সুদী ঋণ পরিশোধের ইসলামী বিধান, আসল টাকা পরিশোধের নিয়ম, সুদ মাফের চেষ্টা,
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার আম্মু সুদ এর ঋণে জড়িত। আমার ইচ্ছে ছিল সুদ ছাড়া আসল টাকা গুলো পরিশোধ করার কিন্তু একবারে টাকা দিতে না পারার জন্য স্বাভাবিক ভাবে কেউ ভাগ ভাগ করে আসল টাকা টা নিতে চাওয়ার কথা না।যেহেতু সুদ জমে গেছে ; এখন সুদ না দিয়ে আসল দিব তাও খুব ই অল্প পরিমাণে।কিন্তু একত্রে দেওয়ার মত সামর্থ্য নেই।
এভাবে চেষ্টা ও করে দেখেনি। তারা নিবে না এইটা ভেবে। আম্মুর মতে অনেক জমে গেছে অল্প হলেও দিতে হবে।যেহেতু আসল এক বারে দেওয়ার সামর্থ্য নেই।
এখন আলহামদুলি্লাহ বড় লোন নিতে চায় না্।আগে কিস্তি (সুদ) নিয়ে ঋণ পরিশোধ করার বিভিন্ন পরিকল্পনা ছিল এবং তা করেছেও।
কিন্তু ছোট লোন যেগুলো দৈনিক দিতে হয় এমন লোন নিয়ে বিভিন্ন সুদ এর ঋণ দিতে চায়।এর মধ্যে ও লোন নিয়েছে। বড় ও ছোট ২ টাই তো সুদ। এজন্য আমি বুঝতে পারছি না তাদের ঋণ পরিশোধ করা এখন কী আমার জন্য জায়েজ হবে? আমি কী এক্ষেত্রে এ ব্যাপারে ইনভলভ থাকব? আবার না থেকে ও পারি না। যেহেতু আমি প্রতি মাসে পরিবারে টাকা দেই সেই টাকা তারা এই কাজে ব্যবহার করে ফেলে ;তবে জড়িয়ে ই গেলাম। কী করণীয় আমি কী টাকা দিতে পারব ঋণ পরিশোধ করার জন্য?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনার আম্মু সুদী লোনে জড়িত। আপনি চান সুদ ছাড়া আসল টাকা পরিশোধ করতে, কিন্তু একত্রে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। অল্প অল্প করে দিলে তারা নেবে না—এই ভেবে আপনি চেষ্টাও করেননি। এখন প্রশ্ন হলো, সুদী ঋণ পরিশোধে আপনি কীভাবে সাহায্য করবেন এবং এতে আপনার অংশগ্রহণ জায়েজ হবে কি না?
মূল নীতি: সুদ (রিবা) সম্পূর্ণ হারাম। সুদী লেনদেনে জড়িত হওয়া, সুদ দেওয়া, নেওয়া, লেখা বা সাক্ষী থাকা—সবই গুনাহের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)
আপনার করণীয়:
১. সুদী ঋণ পরিশোধের নিয়ম:
- ইসলামী বিধান অনুযায়ী, সুদী ঋণের ক্ষেত্রে শুধু আসল টাকা পরিশোধ করা ফরজ। সুদ হিসেবে যা জমা হয়েছে তা পরিশোধ করা জায়েজ নয়, বরং তা মাফ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
- যদি ঋণদাতা সুদ মাফ করে দেয়, তবে শুধু আসল টাকা পরিশোধ করলেই চলবে।
- যদি ঋণদাতা সুদ মাফ না করে, তবে আসল টাকা পরিশোধ করা এবং সুদ মাফের জন্য চেষ্টা করা উচিত। সুদ দেওয়া যাবে না, কারণ তা হারাম।
(সূত্র: ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৯০)
২. আপনার অংশগ্রহণ:
- আপনি যদি সরাসরি সুদী লেনদেনে জড়িত না হয়ে শুধু আসল টাকা পরিশোধে সাহায্য করেন, তবে তা জায়েজ হবে।
- তবে যদি আপনার দেওয়া টাকা সুদ হিসেবে ব্যবহার হয়, তবে তা জায়েজ হবে না।
- আপনার আম্মু যদি সুদী ঋণ পরিশোধে আপনার দেওয়া টাকা ব্যবহার করেন, তবে আপনি নিশ্চিত করুন যে তা আসল টাকা হিসেবে পরিশোধ হচ্ছে, সুদ হিসেবে নয়।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৭০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৯০)
৩. অল্প অল্প করে আসল টাকা পরিশোধ:
- আপনি যদি অল্প অল্প করে আসল টাকা পরিশোধ করতে চান, তবে ঋণদাতাকে জানিয়ে দিন যে আপনি শুধু আসল টাকা পরিশোধ করবেন, সুদ নয়।
- যদি ঋণদাতা তা না মানে, তবে আপনি সুদ মাফের জন্য চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে সালিশ বা আদালতের সাহায্য নিতে পারেন।
- যদি ঋণদাতা সুদ মাফ না করে, তবে আপনি শুধু আসল টাকা পরিশোধ করুন এবং সুদ মাফের জন্য দোয়া করুন।
(সূত্র: ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮৬; বেহেশতী জেওর, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৫)
৪. পরিবারে টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে:
- আপনি প্রতি মাসে পরিবারে টাকা দেন, যা আপনার আম্মু সুদী ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করেন। এটি আপনার জন্য গুনাহের কাজ হবে না, কারণ আপনি তা জেনে বা ইচ্ছা করে সুদী লেনদেনে দিচ্ছেন না। তবে আপনার কর্তব্য হলো তাদেরকে সুদ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা এবং আসল টাকা পরিশোধে উৎসাহিত করা।
- যদি আপনি জানেন যে আপনার দেওয়া টাকা সুদ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, তবে তা বন্ধ করা উচিত। তবে যদি তা আসল টাকা হিসেবে ব্যবহার হয়, তবে জায়েজ।
(সূত্র: ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৯১)
সারসংক্ষেপ:
- আপনি শুধু আসল টাকা পরিশোধে সাহায্য করতে পারেন, সুদ নয়।
- ঋণদাতাকে জানিয়ে দিন যে আপনি সুদ দেবেন না, শুধু আসল টাকা পরিশোধ করবেন।
- যদি ঋণদাতা সুদ মাফ না করে, তবে আপনি আসল টাকা পরিশোধ করুন এবং সুদ মাফের জন্য চেষ্টা করুন।
- আপনার দেওয়া টাকা যদি সুদ হিসেবে ব্যবহার হয়, তবে তা বন্ধ করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে সুদী লেনদেন থেকে হেফাজত করুন এবং হালাল উপায়ে ঋণ পরিশোধের তাওফিক দিন। আমিন।