মাশওয়ারা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
বাবা যদি মেয়েকে সহশিক্ষায় পাবলিক ভার্সিটিতে বা ন্যাশনালে কম্বাইন্ডে পড়াতে চায় মেয়ে যদি পড়তে না চায় জেনারেলে তাহলে কি মেয়ের গুনাহ হবে?
এমনকি মহিলা কলেজের স্যারদের পছন্দ না হওয়ায় বাবার তীব্র ক্ষোভ আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেয়ে যদি পড়তে না চায় তাহলে কি মেয়ের গুনাহ হবে?
এক্ষেত্রে বাবা যদি বিভিন্ন অফিসের কলিগ, বন্ধু-বান্ধবকে এমনকি এক বান্ধবীকে কল দিয়ে মেয়ের ব্যাপারে পরামর্শ করর এবং মেয়ে মাদ্রাসায় পড়তে চায়,সহশিক্ষায় যেতে চায় না,ছোট ভাইয়ের সামনে(নন মাহরাম) পর্দা করে এগুলো আলোচনা করর আক্ষেপ করে।বলে যে "জীবনেও ভাবি নাই,আমার মেয়েটা এত কট্টরপন্থী আর গোঁড়া হয়ে যাবে, পর্দা করলে কি দুনিয়া সমাজ ছেড়ে দিতে হয় নাকি, সে বাইরে গেলেও ঠিকমত খায় না নিকাবের জন্য"।
আগের বান্ধবির সাথে বলছে মাদ্রাসায় পড়তে চায় এই কথা বলে দুজন মিলে হাসাহাসি করছে।
এই কথার সুরে স্পষ্ট আক্ষেপ ফুটে উঠে যে তার মেয়ে এমন কেন হলো।
এমনকি মেয়ে জেনারেলে পড়তে চায় না বলে সাইকোলজি ডাক্তার দেখানোর কথাও বলছিলো বান্ধবীকে।
মেয়ে বিসিএস দিয়ে চাকরি করবে না এমন বাবাকে বুঝানোর বিষয়কে বিদ্রুপ করে বলে," মেয়ে আমাকে এগুলো বুঝায়, কি একটা অবস্থা "
মাঝখানে ২ ৩ মাস বিয়ের জন্য ট্রাই করেছে, মানে কিছু প্রস্তাব এসেছিলো কিন্তু কথা আগায়নাই তাই বাবা বলেন, "কোথাও ভর্তি না হলে বিয়ে হবে না"
মেয়ের কি করা উচিত?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। এখানে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি:
১. মেয়ের পক্ষ থেকে সহশিক্ষা (co-education) প্রতিষ্ঠানে না পড়ার সিদ্ধান্ত:
মেয়ে যদি ইসলামী আদর্শ ও পর্দার খাতিরে সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (পাবলিক ভার্সিটি বা ন্যাশনাল কম্বাইন্ড) পড়তে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তা সম্পূর্ণ বৈধ এবং শরীয়তসম্মত সিদ্ধান্ত। এতে তার কোনো গুনাহ হবে না, বরং এটি তার দ্বীনদারি ও আত্মসম্মানের পরিচায়ক। ইসলামে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ "আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের যুগের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন করো না।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
তাই মেয়ের এই সিদ্ধান্ত শরীয়তসম্মত এবং তার জন্য গুনাহের বিষয় নয়।
২. বাবার অবাধ্য হওয়ার প্রশ্নে:
ইসলামে পিতা-মাতার আনুগত্য ফরজ, তবে তা কেবল বৈধ বিষয়ে। যদি বাবা কোনো গুনাহের কাজে আদেশ করেন, তবে সেক্ষেত্রে বাবার আনুগত্য করা জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানির ক্ষেত্রে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮)
যেহেতু সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়া শরীয়তের দৃষ্টিতে সমস্যাযুক্ত (বিশেষত পর্দা ও মেলামেশার কারণে), তাই মেয়ে যদি তা না পড়ে, তবে তা বাবার অবাধ্যতা হিসেবে গণ্য হবে না। বরং মেয়ে বাবার সাথে ভালো ব্যবহার ও সম্মান বজায় রেখে, নম্রভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করবে।
৩. মেয়ের করণীয়:
- ধৈর্য ও হিকমাহ: মেয়েকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং বাবার সাথে নম্র ভাষায় কথা বলতে হবে। বাবার রাগ ও ক্ষোভকে সম্মান করতে হবে, তবে দ্বীনের বিষয়ে আপস করা যাবে না।
- দুআ: মেয়ের উচিত আল্লাহর কাছে বাবার হিদায়াতের জন্য দুআ করা।
- মাধ্যমিক ব্যক্তির সাহায্য: বাবা যাদের কথা শোনেন, তাদের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে বিদ্রুপ বা ব্যঙ্গের জবাব ব্যঙ্গে না দেওয়া।
- বিকল্প প্রস্তাব: মেয়ে মাদ্রাসায় পড়তে চায়, এটি একটি উত্তম বিকল্প। বাবাকে বোঝানো উচিত যে মাদ্রাসায় পড়েও উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সুযোগ রয়েছে (যেমন: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা থেকে আলিম/ফাযিল/কামিল পাশ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে)। বাবা যদি মনে করেন মেয়ে বিসিএস দেবে না, তবে তাকে বোঝানো যেতে পারে যে ইসলামী পরিবেশে থেকে পড়াশোনা করে দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ই হাসিল করা যায়।
৪. বাবার আচরণ সম্পর্কে:
বাবার উচিত মেয়ের দ্বীনদারিকে সম্মান করা। মেয়ে পর্দা করে, নিকাব পরে—এটি গোঁড়ামি নয়, বরং ইসলামী আদর্শ। বাবার উচিত মেয়ের এই গুণের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ يَرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ "নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন যে, তার বান্দার উপর তার নেয়ামতের চিহ্ন দেখা যাক।" (তিরমিজি: ২৮১৯)
তবে বাবার আচরণে যে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে, তা মেয়ের জন্য কষ্টদায়ক। মেয়ের উচিত বাবার সাথে আরও বেশি সদয় ব্যবহার করা, তার খেদমত করা এবং সময় দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা।
৫. বিয়ের বিষয়ে:
বাবা বলেছেন, "কোথাও ভর্তি না হলে বিয়ে হবে না"—এটি বাবার পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল। মেয়ের উচিত বাবাকে বোঝানো যে, দ্বীনি পরিবেশে পড়াশোনা করেও সে একটি ভালো জীবনসঙ্গী পাওয়ার যোগ্য হবে। বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তবে তা দ্বীনের সাথে আপস করার শর্তে হওয়া উচিত নয়।
৬. সাইকোলজি ডাক্তার দেখানোর বিষয়ে:
মেয়ের দ্বীনদারি ও পর্দার প্রতি ভালোবাসা কোনো মানসিক রোগ নয়। বাবা যদি মনে করেন মেয়ের মানসিক সমস্যা আছে, তবে মেয়ে বাবাকে বোঝাতে পারে যে, ইসলামী আদর্শে জীবনযাপন করাই তার স্বাভাবিক ও পছন্দের পথ। প্রয়োজনে একজন আলেম বা ইসলামী মনোবিদের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।
৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
মেয়ের উচিত:
- বাবার সাথে সম্পর্ক ভালো রাখা এবং তার সম্মান করা।
- দ্বীনের বিষয়ে আপস না করা।
- বাবার রাগ ও ক্ষোভকে ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করা।
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং দুআ করা।
- বাবার জন্য ভালোবাসা ও দোয়া করা, যাতে তার হৃদয় পরিবর্তন হয়।
রেফারেন্স:
- সূরা আল-আহযাব: ৩৩
- মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮
- সুনান আত-তিরমিজি: ২৮১৯
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪৫৬
- রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৭০
- বাহিশতি জেওর, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১২৩
উপসংহার:
মেয়ের গুনাহ হবে না, বরং তার সিদ্ধান্ত শরীয়তসম্মত। মেয়ের উচিত বাবার সাথে নম্র ও সদয় আচরণ করা, ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর কাছে দুআ করা। বাবার উচিত মেয়ের দ্বীনদারিকে সম্মান করা এবং তাকে বোঝা। আল্লাহ তাআলা উভয়কে সঠিক পথ দেখান। আমিন।