একটি বড় গরুতে এক ভাগ নেওয়া উত্তম না, একই টাকায় একটি ছোট গরুতে দুই ভাগ নেওয়া উত্তম?
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
কুরবানী ভাগে করা সংক্রান্ত একটি প্রশ্ন ছিলো।
পুরো একটি গরু একা দেওয়া সম্ভব না। সেজন্য ভাগে কুরবানী দেওয়ার নিয়ত করেছি ইনশাআল্লাহ। এখন আমার কাছে দুইটা অপশন আছে, একটু বড় গরুতে ১ ভাগ নেওয়া, অথবা সমপরিমাণ টাকা দিয়ে তুলনামুলক ছোট গরুতে দুই ভাগ নেওয়া। ২ ভাগ নিলে একটা সুবিধা হচ্ছে আমার বাবা বা মায়ের পক্ষ থেকে এক ভাগ ও আমার পক্ষ থেকে এক ভাগ নিতে পারবো। কিন্তু বড় গরুতে ১ ভাগ নিলে হয়ত শুধুই আমার ভাগে পড়বে।
আমি জানতে চাই, শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনটির ফজিলত বেশি?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো: কুরবানীর জন্য একটি বড় গরুতে এক ভাগ নেওয়া (যা শুধু আপনার পক্ষ থেকে হবে) বনাম একই টাকায় একটি ছোট গরুতে দুই ভাগ নেওয়া (এক ভাগ আপনার পক্ষে, অপর ভাগ বাবা বা মায়ের পক্ষে) – এর মধ্যে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনটি অধিক ফজিলতপূর্ণ?
উত্তর:
প্রথমে জেনে রাখা জরুরি যে, গরু, মহিষ, উট ইত্যাদি বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাত ভাগ পর্যন্ত শরীক হওয়া যায়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩১৮; ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩০৭; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৫)
এখন আপনার দুটি অপশনের মধ্যে শরীয়তের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় অপশনটি (ছোট গরুতে দুই ভাগ নেওয়া) অধিক ফজিলতপূর্ণ বলে আমি মত দেব। কারণ:
১. পিতা-মাতাকে সম্পৃক্ত করার সওয়াব
- আপনি যদি নিজের পক্ষ থেকে এক ভাগ এবং বাবা বা মায়ের পক্ষ থেকে আরেক ভাগ নেন, তাহলে এটি পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও আনুগত্যের অংশ। হাদীসে এসেছে, "পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি" (তিরমিযী, হাদীস: ১৮৯৯)। কুরবানীর মাধ্যমে তাদের জন্য ইসালে সওয়াব করাও একটি বড় নেক কাজ।
- যদি আপনার বাবা-মা নিজেরা কুরবানী দিতে অক্ষম হন (অর্থনৈতিক বা স্বাস্থ্যগত কারণে) অথবা তারা কুরবানী না দিলেও আপনার পক্ষ থেকে তাদের নামে কুরবানী দেয়া জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩২৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৬৪)
২. কুরবানীর উদ্দেশ্য: বেশি মানুষের অংশগ্রহণ
- কুরবানীর একটি মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নামে পশু জবাই করে গোশত বণ্টন করা এবং উম্মাহর মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করা। আপনি যখন এক পশুতে দুই ভাগ শরীক হচ্ছেন, তাতে দুটি পৃথক নিয়ত (আপনার ও আপনার পিতার/মাতার) জড়িত হচ্ছে। ফলে এই আমলের পরিধি ও সওয়াব দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, কুরবানীতে অংশীদারির সংখ্যা বাড়ানোই উত্তম, কারণ এতে করে কুরবানীকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩০৭)
৩. গোশতের পরিমাণের তুলনা
- একটি বড় গরুতে এক ভাগ নিলে গোশতের পরিমাণ বেশি হতে পারে, কিন্তু একটি ছোট গরুতেও দুই ভাগ নিলে মোট গোশত প্রায় সমান বা কাছাকাছি হতে পারে। তবে মাপকাঠি শুধু গোশতের পরিমাণ নয় বরং নিয়ত ও ইবাদতের কলেবর।
- কুরবানীতে গোশত বণ্টন করা সুন্নত, কিন্তু মূল ফজিলত নিয়তের ওপর নির্ভর করে। (মাআরিফুল কুরআন, ২/৩৩২)
৪. হানাফী ফিকহের দিকনির্দেশনা
- হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, "কুরবানীতে অংশীদারিত্ব জায়েয এবং প্রত্যেক অংশীদারের জন্য একই সওয়াব। তবে যদি কেউ একা একটি গরু দিয়ে দিতে সক্ষম হয়, তাহলে তা উত্তম। কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে, একা গরু দেয়ার অর্থ হলো নিজের জন্য সম্পূর্ণ গরু উৎসর্গ করা, শুধু একটি ভাগ নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২২)
- আপনার ক্ষেত্রে আপনি পুরো গরু দিতে পারছেন না, তাই ভাগে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এখন যদি আপনি এক ভাগই নেন, তাহলে তা শুধু আপনার জন্য। কিন্তু দুই ভাগ নিলে তা আপনার এবং আপনার পিতা-মাতার জন্য। হানাফী ফকীহগণ বলেন, নিজের জন্য এক ভাগের চেয়ে পিতা-মাতার জন্য এক ভাগসহ নিজের এক ভাগ নেওয়া বেশি ফজিলতের। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৬৪; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩২৪)
৫. গুরুত্বপূর্ণ শর্ত
- আপনার পিতা বা মাতা যার পক্ষে কুরবানী দিচ্ছেন, তারা যদি জীবিত থাকেন এবং নিজে কুরবানী দেয়ার সামর্থ্য রাখেন, তাহলে আপনার পক্ষ থেকে তাদের নামে কুরবানী দেয়া তাদের পক্ষ থেকে কুরবানী আদায় হবে না। বরং তা হবে ইসালে সওয়াব বা তাদের হাদিয়া। তবে যদি তারা আপনার অনুমতি দেন এবং তারা নিজেরা কুরবানী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে আপনি তাদের নামে ভাগ নিতে পারেন। (আহসানুল ফাতাওয়া, ৭/৩৮০)
- মৃত পিতা-মাতার পক্ষ থেকে কুরবানী করাও জায়েয এবং সওয়াব পৌঁছবে। (ফাতাওয়া শামী, ৬/৩২৬)
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
শরীয়তের দৃষ্টিতে ছোট গরুতে দুই ভাগ নেওয়া (এক ভাগ আপনার পক্ষে ও এক ভাগ বাবা/মায়ের পক্ষে) অধিক ফজিলতপূর্ণ। কারণ:
- এতে পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক জোরদার হয় এবং তাদের জন্য ইসালে সওয়াবের মাধ্যম হয়।
- কুরবানীর সওয়াব দ্বিগুণ হয় (আপনার ও আপনার পিতা/মাতার নিয়তে)।
- এটি হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী উত্তম পদ্ধতি।
তবে মনে রাখবেন, বড় গরুতে এক ভাগ নেওয়াও সম্পূর্ণ জায়েয ও বৈধ। এতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু ফজিলতের দিক থেকে দ্বিতীয় অপশনটি প্রাধান্য পায়। আল্লাহ তাআলা আপনার ও আপনার পিতা-মাতার কুরবানী কবুল করুন। আমীন।
আল্লাহই তাওফীক দাতা।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৩২৩-৩২৪)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৬৪)
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩২২-৩২৬)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (৫/৩০৭)
- মাআরিফুল কুরআন (২/৩৩২)
- সহীহ মুসলিম (হাদীস: ১৩১৮)