নামাজ, জিহাদ, আমলে কাসির
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১. নামাজে আমিলে কাসির হয় যদি ৩ বার বা ৩ রুকন চুলকানো হয়। আমার প্রশ্ন এই ব্যাপারে কি হাদিসে বা আয়াতে স্পষ্ট বা ইংগিত আছে থাকলে উক্ত আয়াত বা হাদিস টা দিবেন ইনশাআল্লাহ।
২। নামাজে সিজদাতে যাওয়ার সময় ও উঠার সময় দুই হাত কোথায় রাখবো? সুন্নাহ কি?
৩। নামাজে মাসবুক ব্যাক্তির সালাম ফিরানোর আগে তাশাহুদের পর দুরুদ শরিফ ও মাসুরা পাঠ করতে পারবে, এইটা কি সুন্নাহ নাকি জায়েজ? সাহাবায়ে কেরাম কিভাবে আমল করতেন।
৪। সালাতের সাওমের হজ্বের নির্দিষ্ট শরয়ী ব্যখা আছে, শাব্দিক অর্থ প্রয়োগ করা হয় না।
আমার ❓, জিহাদের শাব্দিক অর্থ চেষ্টা মেহনত সাধনা। অন্যান্য দ্বিনি ক্ষেতে কি জিহাদ শাব্দিক অর্থ প্রয়োগ করা যায়? সাহাবায়ে কেরাম কি এভাবে প্রয়োগ করতেন?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নে প্রদান করা হলো:
১. নামাজে 'আমালে কাসির' (অধিক কাজ) সম্পর্কে কুরআন-হাদিসের দলিল
আপনার প্রশ্নের উত্তর হলো, কুরআন ও হাদিসে 'আমালে কাসির'-এর এই নির্দিষ্ট সংখ্যা (৩ বার বা ৩ রুকন) নিয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। এটি ফিকহের ইজতেহাদি বিষয়। তবে এর ভিত্তি কুরআন ও হাদিসের সাধারণ নির্দেশনা থেকে নেওয়া হয়েছে।
কুরআনের দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَىٰ وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ﴾ "তোমরা সকল নামাজের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষত মধ্যবর্তী নামাজের (আসরের) প্রতি এবং আল্লাহর সামনে একান্ত বিনয়ের সাথে দাঁড়াও।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩৮)
এই আয়াতে নামাজে বিনয় ও স্থিরতা (খুশু-খুযু) বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 'আমালে কাসির' নামাজের এই খুশু-খুযু ও স্থিরতাকে নষ্ট করে দেয়, তাই তা নিষিদ্ধ।
হাদিসের দলিল: ১. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই নামাজে এমন কিছু কাজ রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন না, তা হলো নামাজে অযথা নড়াচড়া করা।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭২২)
২. হযরত আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যখন তুমি নামাজে দাঁড়াও, তখন আল্লাহর রহমতের দিকে তাকাও। আল্লাহ তাআলা নামাজরত বান্দার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, যতক্ষণ না সে অন্য দিকে মনোযোগ দেয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৯১০)
হানাফি ফিকহের ব্যাখ্যা: হানাফি ফিকহে 'আমালে কাসির'-এর সংজ্ঞা হলো: এমন কাজ যা নামাজের বাহ্যিক অবস্থা দেখে মনে হয় যে, ব্যক্তি নামাজে নেই। যেমন: একই রুকনে তিনবার চুলকানো, অথবা একবার এমনভাবে চুলকানো যা তিনটি রুকন পর্যন্ত চলতে থাকে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪১৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১০৪)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "আমালে কাসির হলো এমন কাজ যা নামাজের খুশু-খুযু ও স্থিরতাকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দেয়।" (রদ্দুল মুহতার, ২/৪১৭)
২. সিজদায় যাওয়ার সময় ও উঠার সময় দুই হাত কোথায় রাখবে?
সিজদায় যাওয়ার সময় ও উঠার সময় হাত রাখার বিষয়ে সুন্নাহ হলো:
সিজদায় যাওয়ার সময়: সিজদায় যাওয়ার সময় প্রথমে হাঁটু মাটিতে রাখা সুন্নাত, তারপর হাত, তারপর কপাল ও নাক। হাত দুটি কাঁধ বরাবর অথবা কানের লতি বরাবর রাখা সুন্নাত। তবে হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত হলো, হাত দুটি কাঁধ বরাবর রাখা। (আল-হিদায়া, ১/৪৮; রদ্দুল মুহতার, ২/৩০৫)
সিজদা থেকে উঠার সময়: সিজদা থেকে উঠার সময় প্রথমে কপাল উঠাতে হবে, তারপর হাত, তারপর হাঁটু। হাত মাটিতে ভর দিয়ে উঠা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১০৪)
দলিল: হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেছি, তিনি সিজদায় যাওয়ার সময় প্রথমে হাঁটু রাখতেন, তারপর হাত রাখতেন, তারপর কপাল ও নাক রাখতেন। আর সিজদা থেকে উঠার সময় প্রথমে কপাল উঠাতেন, তারপর হাত, তারপর হাঁটু।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৮৩৮; সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১১৪১)
৩. মাসবুক ব্যক্তির সালাম ফিরানোর আগে দুরুদ শরিফ ও মাসুরা পাঠ করা
মাসবুক (যে ব্যক্তি ইমামের সাথে প্রথম রাকাত পায়নি) ব্যক্তি ইমামের সালাম ফিরানোর পর নিজের বাকি রাকাতগুলো পূর্ণ করবে। ইমামের সালাম ফিরানোর আগে মাসবুক ব্যক্তি তাশাহহুদে বসে দুরুদ শরিফ ও মাসুরা (দোয়ায়ে মাসুরা) পাঠ করবে না। বরং শুধু তাশাহহুদ পাঠ করবে।
৪. জিহাদের শাব্দিক অর্থ প্রয়োগ
আপনার প্রশ্নটি হলো, "জিহাদের শাব্দিক অর্থ চেষ্টা-মেহনত-সাধনা। অন্যান্য দ্বীনি ক্ষেত্রে কি জিহাদ শাব্দিক অর্থ প্রয়োগ করা যায়? সাহাবায়ে কেরাম কি এভাবে প্রয়োগ করতেন?"
উত্তর: জিহাদের শাব্দিক অর্থ হলো "চেষ্টা করা, মেহনত করা, সাধনা করা"। ইসলামি পরিভাষায় জিহাদ বলতে মূলত আল্লাহর পথে প্রাণ ও সম্পদ দিয়ে সংগ্রাম করাকে বোঝায়। তবে কুরআন ও হাদিসে জিহাদ শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে:
১. আত্মশুদ্ধির জিহাদ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "মুজাহিদ হলো সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের সাথে জিহাদ করে।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬২১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৯৩৪)
২. শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ: কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَجَاهِدْهُمْ بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا﴾ "আর এর মাধ্যমে (কুরআনের মাধ্যমে) তাদের সাথে মহাজিহাদ করো।" (সূরা আল-ফুরকান: ৫২)
৩. মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ: ﴿يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ﴾ "হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করো।" (সূরা আত-তাওবাহ: ৭৩)
সাহাবায়ে কেরামের প্রয়োগ: সাহাবায়ে কেরাম (রা.) জিহাদ শব্দটি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বরং দ্বীনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতেন। যেমন:
১. হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে জিহাদ বলেছেন। ২. হযরত উমর (রা.) নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাকে জিহাদ বলেছেন। ৩. হযরত আলী (রা.) ইলম অর্জন করাকে জিহাদ বলেছেন।
হানাফি ফিকহের ব্যাখ্যা: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: "জিহাদ হলো আল্লাহর পথে প্রাণ, সম্পদ, জিহ্বা ও অন্তর দিয়ে সংগ্রাম করা।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/১৮০)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: "জিহাদের শাব্দিক অর্থ চেষ্টা-মেহনত। ইসলামি পরিভাষায় এর ব্যবহার মূলত আল্লাহর পথে সংগ্রামের জন্য। তবে অন্যান্য দ্বীনি ক্ষেত্রেও এর শাব্দিক অর্থ প্রয়োগ করা জায়েয, যেমন: নফসের জিহাদ, শয়তানের জিহাদ, ইলমের জিহাদ ইত্যাদি।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৪/৪৫২)
সারসংক্ষেপ: জিহাদ শব্দটি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর শাব্দিক অর্থ (চেষ্টা-মেহনত-সাধনা) অন্যান্য দ্বীনি ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এভাবে প্রয়োগ করতেন। তবে শরয়ী পরিভাষায় "জিহাদ" বলতে সাধারণত আল্লাহর পথে যুদ্ধ করাকে বোঝানো হয়।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।