ফেতনার আশঙ্কা আছে, তাও পরিবারের লোকের কাছ থেকে বকা বা কথা শুনতে হবে যদি HSC না পড়ী, এখন আমার কি করণীয়
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
HSC না পড়ার কারণে পরিবারের চাপ ও বকা-ঝকা — করণীয় কী?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি HSC না পড়ার কারণে পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে বকা-ঝকা ও নেতিবাচক কথা শুনছেন। অনেকে আপনাকে "যোগ্য" মনে করছেন না, এবং বিয়ের ব্যাপারেও সমস্যা হচ্ছে। ফেতনার আশঙ্কা রয়েছে। এখন আপনার করণীয় কী?
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাধান
১. শিক্ষার গুরুত্ব ইসলামে
ইসলাম শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ "জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।" (ইবনে মাজাহ: ২২৪)
তবে এখানে "জ্ঞান" বলতে শুধু পার্থিব শিক্ষা নয়, বরং দ্বীনি ও দুনিয়াবি উভয় প্রকার জ্ঞানই উদ্দেশ্য। HSC পড়া বা না পড়া কোনো গুনাহের কাজ নয়, তবে শিক্ষা অর্জনের চেষ্টা করা উত্তম।
২. HSC না পড়া কি গুনাহ?
HSC না পড়া নিজে কোনো গুনাহ নয়। তবে যদি সম্ভব হয় এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থা অনুমতি দেয়, তাহলে পড়া উত্তম। কিন্তু যদি কোনো বৈধ কারণে পড়া সম্ভব না হয়, তাহলে এতে কোনো দোষ নেই।
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর দৃষ্টিভঙ্গি: ইলম অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম, তবে ইলম শুধু পার্থিব শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বীনি ইলমও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
৩. পরিবারের বকা-ঝকা ও চাপ মোকাবিলা
পরিবারের লোকজন যদি আপনাকে বকা দেয় বা নেতিবাচক কথা বলে, তাহলে:
ক. ধৈর্য ধারণ করুন: আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا "হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং ধৈর্যে প্রতিযোগিতা করো।" (সূরা আলে ইমরান: ২০০)
খ. উত্তম আচরণ করুন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُحْسِنْ إِلَى جَارِهِ "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সাথে উত্তম আচরণ করে।" (বুখারী: ৬০১৮)
পরিবারের লোকদের সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না, বরং তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করুন এবং তাদের কথা ধৈর্যের সাথে শুনুন।
৪. বকা-ঝকা থেকে ফেতনার আশঙ্কা
ফেতনার আশঙ্কা থাকলে অর্থাৎ এই চাপের কারণে যদি আপনার ঈমান, আমল বা মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে, তাহলে:
ক. আল্লাহর উপর ভরসা করুন:
وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ "যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)
খ. দ্বীনি ইলম অর্জন করুন: পার্থিব শিক্ষা না পড়তে পারলেও দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের চেষ্টা করুন। এটি আপনার জন্য উত্তম বিকল্প হতে পারে।
৫. বিয়ের ব্যাপারে করণীয়
বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি হলো:
ক. দ্বীন ও চরিত্রই প্রধান মানদণ্ড: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ করো, তখন তার সাথে বিবাহ দাও।" (তিরমিজি: ১০৮৪)
শিক্ষাগত যোগ্যতা বিয়ের একমাত্র মানদণ্ড নয়। দ্বীনদারি ও চরিত্রই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
খ. পরিবারকে বোঝান: পরিবারের লোকদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, ইসলামী দৃষ্টিতে বিয়ের জন্য দ্বীনদারি ও চরিত্রই মুখ্য। শিক্ষাগত যোগ্যতা গৌণ বিষয়।
৬. ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর শিক্ষা
ইমাম আবু হানিফা রহ. নিজেও ব্যবসায়ী ছিলেন এবং পরবর্তীতে ইলম অর্জন করেছেন। তার জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় যে, শিক্ষা অর্জনের পথ সবসময় এক নয়। কেউ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও দ্বীনি ইলম অর্জন করতে পারে এবং সমাজে সম্মানিত হতে পারে।
৭. বাস্তব সমাধান
ক. বিকল্প শিক্ষার পথ খুঁজুন:
- দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন
- অনলাইনে বিভিন্ন কোর্স করুন
- কোনো কারিগরি বা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিন
খ. পরিবারের সাথে কথা বলুন:
- শান্তভাবে তাদের সাথে কথা বলুন
- আপনার অবস্থা ও সীমাবদ্ধতা বোঝান
- ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানান
গ. আল্লাহর কাছে দুআ করুন:
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي "হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন।" (সূরা ত্বহা: ২৫-২৬)
ফতোয়া ও আলেমদের মতামত
মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.-এর মতে: শিক্ষা অর্জন প্রত্যেক মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা শুধু পার্থিব শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বীনি শিক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি কেউ পার্থিব শিক্ষা অর্জনে অক্ষম হয়, তবে তার জন্য দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করা উত্তম।
মুফতি তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম-এর মতে: শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং সমাজের উপকার করা। শুধু ডিগ্রি অর্জনই শিক্ষার লক্ষ্য নয়।
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
১. HSC না পড়া গুনাহ নয় — এটি কোনো ইসলামী বিধান লঙ্ঘন নয়। ২. ধৈর্য ধরুন — পরিবারের বকা-ঝকা সহ্য করুন এবং উত্তম আচরণ করুন। ৩. বিকল্প শিক্ষার পথ খুঁজুন — দ্বীনি শিক্ষা বা কারিগরি প্রশিক্ষণ নিন। ৪. বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিকে প্রাধিকার দিন — শিক্ষাগত যোগ্যতা গৌণ বিষয়। ৫. আল্লাহর উপর ভরসা করুন — তিনিই উত্তম পরিকল্পনাকারী। ৬. পরিবারের সাথে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করুন — তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন।
মনে রাখবেন: আপনার মূল্য শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা নির্ধারিত হয় আপনার তাকওয়া ও আমলের মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ "নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত那人 সেই ব্যক্তি যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
আল্লাহ তাআলা আপনার অবস্থা সহজ করুন এবং আপনার জন্য উত্তম পথ নির্ধারণ করুন। আমিন।