স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষণ ওয়াজিব হওয়ার জন্য কি স্বামীর পিতা মাতা সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
প্রশ্নটি তিনটি অংশে বিভক্ত। নিচে প্রতিটি অংশের জবাব হানাফি মাযহাবের কিতাব ও ফতোয়ার আলোকে দেওয়া হলো।
১. স্বামী ‘কবুল’ বলার পর থেকে কি তার দায়িত্ব গ্রহণ করা ফরজ?
উত্তর: হ্যাঁ, স্বামী ‘কবুল’ বলার অর্থাৎ বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর থেকেই স্ত্রীর ভরণপোষণ (নাফাকা) দেওয়া তার ওপর ফরজ (ওয়াজিব) হয়ে যায়। এটি ইসলামের মৌলিক বিধান।
-
কুরআন:
﴿وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ﴾ (সূরা বাকারা: ২৩৩)
“পিতার দায়িত্ব হলো স্ত্রীদের খাদ্য ও পোশাক দেওয়া ন্যায়সঙ্গতভাবে।” -
হাদিস:
নবীজি (ﷺ) বলেছেন:
“তাদের (স্ত্রীদের) ওপর তাদের খাদ্য ও পোশাকের অধিকার রয়েছে ন্যায়সঙ্গতভাবে।” (সহিহ মুসলিম) -
হানাফি ফিকহ:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তার শিষ্যদের মতে, বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর স্ত্রী তার স্বামীর কাছে নিজেকে সোপর্দ করলে স্বামীর ওপর ভরণপোষণ দেওয়া ফরজ হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৭২; ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/৫৪৩)
স্পষ্টীকরণ:
- স্বামী ‘কবুল’ বলার অর্থ শুধু বিয়ের ইজাব-কবুল সম্পন্ন হওয়া। এ মুহূর্ত থেকেই তার আর্থিক দায়িত্ব শুরু হয়।
- তবে স্ত্রীর জন্য স্বামীর কাছ থেকে নিজের অধিকার আদায় করা ফরজ নয়; বরং সে ইচ্ছা করলে মাফও করতে পারে। মূল বিষয় হলো স্বামীর ওপর তা দেওয়া ফরজ।
২. স্বামীর ভরণপোষণ নেওয়ার জন্য তার বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রাখা কি অপরিহার্য?
উত্তর: না, শুধু ভরণপোষণ পাওয়ার জন্য শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক রাখা জরুরি নয়। স্ত্রীর ভরণপোষণের অধিকার নির্ভর করে স্বামীর ওপর, শ্বশুর-শাশুড়ির ওপর নয়।
-
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে বলা হয়েছে:
“স্ত্রীর নাফাকা (ভরণপোষণ) তার স্বামীর ওপর ওয়াজিব। এটি শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সম্পর্কের শর্তের ওপর নির্ভরশীল নয়।” (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২১; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৫০) -
তবে স্বামীর পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক রাখা ইসলামী আদব ও উত্তম চরিত্রের অংশ। কিন্তু তা যদি না রাখা হয়, তাতে ভরণপোষণ বন্ধ হয় না। শুধুমাত্র স্ত্রী নুশুজ (স্বামীর আদেশ অমান্য করে ঘর ছেড়ে যাওয়া) করলেই ভরণপোষণ বন্ধ হতে পারে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৭৫)
সারসংক্ষেপ:
- শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক রাখা ভরণপোষণ পাওডার জন্য অপরিহার্য কোনো বিষয নয়।
- তবে সদাচরণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা মুস্তাহাব।
৩. আমার বাবা-মাকে স্বামীর ব্যাপারে জানানো কি অপরিহার্য?
উত্তর: না, বাবা-মাকে স্বামীর ব্যাপারে (যেমন তার আচরণ, উপার্জন ইত্যাদি) জানানো ফরজ বা অপরিহার্য নয়। বিয়ে করার পর স্ত্রী তার নিজস্ব সংসারের দায়িত্বশীল। তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও আদবের দিক থেকে জানাতে পারে।
-
হানাফি ফিকহে:
বিবাহিত নারীর জন্য স্বামীর ব্যক্তিগত বিষয় (যেমন আয়-ব্যয়, গোপনীয়তা) অন্যদের কাছে প্রকাশ করা নিষেধ নয়, তবে এটি আমানতের খেয়ানত হিসেবে গণ্য হতে পারে যদি স্বামী না চায়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৯; বাহিশতি জেওর, বিবাহ অধ্যায়) -
কুরআনে বলা হয়েছে:
﴿فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا﴾
“যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ অনুসন্ধান করো না।” (সূরা নিসা: ৩৪) অর্থাৎ স্ত্রী স্বামীর অনুগত থাকলে তার বিষয়গুলো অন্যের কাছে বলা ঠিক নয়। -
তবে বাবা-মাকে জানানো জরুরি যদি:
১. স্বামী অবৈধ কাজে লিপ্ত হয় এবং পরিবারের সাহায্য প্রয়োজন হয়।
২. স্ত্রীর ওপর জুলুম হয় এবং পরিবার মধ্যস্থতা করতে পারে।
৩. স্বামীর অনুমতি থাকে বা প্রয়োজনে পরামর্শের জন্য।
উত্তম পথ:
- সাধারণ পরিস্থিতিতে স্বামীর বিষয় গোপন রাখা ও সম্মান করা উত্তম।
- প্রয়োজনে নিজের বাবা-মাকে জানানো জায়েজ, কিন্তু ফরজ নয়।
সারসংক্ষেপ (মূল উত্তর)
| প্রশ্ন | উত্তর | হানাফি সূত্র | |--------|--------|------------| | স্বামী ‘কবুল’ বলার পর থেকে তার দায়িত্ব নেওয়া ফরজ? | হ্যাঁ, স্বামীর ওপর ভরণপোষণ দেওয়া ফরজ হয়। স্ত্রীর ওপর তা গ্রহণ করা ফরজ নয়। | রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৭২; ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/৫৪৩ | | ভরণপোষণের জন্য শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক রাখা অপরিহার্য? | না, এটি শর্ত নয়। তবে সুসম্পর্ক রাখা উত্তম। | ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৫০; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২১ | | বাবা-মাকে স্বামীর ব্যাপারে জানানো অপরিহার্য? | না, ফরজ নয়। তবে প্রয়োজনে জানাতে পারে। | বেহেশতি জেওর; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৯ |