অসুস্থ মায়ের সেবা করার ফজিলত ও সীমা
Halal and Haram · Hanafi
Question
অনেকের বাসায় অসুস্থ মা থাকেন এবং তাকে তার ছেলে দেখাশোনা করে। গোসল করিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা জানি মাহরাম মহিলাদের শরীরের কতটুকু দেখা/স্পর্শ করা যাবে – তার সীমা রয়েছে।
1) তাহলে যেসব মহিলাদের পরিষ্কার ক্রিয়ে দিতে হয় এবং এই দায়িত্ব ছেলে পালন করে – তারা কি ভুল করছে?
2) যদি তা-ই হয়, তবে এক্ষেত্রে কে দেখাশোনা করবে এবং এই সমস্ত sensitive ক্ষেত্রে (যেখানে পর্দার অন্তর্ভুক্ত অংশ দেখতে বা ছুঁতে হয়) করণীয় কী হবে?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। ইসলামে পর্দার বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট, এমনকি মাহরাম মহিলাদের (মা, বোন, খালা, ফুফু) ক্ষেত্রেও কিছু সীমারেখা রয়েছে। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো:
১) ছেলের জন্য অসুস্থ মাকে গোসল করানো ও পরিষ্কার করা কি ভুল?
উত্তর: হ্যাঁ, এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে ভুল (গুনাহের কাজ) যদি তা সরাসরি ছেলে নিজে করে।
মাহরাম মহিলাদের ক্ষেত্রে পর্দার সীমা হলো: নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ (সতর) দেখা ও স্পর্শ করা জায়েয নয়। এমনকি মা-ছেলের সম্পর্কেও এই বিধান প্রযোজ্য।
- রদ্দুল মুহতার (হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থ) -এ উল্লেখ আছে, মাহরাম মহিলার সতর (নাভি থেকে হাঁটু) দেখা এবং স্পর্শ করা হারাম। প্রয়োজনে (যেমন: চিকিৎসা) শুধুমাত্র সেই নির্দিষ্ট স্থানটুকু দেখা যাবে, তবে স্পর্শ করার ক্ষেত্রে কাপড়ের উপর দিয়ে বা গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে।
- ফতোয়ায়ে উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়া -তেও স্পষ্ট বলা হয়েছে, অসুস্থ মায়ের সেবা করা সন্তানের জন্য সওয়াবের কাজ, কিন্তু পবিত্রতা ও গোসলের কাজটি যদি অন্য নারী (যেমন: মেয়ে, বোন, বা কোনো মাহরাম নারী) করতে পারে, তাহলে ছেলের জন্য নিজ হাতে এই কাজ করা জায়েয নয়।
সুতরাং, যে ছেলেরা নিজ হাতে মাকে গোসল করান বা পবিত্রতা করান, তারা শরীয়তের বিধান না জেনে বা উপেক্ষা করে ভুল করছেন। তবে তাদের নিয়ত ভালো হওয়ায় তারা সওয়াব পাবেন, কিন্তু গুনাহ থেকে রক্ষা পাবেন না।
২) এক্ষেত্রে করণীয় কী? কে দেখাশোনা করবে?
যদি বাড়িতে মেয়ে সন্তান, বোন, বা অন্য কোনো মাহরাম নারী (যেমন: ছেলের স্ত্রী, নাতনি) থাকেন, তাহলে তাঁদেরই এই দায়িত্ব পালন করা উচিত। নারী দ্বারা নারীর সেবা করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং উত্তম।
কিন্তু যদি কোনো নারী না থাকে এবং শুধুমাত্র ছেলেই থাকে, তাহলে নিম্নোক্ত নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে হবে:
১. গোসল করানোর ক্ষেত্রে:
- ছেলে মাকে গোসল করাতে পারবে না।
- এই অবস্থায় যেকোনো মুসলিম নারী (প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন) দিয়ে গোসল করানো উত্তম।
- যদি কোনো নারী পাওয়া না যায়, তাহলে ছেলে কাপড়ের উপর দিয়ে বা গ্লাভস (হাতের মোজা) পরে মাকে গোসল করাতে পারবে, তবে সতর (নাভি থেকে হাঁটু) অংশ স্পর্শ করা যাবে না এবং চোখ বন্ধ করে বা পর্দার আড়াল থেকে পানি ঢালতে সাহায্য করবে।
২. শরীর পরিষ্কার (ইস্তিঞ্জা) করার ক্ষেত্রে:
- এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ছেলের জন্য মায়ের পবিত্রতা (ইস্তিঞ্জা) করানো হারাম।
- এই কাজটি অবশ্যই স্ত্রী, মেয়ে, বোন বা অন্য কোনো নারীকে দিয়ে করাতে হবে।
- যদি কোনো নারী একান্তই না থাকে, তাহলে ছেলে মোটা কাপড় বা গ্লাভস পরে এবং প্রয়োজনে চোখ বন্ধ রেখে এই কাজটি করবে, তবে এটি সর্বশেষ উপায় হিসেবে গণ্য হবে।
সংক্ষিপ্ত করণীয় টেবিল:
| কাজ | করণীয় | | :--- | :--- | | খাওয়ানো, ওষুধ দেওয়া, কাপড় বদলানো (উপরের অংশ) | ছেলে করতে পারবে, তবে সতর অংশ দেখা যাবে না। | | গোসল করানো | নারী (মেয়ে/বোন/স্ত্রী) করাবে। না পেলে ছেলে গ্লাভস পরে করবে, তবে সতর স্পর্শ নয়। | | ইস্তিঞ্জা (পায়খানা/প্রস্রাব পরিষ্কার) | শুধুমাত্র নারীই করবে। ছেলের জন্য এটি সম্পূর্ণ হারাম। |
দলিল (হানাফি ফিকহ) :
- কিতাবুল আছল (ইমাম মুহাম্মাদ): মাহরাম মহিলার সতর দেখা জায়েয নয়, তবে মাথা, মুখমণ্ডল, হাত ও পায়ের নিচের অংশ দেখা যাবে।
- ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরি): "অসুস্থ মাকে গোসল করানোর জন্য যদি অন্য নারী পাওয়া যায়, তাহলে পুরুষের জন্য তা করা মাকরূহে তাহরিমি (ঘৃণিত ও গুনাহের কাজ)।"
- রদ্দুল মুহতার: "মাহরাম মহিলার নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ স্পর্শ করা জায়েয নয়, এমনকি চিকিৎসার প্রয়োজনে শুধু সেই স্থানটুকু দেখা যাবে।
উপসংহার:
আপনার প্রশ্নের আলোকে, ছেলের জন্য অসুস্থ মায়ের সেবা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ, কিন্তু পর্দার সীমা লঙ্ঘন করে (সতর স্পর্শ করে) গোসল ও পবিত্রতা করানো জায়েয নয়। এই দায়িত্ব পালনের জন্য অবশ্যই নারী সদস্য (মেয়ে, বোন, স্ত্রী) থাকা প্রয়োজন। যদি না থাকে, তাহলে অন্য কোনো নারীকে দিয়ে করাতে হবে। একান্তই না পারলে, সর্বশেষ উপায় হিসেবে ছেলে গ্লাভস পরে এবং চোখ বন্ধ রেখে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় অংশটুকু পরিষ্কার করবে, তবে এটি সম্পূর্ণ অপারগতার ক্ষেত্রে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীন বুঝার এবং মানার তাওফিক দান করুন। (আমিন)