লাহ তোমাদের উপর কোনো সংকীর্ণতা (কঠিনতা) করতে চান না; বরং তিনি চান তোমাদের পবিত্র করতে এবং তোমাদের উপর তার নেয়ামত পূর্ণ করতে, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।" (সূরা মায়িদা: ৬)
হাদীস শরীফ: হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আহত হলে তার মাথায় জখম হলো। অতঃপর তার গোসল ফরজ হলো। সে পানি ব্যবহার করল এবং মৃত্যুবরণ করল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: "তারা তাকে হত্যা করেছে, আল্লাহ তাদেরকে হত্যা করুন। তারা জানত না যে, না জানার কারণে জিজ্ঞাসা করা ছিল তাদের জন্য শিফা (প্রতিকার)। আর অসুস্থ ব্যক্তির জন্য তায়াম্মুমই যথেষ্ট ছিল অথবা ক্ষতস্থানে মাসেহ করা এবং বাকি অংশ ধোয়া।" (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)
ফাতাওয়া হিন্দিয়া: "যদি ক্ষতস্থানে পানি দেওয়া ক্ষতিকর হয়, তবে ক্ষতের উপর মাসেহ করবে। আর যদি ক্ষতিকর না হয়, তবে ধুয়ে ফেলবে।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৯)
রদ্দুল মুহতার: "যদি ক্ষতস্থান ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢাকা থাকে এবং তা খুললে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করা জায়েয।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৩২০)
উপসংহার:
আপনার ভাইয়ের ক্ষেত্রে, যেহেতু:
- বারবার ব্যান্ডেজ খোলা-বাঁধা কষ্টকর
- নিজে ব্যান্ডেজ করতে পারেন না
- অনেক ব্যান্ডেজের প্রয়োজন হবে
তাই তিনি ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করে অজু করতে পারবেন। তবে ক্ষত শুকিয়ে গেলে এবং ব্যান্ডেজের প্রয়োজন না থাকলে স্বাভাবিক নিয়মে পা ধুয়ে অজু করবেন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।