একজনের জন্য দুআ করা ও তাকে স্বপ্নে দেখা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি দীর্ঘদিন যাবত আল্লাহ কাছে দুআ করেছি যে ইয়া আল্লাহ আমি তোমার বান্দা ....... কে পছন্দ করি, আপনি উনাকে আমার জন্য এবং আমাকে ওনার জন্য উত্তম কল্যাণকর, চক্ষু শীতলকারী , হৃদয় প্রশান্তি দানকারী করে দেন। আমরা যেন বিবাহের পর একত্রে একছাদের নিচে থাকতে পারি, দুই পরিবারের সাথে যেন আমাদের সুসম্পর্ক থাকে এবং প্রত্যেকেই যেন একেঅপর কে আল্লাহ জন্য ভালোবাসে। যা আমার অন্তরে অন্যরকম একটা প্রশান্তি এনে দিত, এবং আমি দোয়া কবুলের ভরসা পেতাম।
পরবর্তীতে কিছু কারণবশত আমি এই দোয়া করা বন্ধ করে দেই, দোয়া করলেও যাকে আমি পছন্দ করি তার নাম বাদ দিয়ে দুআ করার চেষ্টা করি। কিন্তু এতে করে আমি আগের মত প্রশান্তি অনুভব করতাম না এবং দোয়া করার যে স্বাদ তা অনুভব করতাম না। ফলশ্রুতি আমি আবারো তার নাম উল্লেখ করে আল্লাহর নিকট দুআ করতাম।
উক্ত ব্যক্তি কে নিয়ে আমি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্বপ্ন দেখেছি যা ইতিমধ্যে বাস্তবে ঘটেছে। কিন্তু তিনটি স্বপ্ন যেগুলো আমাকে একটু ভাবাচ্ছে
১. আমি দেখেছি আমি যাকে বিবাহের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি তার সাথে অন্য কারো বিবাহের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। আমি চারপাশে স্পষ্ট কোন কিছু দেখিনি কিন্তু এরকম আভাস পেয়েছি এবং আমি আল্লাহর কাছে ঐ একই দোয়া করছি যাতে তিনি আমার দোয়া কবুল করে নেন। আমার যতটুকু মনে পড়ে আমি দোয়ায় তার নাম স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছিলাম।
২. আমি দেখেছি আমি যাকে বিবাহ করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি তার সাথে অন্য কারো বিবাহ হয়ে যাচ্ছে আর আমি তখন অঝোরে কান্না করতে করতে আল্লাহর কাছে দোয়া করছি যাতে তিনি আমার দোয়া কবুল করে নেন। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে আমি দোয়ায় তার নাম উল্লেখ করেছি।
৩. জানুয়ারির ৫ তারিখ সকালে আমি দেখেছি আমি কোন একটা কারণে ঘর থেকে বের হই তখন আমার ঠোঁটে এক ফোঁটা বৃষ্টির পানি এসে পড়ে স্বপ্নে আমার মনে পড়ে বৃষ্টির মধ্যে দোয়া করলে দোয়া কবুল হয় আমি দৌড়াতে শুরু করি আর দৌড়াতে দৌড়াতে আল্লাহর কাছে ঐ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে যেভাবে সবসময় দুআ করি এভাবেই দুআ করতে থাকি। এরপর আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়।
৪. আমি স্বপ্ন দেখেছি আমি (পরিচিত)একজন ব্যক্তির সাথে কথা বলছিলাম কোন কারনে ঐ ব্যক্তি অনুমতি নিয়ে আমার ঘর থেকে বের হয় এবং কথা ছিল তিনি আবার ফিরবেন। তারপর ওই ব্যক্তি( আমি যার জন্য দুআ করি) সে আমার ঘরে ঢুকে কাকুতি-মিনতি করে আমার কাছে বারবার ক্ষমা চাইছে বারবার মাফ চাইছে বারবার আমাকে কনভেন্স করার চেষ্টা করতেছে যাতে আমি তার জীবনে ফিরে আসি, নতুন করে তাল সাথে সব কিছু শুরু করি। আমি তাকে একটু সামাল দিয়ে বলি আচ্ছা ঠিক আছে অমুক ব্যক্তি ঘরে এসেছে, আর স্বপ্নের শুরুতে যে ব্যক্তিকে দেখেছিলাম তিনি ঘরে ফিরে আসেন এবং তার পেছনে পেছনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েও হাসি মুখে ঢুকে আসে ( ঐ মহিলাবাদে বাকি দুইব্যক্তি আমার পরিচিত)
উক্ত ব্যক্তির পরিবার এবং আমার পরিবার আমাদের একে অপরকে পছন্দ করার বিষয়ে জানেন কিন্তু তারা মেনে নেয়নি বিষয়টি কিন্তু তবুও বিগত তিন বছর আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে ধৈর্যের সাথে দোয়া করার চেষ্টা করেছি। বর্তমানে ওই ব্যক্তির সাথে একটি মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে ছেলের মা মেয়েটিকে আংটি পড়িয়েছেন। কিন্তু এখনো বিয়ে হয় নি। ছেলেটি বর্তমানে প্রবাসী।
আমি কেন এমন স্বপ্ন দেখেছিলাম এর ব্যখ্যা ই বা কি এবং এখন আমার আসলে কি করনীয় দয়া করে আমাকে কিছু দিক নির্দেশনা দিয়ে সাহায্য করবেন।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার দীর্ঘ প্রশ্নটি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। আপনার আবেগ, অনুভূতি এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সবই বুঝতে পেরেছি। আসুন আমরা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামী দৃষ্টিকোণে স্বপ্ন তিন প্রকার: ১. সুসংবাদদায়ক স্বপ্ন - যা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় ২. মনস্তাত্ত্বিক স্বপ্ন - যা মানুষের নিজের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন ৩. শয়তানের প্ররোচনা - যা মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য হয়
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা যা মানুষ নিজেই করে, (৩) শয়তানের ভয় দেখানো।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬৩)
আপনি যে স্বপ্নগুলো দেখেছেন, সেগুলো মূলত আপনার মনস্তাত্ত্বিক স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। কারণ:
- আপনি দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যক্তির কথা চিন্তা করছেন
- তার সাথে বিবাহের জন্য দোয়া করছেন
- তার পরিবার ও আপনার পরিবারের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে
- এই চিন্তা আপনার মনের গভীরে প্রোথিত
ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) বলেছেন, "স্বপ্ন হলো মানুষের মনের প্রতিচ্ছবি।" (ফাতহুল বারী, ১২/৩৫২)
আপনার করণীয় সম্পর্কে ইসলামী দিকনির্দেশনা
১. দোয়া চালিয়ে যান, তবে শর্তসাপেক্ষে
আপনি যে দোয়া করছেন তা জায়েয, তবে উত্তম হলো
- নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে সাধারণভাবে দোয়া করা
- বলা: "ইয়া আল্লাহ! আমার জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী নির্ধারণ করুন, যিনি আমার জন্য কল্যাণকর হবেন"
রাসূলুল্লাহ (সা.) শিখিয়েছেন: "اللَّهُمَّ إِنْ كَانَتْ هَذِهِ الْأَمْرُ خَيْرًا لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ" "হে আল্লাহ! যদি এই কাজটি আমার জন্য দীন, জীবিকা ও পরিণামের দিক থেকে কল্যাণকর হয়, তবে তা আমার জন্য নির্ধারণ করুন, সহজ করে দিন এবং তাতে বরকত দিন।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১১৬২)
২. ইস্তিখারা করুন
যেহেতু বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের, তাই ইস্তিখারা করা অত্যন্ত উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কেউ যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের ইচ্ছা করে, তখন সে যেন দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে এই দোয়া করে..." (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১১৬২)
৩. তাকদীরের উপর ভরসা রাখুন
আল্লাহ তায়ালা বলেন: "وَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَىٰ أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ" "তোমাদের জন্য কল্যাণকর না হওয়া সত্ত্বেও তোমরা হয়তো কোনো বিষয় পছন্দ করছো, আর তোমাদের জন্য অকল্যাণকর না হওয়া সত্ত্বেও তোমরা হয়তো কোনো বিষয় অপছন্দ করছো। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।" (সূরা আল-বাকারা: ২১৬)
৪. বাস্তবতা মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি
যেহেতু ঐ ব্যক্তির সাথে অন্যত্র বিবাহের কথা ঠিক হয়েছে, তাই:
- আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করুন
- মনে রাখবেন, আল্লাহ যা করেন তা আমাদের অজানা কল্যাণের জন্যই করেন
- হতাশ না হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন
৫. বিবাহের জন্য সাধারণ দোয়া করুন
আপনি এই দোয়া করতে পারেন: "رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ" "হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী।" (সূরা আল-কাসাস: ২৪)
স্বপ্ন সম্পর্কে সতর্কতা
১. স্বপ্নকে ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না - ইসলামে স্বপ্নের ভিত্তিতে বিবাহ বা বাতিল করার বিধান নেই ২. স্বপ্ন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করবেন না - এটি আপনার মানসিক চাপ বাড়াতে পারে ৩. স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়ে আল্লাহর উপর ভরসা রাখা উত্তম
চূড়ান্ত পরামর্শ
১. আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখুন - তিনিই সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী ২. ইস্তিখারা করুন - আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য প্রার্থনা করুন ৩. ধৈর্য ধারণ করুন - আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন ৪. বাস্তবতা মেনে নিন - যদি ঐ ব্যক্তির সাথে অন্যত্র বিবাহ ঠিক হয়ে থাকে, তবে তা আল্লাহর ইচ্ছায় হয়েছে ৫. নিজের জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী প্রার্থনা করুন - নাম উল্লেখ না করে সাধারণ দোয়া করুন
আল্লাহ তায়ালা বলেন: "وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ" "যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)
আল্লাহ আপনার জন্য যা উত্তম তা নির্ধারণ করুন এবং আপনাকে ধৈর্য ও সন্তুষ্টি দান করুন। আমীন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।