সরকারি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আন্ডারে প্রশিক্ষণ করার বিধান
Halal and Haram · Hanafi
Question
এবং ওখানে কাজের পর দিনপতি ১০০টাকা ভাতা দিয়ে থাকে ওগুলো হালাল হবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে:
১. সরকারি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে মেয়েদের কাজ শেখানো জায়েজ কি না? ২. সেখানে বাল্যবিবাহের কুফল, নারী-পুরুষ বৈষম্য, নারী নির্যাতন ইত্যাদি বিষয়ে কার্যক্রম থাকলে, শুধু কাজ শেখার জন্য যুক্ত হলে সমস্যা হবে কি? ৩. সেখানে কাজের বিনিময়ে দৈনিক ১০০ টাকা ভাতা দেওয়া হয়, তা হালাল হবে কি না?
নিচে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো:
১. মেয়েদের কাজ শেখানো জায়েজ কি?
উত্তর: হ্যাঁ, ইসলামে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বৈধ ও উপকারী কাজ শেখা এবং শেখানো জায়েজ। বরং এটি একটি সাওয়াবের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের (জ্ঞান বা দক্ষতা) পথ দেখাল, তার জন্য সেই আমলকারীর সমান সাওয়াব রয়েছে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৭৩)
মেয়েদের জন্য সেলাই, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, হস্তশিল্প, নার্সিং ইত্যাদি বৈধ পেশার দক্ষতা অর্জন করা জায়েজ। বরং এটি তাদের জন্য আত্মনির্ভরশীল হওয়ার একটি মাধ্যম হতে পারে, যা ইসলাম সমর্থন করে। তবে শর্ত হলো, প্রশিক্ষণ ও কাজের পরিবেশ ইসলামি আদর্শ ও পর্দার বিধান মেনে চলতে হবে।
২. বাল্যবিবাহ, নারী-পুরুষ বৈষম্য, নারী নির্যাতন ইত্যাদি বিষয়ে কার্যক্রম
আপনি যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন—বাল্যবিবাহের কুফল, নারী-পুরুষ বৈষম্য, নারী নির্যাতন—এগুলো ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ ও নিন্দনীয় বিষয়। ইসলাম এসবের বিরুদ্ধে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে:
- বাল্যবিবাহ: ইসলাম বিবাহের জন্য বয়ঃপ্রাপ্তি ও শারীরিক-মানসিক পরিপক্বতাকে শর্ত মনে করে। তবে ইসলামে নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমা নেই; বরং এমন বয়সে বিবাহ দেওয়া উচিত যেন উভয় পক্ষ দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব বহন করতে সক্ষম হয়। বাল্যবিবাহের কারণে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হয়, যা ইসলাম সমর্থন করে না। (সূরা আন-নিসা: ৬)
- নারী-পুরুষ বৈষম্য: ইসলাম নারী-পুরুষের মর্যাদায় সমতা এনেছে, তবে দায়িত্ব ও প্রকৃতি অনুযায়ী ভিন্নতা রেখেছে। ইসলাম নারীর প্রতি অবিচার, নির্যাতন এবং বৈষম্যকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। (সূরা আন-নিসা: ১৯)
- নারী নির্যাতন: ইসলাম নারীর প্রতি যেকোনো ধরনের শারীরিক, মানসিক বা অর্থনৈতিক নির্যাতনকে হারাম ঘোষণা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" (তিরমিজি, হাদিস: ১১৬২)
এখন প্রশ্ন হলো, শুধু কাজ শেখার জন্য যুক্ত হলে সমস্যা হবে কি?
উত্তর: যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কিছু কার্যক্রম ইসলামসম্মত না হয়, কিন্তু সেখানে বৈধ কাজ শেখানো হয়, তাহলে শুধু বৈধ কাজ শেখার উদ্দেশ্যে অংশগ্রহণ করা জায়েজ। তবে শর্ত হলো:
- সেই বৈধ কাজটি শেখার সময় কোনো হারাম কাজে লিপ্ত হতে হবে না।
- প্রশিক্ষণের পরিবেশ পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করে।
- সেখানে যদি এমন কোনো বিষয় শেখানো হয় যা ইসলামের পরিপন্থী (যেমন: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অশ্লীলতা, বা ইসলামবিরোধী মতবাদ), তাহলে সেটি থেকে বিরত থাকতে হবে।
পরোক্ষভাবে তাদের সাপোর্ট করা হবে কি?
উত্তর: আপনি যদি শুধু বৈধ কাজ শেখার জন্য যুক্ত হন এবং সেই কাজটি শেখার মাধ্যমে আপনি উপকৃত হন, তাহলে আপনি তাদের পুরো এজেন্ডাকে সাপোর্ট করছেন না। বরং আপনি একটি বৈধ কাজ থেকে উপকৃত হচ্ছেন। তবে যদি সেই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্যই ইসলামবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড চালানো হয় এবং আপনার অংশগ্রহণ তাদের সেই লক্ষ্যকে শক্তিশালী করে, তাহলে সেটি এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সাহায্য করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
সুতরাং, যদি প্রতিষ্ঠানটি বৈধ কাজ শেখায় এবং আপনি শুধু সেই বৈধ কাজটি শিখতে চান, তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু যদি দেখেন যে, সেখানে ইসলামবিরোধী কোনো প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং আপনার উপস্থিতি তাতে সহায়ক হচ্ছে, তাহলে সতর্ক থাকা উচিত।
৩. কাজের বিনিময়ে দৈনিক ১০০ টাকা ভাতা হালাল হবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, কাজের বিনিময়ে দেওয়া ভাতা বা পারিশ্রমিক হালাল। ইসলামে কাজের বিনিময়ে মজুরি বা পারিশ্রমিক নেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"কাজের বিনিময়ে মজুরি দেওয়ার আগেই তা পরিশোধ করো।" (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৩৪)
সুতরাং, আপনি যদি সেখানে বৈধ কাজ শেখেন এবং সেই কাজের বিনিময়ে ভাতা পান, তাহলে তা হালাল। তবে শর্ত হলো:
- কাজটি বৈধ হতে হবে।
- ভাতা বা পারিশ্রমিক নির্ধারিত ও পরিষ্কার হতে হবে।
- কোনো প্রকার সুদ, ঘুষ বা হারাম অর্থের সাথে মিশ্রিত না হওয়া।
সারসংক্ষেপ:
১. মেয়েদের বৈধ কাজ শেখা জায়েজ এবং সাওয়াবের কাজ। ২. বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন ইত্যাদির বিরুদ্ধে ইসলাম সোচ্চার। তবে শুধু বৈধ কাজ শেখার জন্য যুক্ত হলে সমস্যা নেই, যদি সেখানে হারাম কাজে লিপ্ত না হতে হয়। ৩. কাজের বিনিময়ে দেওয়া ১০০ টাকা ভাতা হালাল, যদি কাজটি বৈধ হয় এবং তা পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত থাকে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। (আমিন)