ইসলাহ, মহিলা তালিম ও দাওয়াহ
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১.বর্তমান সমাজে ব্যাপকভাবে মুসলিমরা ইসলামের শিক্ষা থেকে দূরে সরে এসেছে। এমতাবস্থায়
ইসলাহের গুরুত্ব, মহিলা তালিমের গুরুত্ব, মহিলাদের কর্তব্য সম্পর্কে জানতে চাই। ২.অমুসলিমদেরকে ডাকার বা দাওয়াতের দায়িত্বের আগে ইসলাহ কি অধিক গুরুত্বপূর্ণ নাকি নয়?
৩. সাধারণ মানুষ তো কুরআন হাদীস সম্পর্কে পূর্ণ জানে না। কিন্তু দাওয়াতী দায়িত্ব পালন করার কথা বলা হয় আলেমদেরকে। তাহলে নন আলেম লোকের জন্য অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার বিধান কি? মহিলাদের জন্য?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রশ্নের উত্তর প্রদানের পূর্বে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি যে, ইসলামে ইসলাহ (আত্মশুদ্ধি) এবং দাওয়াহ (তাবলীগ) উভয়টিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ দুটির মধ্যে সম্পর্ক হলো ভিত্তি ও নির্মাণের। ইসলাহ হলো ভিত্তি, আর দাওয়াহ হলো নির্মাণ। ভিত্তি মজবুত না হলে নির্মাণ টেকসই হয় না। তাই বর্তমান সমাজে মুসলিমরা যখন ইসলামের শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন সবার আগে নিজেদের সংশোধন (ইসলাহ) করা এবং নিজেদের ঘরকে (মহিলাদের তালিম) ইসলামের আলোয় আলোকিত করা জরুরি এবং অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দেওয়ার কথা চিন্তা করা উচিত।
১. ইসলাহ, মহিলা তালিম ও মহিলাদের কর্তব্য:
বর্তমান যুগে মুসলিম সমাজে ইসলামী শিক্ষা থেকে দূরত্বের মূল কারণ হলো আমলের দুর্বলতা এবং ইলমের অভাব। কুরআন ও হাদিসে ইসলাহ (আত্মশুদ্ধি) ও তালিমের (শিক্ষা অর্জন ও প্রদান) উপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
- ইসলাহর গুরুত্ব: আল্লাহ তাআলা বলেন, "সেই সত্তার শপথ যিনি আমার প্রাণ নিয়ন্ত্রণ করেন, নিশ্চয়ই তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের উপর এমন শাস্তি পাঠাবেন, অতঃপর তোমরা দুআ করবে, কিন্তু তা কবুল হবে না।" (তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৯)।
ইসলাহ অর্থ হলো নিজের অন্তর ও আমলকে সংশোধন করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সাবধান! দেহের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে; তা যদি ভালো হয়, তাহলে গোটা দেহ ভালো হয়; আর তা যদি নষ্ট হয়, তাহলে গোটা দেহ নষ্ট হয়ে যায়। সাবধান! তা হলো অন্তর।" (বুখারি, হাদিস: ৫২)। তাই সমাজ সংস্কারের পূর্বশর্ত হলো নিজের অন্তর ও আমল সংশোধন করা।
- মহিলা তালিমের গুরুত্ব: মহিলারা সমাজের অর্ধেক অংশ এবং তারা পুরো পরিবারের প্রথম বিদ্যালয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "প্রত্যেক ব্যক্তি দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" (বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)।
মহিলাদের জন্য দ্বীনি ইলম অর্জন করা ফরজ। তাদের ঘরে বসে কুরআন-হাদিসের শিক্ষা অর্জন করা এবং পরিবারের সদস্যদেরকে তা শেখানো অত্যন্ত সাওয়াবের কাজ। হাদিসে এসেছে, "যে ব্যক্তি দ্বীনি ইলম শেখার উদ্দেশ্যে কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।" (মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)। মহিলাদের তালিমের মাধ্যমে ঘরকে জান্নাতের নমুনায় পরিণত করা যায় এবং সন্তানদেরকে সঠিক দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া যায়।
- মহিলাদের কর্তব্য: মহিলাদের প্রধান কর্তব্য হলো নিজের দ্বীনি ইলম অর্জন করা, নামাজ-রোজা পালন করা, পর্দা রক্ষা করা, স্বামীর আনুগত্য করা এবং সন্তানদেরকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করা। ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় (১/৫৪) উল্লেখ আছে, মহিলাদের জন্য ঘরে অবস্থান করা এবং ঘরের কাজকর্ম ও সন্তানদের তালিম দেওয়াই উত্তম। তবে প্রয়োজনে তারা মহিলাদের মাঝে দ্বীনি শিক্ষা দিতে পারেন।
২. অমুসলিমদের দাওয়াতের আগে ইসলাহ কি অধিক গুরুত্বপূর্ণ?
হ্যাঁ, অমুসলিমদের দাওয়াতের আগে মুসলিমদের নিজেদের ইসলাহ (সংশোধন) করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কুরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা প্রথমে নিজেদের সংশোধনের কথা বলেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, "হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।" (সূরা তাহরিম: ৬)। এই আয়াতে সবার আগে নিজেদের ও নিজেদের পরিবারকে সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়া নেক কাজ, কিন্তু নিজেরা যখন আমল থেকে দূরে, তখন আমাদের দাওয়াত কার্যকর হবে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি নিজে সঠিক পথে নেই, সে অন্যকে সঠিক পথে আনতে পারে না।" তাই প্রথমে নিজেদের ইসলাহ করা ফরজ, অতঃপর অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়া।
৩. নন-আলেম ও মহিলাদের জন্য অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার বিধান:
দাওয়াতের দায়িত্ব শুধু আলেমদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রত্যেক মুসলিমের উপর তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দাওয়াতের দায়িত্ব রয়েছে। তবে শর্ত হলো, যা জানা আছে তা-ই বলতে হবে; যা জানা নেই তা বলতে যাওয়া জায়েয নেই। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "তোমরা বলো, এটাই আমার পথ; আমি আল্লাহর দিকে আহ্বান করি জ্ঞান ও প্রমাণের ভিত্তিতে।" (সূরা ইউসুফ: ১০৮)। অর্থাৎ দাওয়াত দিতে হবে ইলমের ভিত্তিতে।
-
নন-আলেমদের জন্য: সাধারণ মানুষ যদি কুরআন-হাদিসের সহজ-সরল বিষয় জানে (যেমন: তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত, নামাজ, রোজার মৌলিক বিষয়), তাহলে সে অমুসলিমদেরকে ইসলামের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে দাওয়াত দিতে পারে। তবে জটিল মাসআলা বা বিতর্কিত বিষয়ে আলেমদের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে যে আমার সম্পর্কে একটি হাদিসও জানে, সে যেন তা পৌঁছে দেয়।" (বুখারি, হাদিস: ৩৪৬১)। তবে মনে রাখতে হবে, দাওয়াতের পূর্বে নিজের আমল ঠিক করা জরুরি, নতুবা দাওয়াত ফলপ্রসূ হবে না।
-
মহিলাদের জন্য: মহিলাদের জন্য অমুসলিম মহিলাদেরকে দাওয়াত দেওয়া জায়েয এবং সাওয়াবের কাজ। তবে তাদের জন্য পর্দার বিধান মেনে চলা জরুরি। তারা অমুসলিম মহিলাদের সাথে বসে ইসলামের মৌলিক বিষয় (তাওহিদ, আখিরাত, নবুওয়াত) সম্পর্কে আলোচনা করতে পারেন। তবে অমুসলিম পুরুষদের সাথে কথা বলা বা তাদেরকে দাওয়াত দেওয়া পর্দার কারণে জায়েয নয়, যদি না কোনো মাহরাম পুরুষের উপস্থিতি থাকে এবং প্রয়ােজন হয়। ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় (৫/৩২৮) উল্লেখ আছে, মহিলাদের জন্য অপরিচিত পুরুষের সাথে কথা বলা জায়েয নয়। তাই মহিলারা মহিলাদেরকেই দাওয়াত দেবেন।
উপসংহার: বর্তমান যুগে সবার আগে নিজেদের ইসলাহ করা, নিজেদের ঘরকে তালিমের মাধ্যমে আলোকিত করা এবং নিজেদের আমল ঠিক করা জরুরি। এরপর নিজেদের জানা বিষয়গুলো অমুসলিমদের মাঝে পৌঁছে দেওয়া প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। তবে মহিলারা পর্দার মধ্যে থেকে মহিলাদেরকে দাওয়াত দেবেন।
রেফারেন্সসমূহ:
- আল-কুরআন (সূরা তাহরিম: ৬, সূরা ইউসুফ: ১০৮)
- সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২, ৮৯৩, ৩৪৬১
- সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৯
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪, ৫/৩২৮
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ১/৩৮
- বেহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০-৪০
*আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)