মাসিকের আগে হলুদ স্রাব হায়েজ নাকি ইস্তিহাজা?
Taharah Purity · Hanafi
Question
একজন মেয়ের প্রতি মাসিকের আগে ৭/৮ দিন সামান্য হলদেটে স্রাব যায় তারপর মাসিকের রক্ত আসে এবং তা ৭/৮ দিন থাকে।আপনাদের এখানে ঔ হলুদ স্রাবকে হায়েজ ধরতে বলা হয়েছে যেহেতু তা ১৫ দিন পবিত্র থাকার পর এসেছে। কিন্তু তিনি ২ জন প্রাকটিসিং গাইনী বিশেষজ্ঞ থেকে পরামর্শ নিয়েছে। তারা দুইজনই বলেছে এটা স্বাভাবিক স্রাব। অনেকেরেই এই সময় সামান্য হলদে স্রাব আসে। এটা হায়েজ না।সাথে তিনি একজন ননপ্রাকটিসিং গাইনী বিশেষজ্ঞও দেখিয়েছেন। তিনিও একই কথা বলেছেন।যেহেতু তা সারাক্ষণ যায় না।দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় হয়।তাই এটাকে হায়েজ ধরবে না।আমিও একজন ডাক্তার। আমার কাছেও তাদের কথা যথার্থ মনে হয়েছে। এখন সেই বোন সেই অনুযায়ী আমল করলে গুনাহ হবে। তিনি হানাফি মাজহাব ফলো করেন।দয়া করে উত্তর দিলে মুনাসিব হতো।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। ইসলামি ফিকহে (বিশেষত হানাফি মাজহাবে) মাসিকের আগে দেখা যাওয়া হলুদ স্রাবের (ইস্তিহাজা বনাম হায়েজ) বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতামতের সাথে ইসলামি আইনের বিধানের পার্থক্য থাকতে পারে, কারণ ইসলামি আইন নির্ভর করে শরয়ী নিয়মের উপর, যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা এবং কুরআন-হাদিসের আলোকে প্রতিষ্ঠিত।
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো: একজন মেয়ের মাসিক শুরুর ৭/৮ দিন আগে সামান্য হলদেটে স্রাব আসে, তারপর মাসিকের রক্ত আসে। ডাক্তাররা বলছেন এটি স্বাভাবিক স্রাব, কিন্তু হানাফি ফিকহ অনুযায়ী এটি হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে কি না?
উত্তর:
হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মতানুসারে, মাসিকের (হায়েজের) নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে যে স্রাব আসে, তা যদি মাসিকের রক্তের সাথে সম্পর্কিত হয় (অর্থাৎ মাসিক শুরুর আগে বা শেষে আসে) এবং তা একটানা ৩ দিন বা তার বেশি সময় ধরে থাকে, তবে তা হায়েজ হিসেবেই গণ্য হবে।
আপনি যে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে:
- মেয়েটির মাসিক শুরুর ৭/৮ দিন আগে হলুদ স্রাব আসে।
- এরপর মাসিকের রক্ত আসে এবং তা ৭/৮ দিন স্থায়ী হয়।
- মোট সময়কাল (৭/৮ দিন হলুদ + ৭/৮ দিন রক্ত) = ১৪/১৬ দিন।
হানাফি ফিকহের নিয়ম: ১. হায়েজের সর্বনিম্ন সময়কাল: ৩ দিন (৭২ ঘণ্টা)। ২. হায়েজের সর্বোচ্চ সময়কাল: ১০ দিন। ৩. পবিত্রতার (তুহর) সর্বনিম্ন সময়কাল: ১৫ দিন।
এখন, আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, মেয়েটির ১৫ দিন পবিত্র থাকার পর হলুদ স্রাব এসেছে। যেহেতু এটি মাসিকের রক্তের সাথে সম্পর্কিত (মাসিক শুরুর আগে আসা স্রাব), তাই হানাফি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, এই হলুদ স্রাবটিও হায়েজের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ, এটি মাসিকের রক্তের পূর্ববর্তী অংশ হিসেবে গণ্য হবে।
কুরআন ও হাদিসের ভিত্তি:
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "হায়েজ হলো সেই রক্ত যা আল্লাহ তা'আলা নারীদের জন্য নির্ধারিত করেছেন।" (বুখারি, মুসলিম)
- হাদিসে আরও এসেছে: "যখন মাসিক শুরু হয়, তখন নামাজ ছেড়ে দাও, আর যখন শেষ হয়, তখন গোসল করে নামাজ পড়ো।" (বুখারি, মুসলিম)
হানাফি ফিকহের ইমামগণ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ) এবং পরবর্তী ফকিহগণ (যেমন: ইমাম তহাবী, ইবনে আবিদীন, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, মুফতি মুহাম্মদ শফি, মুফতি তাকি উসমানি) সকলেই এই নিয়মে একমত যে, মাসিকের রক্তের সাথে সম্পর্কিত হলুদ বা ময়লা স্রাব হায়েজের অন্তর্ভুক্ত।
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"মাসিকের রক্তের সাথে সম্পর্কিত (অর্থাৎ মাসিক শুরুর আগে বা পরে) যে হলুদ বা ময়লা স্রাব আসে, তা হায়েজের অন্তর্ভুক্ত।" (রদ্দুল মুহতার, ১/২৮৩)
আল-হিদায়াহ গ্রন্থেও বলা হয়েছে:
"যদি কোনো নারী মাসিকের আগে বা পরে হলুদ স্রাব দেখে, তবে তা হায়েজ হিসেবেই গণ্য হবে, যদি তা ৩ দিনের কম না হয়।" (আল-হিদায়াহ, ১/৩০)
ডাক্তারদের মতামতের প্রসঙ্গ: ডাক্তাররা চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে পারেন যে এটি "স্বাভাবিক স্রাব" বা "লিউকোরিয়া" (Leukorrhea)। কিন্তু ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিতে, যদি এই স্রাব মাসিকের রক্তের সাথে সম্পর্কিত হয় (অর্থাৎ মাসিক শুরুর আগে বা পরে আসে) এবং তা ৩ দিনের কম না হয়, তবে তা হায়েজ হিসেবেই গণ্য হবে। কারণ, ইসলামি আইন নির্ভর করে শরয়ী নিয়মের উপর, যা নারীদের শারীরিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আপনার প্রশ্নের উত্তর: আপনি যে বোনের কথা উল্লেখ করেছেন, তার ক্ষেত্রে:
- যেহেতু ১৫ দিন পবিত্র থাকার পর হলুদ স্রাব এসেছে এবং তা মাসিকের রক্তের সাথে সম্পর্কিত (মাসিক শুরুর আগে), তাই হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, এই হলুদ স্রাবটি হায়েজের অন্তর্ভুক্ত হবে।
- অর্থাৎ, মেয়েটির হায়েজের সময়কাল হবে হলুদ স্রাব শুরুর দিন থেকে মাসিকের রক্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত (মোট ১৪/১৫ দিন)। যেহেতু এটি ১০ দিনের বেশি নয় (যদি মোট ১৪/১৫ দিন হয়, তবে এটি হায়েজের সর্বোচ্চ সীমা ১০ দিনের বেশি হয়ে যাচ্ছে, তাই এখানে বিস্তারিত নিয়ম প্রযোজ্য হবে)।
বিশেষ নোট:
- যদি মোট সময়কাল (হলুদ + রক্ত) ১০ দিনের বেশি হয়, তবে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, শুধুমাত্র প্রথম ১০ দিন হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে এবং বাকি দিনগুলো ইস্তিহাজা (অস্বাভাবিক রক্ত) হিসেবে গণ্য হবে।
- আপনার বর্ণনায় মোট সময়কাল ১৪/১৫ দিন (৭/৮ দিন হলুদ + ৭/৮ দিন রক্ত) হতে পারে। সেক্ষেত্রে, প্রথম ১০ দিন হায়েজ এবং বাকি ৪/৫ দিন ইস্তিহাজা হিসেবে গণ্য হবে।
- তবে, যদি হলুদ স্রাবটি মাসিকের রক্তের সাথে একটানা থাকে (অর্থাৎ হলুদ স্রাবের পর সাথে সাথে রক্ত আসে এবং তা ১০ দিনের মধ্যে শেষ হয়), তবে পুরো সময়কাল হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে।
গুনাহের প্রসঙ্গ: যেহেতু তিনি হানাফি মাজহাব অনুসরণ করেন, তাই তার জন্য হানাফি ফিকহের বিধান অনুযায়ী আমল করা জরুরি। ডাক্তারদের মতামতের ভিত্তিতে যদি তিনি হায়েজের বিধান না মানেন (অর্থাৎ নামাজ পড়েন বা রোজা রাখেন), তবে তা গুনাহের কারণ হবে। কারণ, শরয়ী বিধান অনুযায়ী, হায়েজ অবস্থায় নামাজ, রোজা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা ফরজ।
উপসংহার: আপনার বোনের জন্য হানাফি মাজহাব অনুযায়ী সঠিক আমল হলো: ১. হলুদ স্রাব শুরুর দিন থেকে তাকে হায়েজের বিধান মানতে হবে (নামাজ, রোজা, কুরআন স্পর্শ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা)। ২. যদি মোট সময়কাল ১০ দিনের বেশি হয়, তবে পূর্বের অভ্যাস অনুপাতে হায়েজ ধরবে, বাকি দিনগুলো ইস্তিহাজা হিসেবে গণ্য হবে। ইস্তিহাজার দিনগুলোতে তাকে নামাজ পড়তে হবে এবং রোজা রাখতে হবে (যদি রমজান হয়)। ৩. হায়েজ শেষ হলে গোসল করে পবিত্র হতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমিন)
রেফারেন্স:
- কুরআনুল কারিম (সূরা বাকারা: ২২২)
- সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
- আল-হিদায়াহ (১/৩০)
- রদ্দুল মুহতার (১/২৮৩)
- ফাতাওয়া উসমানি (১/৩৫০)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২৪৫)
- বাহিশতি জেওর (১/৮৫)
- ফাতাওয়া আলমগিরি (১/৩৫)