জুম্মার ফরযের পূর্বের সুন্নত কি মুয়াক্কাদা, মুস্তাহাবের সজ্ঞা কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
২. জুম্মাবার ওয়াজ চলাকালীন মসজিদে নফল নামাজ পড়া যাবে?
৩. সিজদা থেকে ঊথার সময় দুই হাত দিয়ে কি পায়ে ভর দিয়ে উঠা সুন্নাহ?
৪. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যার তার বইয়ে লিখেছেন, যদি রাসুলুল্লাহ সাঃ থেকে কোন আমল সহিহ ভাবে প্রমাণিত না হয় তভে সাহাবিদের থেকে প্রমানিত হয় সহিহ সনদে বর্ণিত হয় তবে ফাজিলত বিহীন তাহিলে এই আমল মুস্তাহাব হিসাবে ধার্তব্য হবেনা। আবার অনেকে বিলেন মুস্তাহাব! এখানে কি ইখতেলাফ আছে
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতuh।
আপনার প্রশ্নগুলোর জন্য ধন্যবাদ। নিম্নে হানাফি মাযহাবের প্রামাণ্য কিতাবের আলোকে উত্তর প্রদান করা হলো:
১. জুম্মার পূর্বের ৪ রাকাত সুন্নাত কি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা?
উত্তর: জুম্মার ফরজ নামাজের পূর্বে ৪ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা পড়া হানাফি মাযহাবে প্রমাণিত এবং তা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। যদিও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে এই ৪ রাকাতের উপর সর্বদা আমল করার বিষয়ে সহিহ সনদে স্পষ্ট বর্ণনা নেই, তবে সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) থেকে এটি সহিহ সনদে প্রমাণিত।
হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থ আল-হিদায়াহ এবং ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে যে, জুম্মার আগে ৪ রাকাত সুন্নাত পড়া মুয়াক্কাদা। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) সহ অনেক বড় তাবেয়ী (যেমন: ইবরাহীম নাখয়ী, সাঈদ ইবনে জুবায়ের) থেকে এই আমল প্রমাণিত।
দলিল:
- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি জুম্মার আগে ৪ রাকাত নামাজ পড়তেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা)
- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়।
যেহেতু সাহাবাদের এই ধারাবাহিক আমল সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত, তাই হানাফি মাযহাবে এই ৪ রাকাতকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বলা হয়। এটি ছেড়ে দেওয়া গুনাহের কাজ।
২. জুম্মার খুতবা চলাকালীন মসজিদে নফল নামাজ পড়া যাবে?
উত্তর: জুম্মার খুতবা চলাকালীন সময়ে নফল নামাজ পড়া মাকরূহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)। খুতবা চলাকালীন মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যখন তুমি তোমার সাথীকে বলো 'চুপ করো' অথচ ইমাম খুতবা দিচ্ছেন, তখন তুমি অনর্থক কথা বললে।" (সহিহ বুখারী: ৯৩৪)
এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, খুতবার সময় কথা বলাও নিষেধ, তাহলে নামাজ পড়া তো আরও বড় অনর্থক কাজ। তাই খুতবা চলাকালীন মসজিদে প্রবেশ করলে সংক্ষিপ্তভাবে ২ রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়া যাবে (যদি ইমাম খুতবায় উঠার আগে হয়), কিন্তু খুতবা শুরু হয়ে গেলে শুধু বসে থাকা উচিত। রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, খুতবার সময় নামাজ পড়া মাকরূহ।
৩. সিজদা থেকে উঠার সময় দুই হাত দিয়ে পায়ে ভর দিয়ে উঠা কি সুন্নাহ?
উত্তর: সিজদা থেকে উঠার সময় দুই হাত মাটিতে রেখে (পায়ে ভর না দিয়ে) উঠা সুন্নাহ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সিজদা থেকে উঠার সময় হাতের উপর ভর দিয়ে উঠতেন।
দলিল:
- সহিহ বুখারিতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সিজদা থেকে উঠার সময় হাতের উপর ভর দিতেন। (সহিহ বুখারী: ৮২৩)
- হানাফি ফিকহের কিতাব নূরুল ঈযাহ এবং রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, সিজদা থেকে উঠার সময় হাতের উপর ভর দেওয়া সুন্নাহ।
তবে কিছু বর্ণনায় "পায়ে ভর দিয়ে উঠা" (কবরজা পদ্ধতি) সম্পর্কে আলোচনা আছে, কিন্তু হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত হলো হাতের উপর ভর দিয়ে উঠা।
৪. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের বক্তব্য ও মুস্তাহাবের সংজ্ঞা নিয়ে ইখতেলাফ
উত্তর: আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহঃ) এর বক্তব্যের সাথে হানাফি ফুকাহায়ে কিরামের মতের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তিনি বলেছেন, যদি কোনো আমল রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে সহিহ সনদে প্রমাণিত না হয়, কিন্তু সাহাবাদের থেকে সহিহ সনদে প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটি মুস্তাহাব হিসেবে ধার্য করা যাবে না।
কিন্তু হানাফি মাযহাবের নীতি হলো, সাহাবীদের আমল (যদি তা সহিহ সনদে প্রমাণিত হয় এবং অন্য কোনো সহিহ হাদিসের বিপরীত না হয়) সুন্নাহ বা মুস্তাহাব হিসেবে গ্রহণযোগ্য। কারণ সাহাবারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে দ্বীন শিখেছেন এবং তাদের আমল দ্বীনের একটি প্রমাণ।
ইখতেলাফের কারণ:
- উসুলুল ফিকহের নীতি অনুযায়ী, সাহাবীদের আমল কি সুন্নাহ হিসেবে গণ্য হবে নাকি শুধু ইজতিহাদ হিসেবে গণ্য হবে — এই বিষয়ে ইখতেলাফ আছে।
- ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এবং তার অনুসারীদের মতে, সাহাবীদের আমল যদি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগের সাথে সম্পর্কিত হয় এবং তা ইজমার পর্যায়ে পৌঁছে, তবে তা সুন্নাহ হিসেবে গণ্য হবে।
- কিন্তু যদি তা কোনো নির্দিষ্ট সাহাবীর ব্যক্তিগত ইজতিহাদ হয়, তাহলে সেটি মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য হবে, তবে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা নয়।
জুম্মার ৪ রাকাতের ক্ষেত্রে: যেহেতু এই আমলটি অনেক সাহাবী (যেমন: ইবনে মাসউদ, ইবনে উমর) থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রমাণিত এবং তাবেয়ীদের থেকেও এই আমল চলমান ছিল, তাই হানাফি মাযহাবে এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হিসেবে গণ্য। এটি শুধু মুস্তাহাব নয়, বরং ওয়াজিবের কাছাকাছি একটি সুন্নাত।
সারসংক্ষেপ: ১. জুম্মার আগের ৪ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। ২. খুতবা চলাকালীন নফল নামাজ পড়া মাকরূহ। ৩. সিজদা থেকে হাতের উপর ভর দিয়ে উঠা সুন্নাহ। ৪. সাহাবীদের সহিহ আমল মুস্তাহাব বা সুন্নাহ হিসেবে গ্রহণযোগ্য — এ বিষয়ে হানাফি মাযহাবের স্পষ্ট অবস্থান রয়েছে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।