স্বপ্নে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করা, বারবার একই স্বপ্ন দেখা এবং ঘুমাতে ভয় পাওয়ার ব্যাখ্যা কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 3739
Questioner: Maymona Jahan Tanny
Question Asked: 09 Aug 2026, 07:48 PM
Reviewed & Published: 09 Aug 2026, 07:51 PM
Views: 9
Tokens: 4,350
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।আমার নানু কয়েকদিন ধরে একই স্বপ্ন দেখছে।স্বপ্নে উনি স্বর্ণ (হাতের আংটি,কানের জিনিস) জানালা দিয়ে চুরি হয়ে যেতে দেখে।নানু ঘুমে মাঝে মাঝে চিৎকারের মতো শব্দ করে। নানাভাই বলেছে যে অনেক আগে থেকেই নানু স্বপ্নে বলে "ঐ দেখেন কে দাড়ায় আাছে,আমার ছোট মামাতো ভাইয়ের নাম নিয়ে বলে,দেখেন তাকে নিয়ে যাচ্ছে"। নানু একা ঘুমাতেও ভয় পায়,স্বপ্নে এগুলো দেখার কারণে।আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসায় নানু মাগরিব নামাজের পর ঘুমিয়ে ছিলো,পরেরদিন আমরা খেয়াল করলাম নানুর যেভাবে শুয়ে ছিলো ঠিক ঐভাবে নানুকে round করে গলানো মোম ফেলে রাখা হয়েছিলো, অথচ আমরা কেউ এই কাজটি করি নি। নানুর এই সমস্যাগুলো কেন হচ্ছে

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার নানুর বিষয়ে জানতে পেরে আমরা উদ্বিগ্ন। আপনার নানুর ঘুমের মধ্যে চিৎকার করা, বারবার একই স্বপ্ন দেখা এবং ঘুমাতে ভয় পাওয়া—এগুলো জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উভয় কারণেই হতে পারে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর সমাধান রয়েছে।

১. স্বপ্নের ব্যাখ্যা (Interpretation of the Dream): আপনার নানু যে স্বপ্নে স্বর্ণ (আংটি, কানের দুল) চুরি হয়ে যেতে দেখেন, এটি ইসলামী স্বপ্নের ব্যাখ্যায় একটি ইঙ্গিত হতে পারে। ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.)-এর মতে, স্বর্ণ সাধারণত দুনিয়ার ভোগ-বিলাস, সৌন্দর্য বা নারীর জন্য সুখের প্রতীক। স্বর্ণ চুরি হয়ে যাওয়া দেখার অর্থ হতে পারে—কোনো প্রিয় বস্তু বা সম্পদ হারানোর ভয়, অথবা পার্থিব জীবনে কোনো ক্ষতির আশঙ্কা। তবে এটি কোনো অমঙ্গলের নির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং এটি মানসিক উদ্বেগের প্রতিফলনও হতে পারে।

২. ঘুমের মধ্যে চিৎকার ও ভয়: ঘুমের মধ্যে চিৎকার করা বা ভয় পাওয়া (Night Terrors) একটি চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত বিষয়। এটি মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা বা শারীরিক দুর্বলতার কারণে হতে পারে। তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণে, কিছু ক্ষেত্রে এটি জ্বিন বা বদনজরের প্রভাবও হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে দুঃস্বপ্ন, (৩) মানুষের মনের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬৩)

যেহেতু আপনার নানু বারবার একই ধরনের স্বপ্ন দেখছেন এবং ঘুমাতে ভয় পান, এটি শয়তানের প্রভাব বা মানসিক অস্থিরতার কারণে হতে পারে।

৩. মোম দিয়ে ঘিরে রাখার বিষয়টি: আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনার নানুকে ঘিরে গলানো মোম ফেলে রাখা হয়েছিল, অথচ কেউ তা করেনি। এটি একটি ভয়ঙ্কর বিষয়। ইসলামে মোম বা তাবিজ-কবজ দিয়ে ঘিরে রাখার কোনো ভিত্তি নেই। এটি শিরক বা কুসংস্কারের পর্যায়ে পড়তে পারে। তবে এটি যদি কারো দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়ে থাকে, তবে তা জাদু বা বদনজরের প্রভাব হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) জাদু ও বদনজর থেকে আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন।

৪. করণীয় (What to Do):

ক. চিকিৎসা গ্রহণ: প্রথমে আপনার নানুকে একজন ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ঘুমের সমস্যা, দুঃস্বপ্ন এবং চিৎকারের শারীরিক কারণ থাকতে পারে। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

খ. আধ্যাত্মিক চিকিৎসা (রুকইয়াহ): রাসূলুল্লাহ (সা.) দুঃস্বপ্ন দেখলে বলতে শিখিয়েছেন:

"أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ وَمِنْ شَرِّ هَذِهِ الرُّؤْيَا" (উচ্চারণ: আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম, ওয়া মিন শাররি হাযিহির রু'য়া) অর্থ: "আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে এবং এই স্বপ্নের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬১)

ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে ফুঁ দিতে বলুন। এছাড়া সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আমানার রাসূলু) পড়ার অভ্যাস করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫০০৯)

গ. বদনজর থেকে বাঁচার দোয়া: নানুকে নিয়মিত এই দোয়া পড়তে বলুন:

"أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ" (উচ্চারণ: আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক) অর্থ: "আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামসমূহের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭০৮)

ঘ. মোম বা কুসংস্কার পরিহার: মোম দিয়ে ঘিরে রাখা বা এরকম কোনো কুসংস্কার সম্পূর্ণরূপে পরিহার করুন। এটি ইসলামসম্মত নয়। বরং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং উপরোক্ত দোয়া ও রুকইয়াহ করুন।

ঙ. পরিবারের সহযোগিতা: নানুকে একা ঘুমাতে দেবেন না। তার পাশে কেউ থাকলে তিনি নিরাপদ বোধ করবেন। তাকে মানসিকভাবে সান্ত্বনা দিন এবং ভয় দূর করার চেষ্টা করুন।

৫. গুরুত্বপূর্ণ নোট: আপনার নানুর সমস্যা যদি জাদু বা বদনজরের কারণে হয়, তবে উপরোক্ত রুকইয়াহ এবং দোয়া যথেষ্ট। তবে যদি শারীরিক কোনো অসুস্থতা থাকে, তবে ডাক্তারের পরামর্শ অপরিহার্য। ইসলামে চিকিৎসা করানোকে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "প্রতিটি রোগের নিরাময় আছে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৬৭৮)

আল্লাহ আপনার নানুকে সুস্থতা দান করুন এবং তাকে সব ধরনের ভয় ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিন। আমিন।

রেফারেন্স:

  • সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫০০৯, ৫৬৭৮
  • সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬১, ২২৬৩, ২৭০৮
  • ইমাম ইবনে সীরীন, তাফসীরুল আহলাম (স্বপ্নের ব্যাখ্যা)
  • ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৫২ (দুঃস্বপ্নের চিকিৎসা প্রসঙ্গে)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.