সমাধান দেয়ার উদ্দেশ্যে গীবত শোনা

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 3956
Questioner: Connection Error
Question Asked: 14 Aug 2026, 03:18 PM
Reviewed & Published: 14 Aug 2026, 03:27 PM
Views: 25
Tokens: 6,732
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১.আমাকে অনেকে বিশ্বস্ত মনে করে তাদের পারিবারিক জটিলতার কথা বলে।আমার মনে হয় যে এখানে পরামর্শ দেয়ার সুযোগ আছে।যাদের পরামর্শ দেয়ার সুযোগ থাকে না তাদের কথা আমি শুনি না।যাদের ক্ষেত্রে দেয়ার সুযোগ থাকে তাদের টা শুনি।এক্ষেত্রে তাদের কথায় গীবত আসে।এক্ষেত্রে কি আমি গীবত শোনার জন্য গোনাহগার হব?
২.হারাম টাকায় জমি কিনলে সাদাকাহর ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্য নাকি বিক্রয়মূল্য সাদাকাহ করতে হবে?
৩.ডাক্তাররা বিভিন্ন কোম্পানি থেকে গিফট পায় ।এই গিফট গুলো ভ্যানে করে বিক্রি হয়। উৎস আমি জানিনা।এগুলো কেনার বিধান কি?
৪। ব্যাংকের আইটি সেক্টরে চাকরির বিধান কি?এসিসট্যান্ট প্রোগ্রামার হিসেবে জবের টাকা কি হালাল?তারা সরাসরি সুদের হিসাব নিকাশ করে না।ব্যাংকের দরকারি সফটওয়্যার বানায়,গ্রাহকের এপ বানায় ।
৫।যাওয়ালের সালাত যোহরের ওয়াক্তের যেকোনো সময় পড়া যাবে নাকি ওয়াক্ত শুরুর সাথে সাথেই পড়তে হবে?
৬। হাজতের সালাত কি সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত?

Answer

উত্তরের সূচনা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল কারীম।

আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নে প্রদান করা হলো:


প্রশ্ন ১: গীবত শোনার গুনাহ

উত্তর: গীবত শোনাও গীবত করার মতোই গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "গীবত শোনা এবং গীবত করা উভয়ই গুনাহ।" (মিশকাত)

তবে আপনার ক্ষেত্রে যদি এমন হয় যে, আপনি শুধুমাত্র তাদের কথা শুনছেন যাদেরকে আপনি পরামর্শ দিতে পারবেন, এবং তাদের সমস্যার সমাধানের জন্যই শুনছেন, তাহলে এতে গীবতের গুনাহ হবে না যদি নিম্ন শর্তগুলো থাকে:

১. পরামর্শ দেওয়ার উদ্দেশ্য হতে হবে খালেস (নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য)। ২. যে ব্যক্তি সমস্যার কথা বলছে, তার অনুমতি থাকতে হবে। ৩. পরামর্শ দেওয়ার জন্য যতটুকু জানা প্রয়োজন, শুধু ততটুকুই শুনতে হবে, অতিরিক্ত নয়।

ইমাম নববী (রহ.) সহ অন্যান্য আলেমগণ বলেছেন: "যে ব্যক্তি পরামর্শ দিতে চায়, তার জন্য এমন ব্যক্তির কথা শোনা জায়েয যিনি তার সমস্যার কথা বলছেন, যদিও তাতে কারো দোষ বর্ণনা থাকে।" (শরহু মুসলিম)

তবে যদি আপনি দেখেন যে, পরামর্শের প্রয়োজন নেই বা কথা বলার মধ্যে অযথা গীবত হচ্ছে, তাহলে সেটা শোনা জায়েয হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর যখন তারা অশ্লীল কথার সম্মুখীন হয়, তখন তারা তা এড়িয়ে চলে।" (সূরা আল-ফুরকান: ৭২)

সারকথা: পরামর্শ দেওয়ার উদ্দেশ্যে শোনা জায়েয, তবে অযথা গীবত শোনা গুনাহ।


প্রশ্ন ২: হারাম টাকায় জমি কেনার পর সাদাকাহ

উত্তর: হারাম টাকায় জমি কেনার পর সেটি বিক্রি করে মূল টাকা মূল মালিককে ফেরত দেওয়া বা সাদাকাহ করা সম্পর্কে ফকীহগণের মতামত হলো:

যদি হারাম টাকার মালিক চেনা যায়, তাহলে সেই টাকা তার কাছে ফেরত দেওয়া wajib (অবশ্যকীয়)। যদি মালিক চেনা না যায়, তাহলে সেই টাকা সাদাকাহ করতে হবে।

এখন জমি কেনার পর সেটি বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায়, সেটার বিধান:

  • ক্রয়মূল্য (যে টাকায় কেনা হয়েছে) সেটা হারাম টাকা ছিল। তাই এই পরিমাণ টাকা সাদাকাহ করতে হবে।
  • বিক্রয়মূল্য যদি ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে অতিরিক্ত অংশ হালাল হবে এবং তা নিজের জন্য রাখা জায়েয। কারণ অতিরিক্ত অংশটি ব্যবসায়িক লাভ, যা হালাল উপার্জন হিসেবে গণ্য হবে।তবে সম্পূর্ণ বিক্রয়মূল্য সদকাহ করাই উচিত ও উত্তম।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "যদি কেউ হারাম টাকায় কিছু ক্রয় করে, অতঃপর তা বিক্রি করে লাভ করে, তাহলে মূল টাকা সাদাকাহ করবে এবং লাভ তার জন্য হালাল।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/৫৬)

তবে যদি জমিটি এখনো বিক্রি না করা হয় এবং সেটি নিজের কাছে থাকে, তাহলে জমিটির বর্তমান মূল্য (বিক্রয়মূল্য) থেকে ক্রয়মূল্যের পরিমাণ সাদাকাহ করতে হবে এবং বাকি অংশ নিজের জন্য হালাল।


প্রশ্ন ৩: ডাক্তারদের গিফট কেনার বিধান

উত্তর: ডাক্তাররা বিভিন্ন কোম্পানি থেকে যে গিফট পায়, সেগুলো সাধারণত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো তাদের প্রোডাক্ট প্রচারের জন্য দিয়ে থাকে। এই গিফটগুলোর উৎস যদি বৈধ হয় (অর্থাৎ কোম্পানির হালাল আয় থেকে কেনা হয়), তাহলে সেগুলো কেনা জায়েয।

তবে প্রশ্নে বলা হয়েছে "উৎস আমি জানিনা" - এই ক্ষেত্রে:

১. যদি গিফটের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত না হন, তাহলে মূলনীতি হলো: যেকোনো বস্তু কেনা-বেচা জায়েয, যতক্ষণ না তার হারাম হওয়া প্রমাণিত হয়। ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো: "আল-আসল ফিল আশইয়া আল-ইবাহা" অর্থাৎ বস্তুসমূহের মূল বিধান হলো বৈধতা।

২. তবে যদি জানা যায় যে, এই গিফটগুলো হারাম উপায়ে (যেমন ঘুষ, সুদ ইত্যাদি) অর্জিত, তাহলে সেগুলো কেনা জায়েয হবে না।

৩. ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো সাধারণত তাদের পণ্যের প্রচারের জন্য ডাক্তারদের গিফট দিয়ে থাকে, যা তাদের ব্যবসায়িক খরচ হিসেবে গণ্য। এটি যদি হালাল আয় থেকে হয়, তাহলে জায়েয।

সারকথা: উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে, মূলনীতি অনুযায়ী কেনা জায়েয। তবে যদি জানা যায় যে, উৎস হারাম, তাহলে কেনা জায়েয নয়।


প্রশ্ন ৪: ব্যাংকের আইটি সেক্টরে চাকরির বিধান

উত্তর: ব্যাংকের আইটি সেক্টরে চাকরি করার বিধান সম্পর্কে ফকীহগণের মতামত হলো:

সাধারণ নিয়ম: ব্যাংকে চাকরি করা মূলত জায়েয নয়, কারণ ব্যাংক সুদভিত্তিক লেনদেন করে। তবে আইটি সেক্টরে কাজ করার ক্ষেত্রে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

১. সরাসরি সুদের হিসাব-নিকাশ না করা: আপনি বলেছেন যে, আপনি সরাসরি সুদের হিসাব-নিকাশ করেন না। এটি একটি ভালো দিক।

২. ব্যাংকের দরকারি সফটওয়্যার তৈরি: যদি আপনি এমন সফটওয়্যার তৈরি করেন যা সরাসরি সুদভিত্তিক লেনদেনের সাথে জড়িত (যেমন সুদের হিসাব করার সফটওয়্যার), তাহলে সেটা জায়েয হবে না। কারণ এটি হারাম কাজে সহযোগিতা করার শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেন: "পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)

৩. গ্রাহকের অ্যাপ তৈরি: যদি অ্যাপটি এমন হয় যা সুদভিত্তিক লেনদেনের সাথে জড়িত (যেমন লোন অ্যাপ, সুদের হিসাব দেখায়), তাহলে সেটাও জায়েয হবে না।

৪. সাধারণ সফটওয়্যার: যদি সফটওয়্যারটি সাধারণ কাজের জন্য হয় (যেমন গ্রাহকের তথ্য সংরক্ষণ, সাধারণ হিসাব-নিকাশ যা সুদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়), তাহলে সেটা জায়েয হতে পারে।

মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন: "ব্যাংকে এমন কাজ করা জায়েয নয় যা সরাসরি সুদভিত্তিক লেনদেনের সাথে জড়িত। তবে যদি কেউ এমন কাজ করে যা সুদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয় (যেমন সাধারণ প্রশাসনিক কাজ, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ইত্যাদি), তাহলে সেটা সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। অধিকাংশ আলেম বলেছেন, এমন কাজ করাও জায়েয নয়, কারণ এটি হারাম প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করার শামিল।" (ফিকহী মাকালাত)

সারকথা: ব্যাংকের আইটি সেক্টরে চাকরি করা জায়েয হবে না যদি কাজটি সরাসরি সুদভিত্তিক লেনদেনের সাথে জড়িত থাকে। যদি কাজটি সম্পূর্ণ আলাদা হয় (যেমন শুধু সাধারণ সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট যা সুদের সাথে সম্পর্কিত নয়), তাহলে কিছু আলেম জায়েয বলেছেন, তবে অধিকাংশ আলেমের মতে এটি জায়েয নয়। উত্তম হলো হারাম প্রতিষ্ঠানে চাকরি না করা এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা।


প্রশ্ন ৫: যাওয়ালের সালাত (যুহরের প্রথম সময়) সম্পর্কে

উত্তর: যাওয়াল হলো সূর্য যখন ঠিক মাথার উপর থেকে পশ্চিম দিকে হেলে যায়, অর্থাৎ যুহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সময়।

যাওয়ালের সালাত বলতে সাধারণত যুহরের ফরজ সালাতকে বোঝানো হয়, যা যাওয়ালের সময় শুরু হয়।

বিধান: যুহরের সালাত যাওয়ালের (ওয়াক্ত শুরুর) সাথে সাথেই পড়া মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)। তবে ওয়াক্তের শেষ পর্যন্ত (আসরের আগ পর্যন্ত) পড়া জায়েয।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যুহরের সালাতের সময় হলো যখন সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে যায়, যতক্ষণ না কারো ছায়া তার সমান হয়।" (সহীহ মুসলিম)

তবে "যাওয়ালের সালাত" বলতে যদি উদ্দেশ্য হয় যাওয়ালের সময় বিশেষ কোনো নফল সালাত, তাহলে সেটি প্রমাণিত নয়। যাওয়ালের সময় (সূর্য ঠিক মাথার উপর থাকা অবস্থায়) নফল সালাত পড়া নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তিনটি সময়ে সালাত পড়া নিষিদ্ধ: ১. যখন সূর্য উদিত হয় যতক্ষণ না তা উপরে উঠে যায়, ২. যখন সূর্য ঠিক মাথার উপর থাকে যতক্ষণ না পশ্চিম দিকে হেলে যায়, ৩. যখন সূর্য অস্ত যেতে থাকে।" (সহীহ বুখারী)

সারকথা: যুহরের ফরজ সালাত যাওয়ালের সাথে সাথেই পড়া উত্তম, তবে ওয়াক্তের শেষ পর্যন্ত পড়া জায়েয। যাওয়ালের সময় নফল সালাত পড়া নিষিদ্ধ।


প্রশ্ন ৬: হাজতের সালাত (সালাতুল হাজাহ) কি সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত?

উত্তর: হাজতের সালাত (সালাতুল হাজাহ) সম্পর্কে হাদিসে বর্ণনা আছে।

হাদিস: আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তির আল্লাহর কাছে বা কোনো মানুষের কাছে কোনো প্রয়োজন থাকে, সে যেন উত্তমভাবে ওযু করে, তারপর দুই রাকাত সালাত আদায় করে, তারপর আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ পাঠ করে, তারপর এই দোয়া পড়ে: 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল হালিমুল কারিম, সুবহানাল্লাহি রাব্বিল আরশিল আজিম, আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, আসআলুকা মুজিবাতি রাহমাতিকা, ওয়া আযাইমা মাগফিরাতিকা, ওয়াল গানিমাতা মিন কুল্লি বিররিন, ওয়াস সালামাতা মিন কুল্লি ইসমিন, লা তাদা' লি যানবান ইল্লা গাফারতাহু, ওয়া লা হাম্মান ইল্লা ফাররাজতাহু, ওয়া লা হাজাতান হিয়া লাকা রিদান ইল্লা কাদাইতাহা ইয়া আরহামার রাহিমিন।'" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৪৭৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৩৮৪)

হাদিসের মান: এই হাদিসটি তিরমিজি ও ইবনে মাজায় বর্ণিত। ইমাম তিরমিজি বলেছেন: "এই হাদিসটি হাসান গারীব।" কিছু আলেম এই হাদিসকে দুর্বল বলেছেন, তবে অনেক আলেম বলেছেন এটি হাসান পর্যায়ের।

আলেমদের মতামত:

  • ইমাম নববী (রহ.) সহ অনেক আলেম বলেছেন, হাজতের সালাত প্রমাণিত।
  • ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন, এই হাদিসটি সহীহ নয়, তবে দুর্বল হলেও আমল করা যেতে পারে।
  • হানাফী ফিকহের আলেমগণও হাজতের সালাতকে জায়েয বলেছেন।

সারকথা: হাজতের সালাত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, যদিও হাদিসটি সহীহ পর্যায়ের নয়, তবে হাসান বা দুর্বল পর্যায়ের। দুর্বল হাদিস দ্বারা ফজিলতের কাজে আমল করা জায়েয। তাই হাজতের সালাত পড়া জায়েয এবং এর দ্বারা উপকার পাওয়া যায়।


আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.