আমার একটা বড় জবা ফুলগাছ আছে।কায়েকদিন আগে জানতে পারি পাশের বাড়ির হিন্দু একজন গাছ থেকে ফুল নিচ্ছে
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনি আপনার জবা ফুলগাছ থেকে অন্য কেউ (বিশেষত অমুসলিম) ফুল নিয়ে পূজায় ব্যবহার করছে—এই বিষয়ে জানতে পেরে উদ্বিগ্ন হয়েছেন এবং এর গুনাহের ভাগীদার হওয়া নিয়ে জানতে চেয়েছেন। নিচে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১) পূজায় ব্যবহৃত ফুলের গুনাহের অংশীদার হওয়া প্রসঙ্গে
আপনি যদি জানতেন যে, আপনার গাছ থেকে ফুল নিয়ে গিয়ে পূজা (শিরক) করা হচ্ছে এবং আপনি তা নিষেধ না করে নীরব থাকতেন অথবা অনুমতি দিতেন, তাহলে নিশ্চিতভাবে আপনি সেই গুনাহের অংশীদার হতেন। কেননা, ইসলামে অন্যকে গুনাহের কাজে সাহায্য করা বা সহযোগিতা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পরকে সাহায্য করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সাহায্য করো না।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ২)
আপনি যেহেতু ২/৩ দিন নিষেধ করেছেন, তাই আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এখন আবার অন্য একজন প্রতিদিন ফুল নিয়ে যাচ্ছে এবং আপনি তাকে নিষেধ করতে পারেননি (কারণ আপনি তাকে দেখেননি, আপনার পরিবারের লোকজন দেখেছেন)। এই অবস্থায় আপনার কর্তব্য হলো তাকে নিষেধ করা বা অন্তত আপনার পরিবারের মাধ্যমে নিষেধ করানো। যদি আপনি নিষেধ করার পরও সে না শোনে, তাহলে তার পাপের অংশীদার আপনি হবেন না, ইনশাআল্লাহ। কারণ আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধের চেষ্টা করেছেন।
হানাফি ফিকহের নির্দেশনা: ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় (আলমগীরি) আছে, কোনো মুসলিমের জমিতে যদি অমুসলিম ফসল বা ফল নষ্ট করে বা নিয়ে যায়, তাহলে মালিকের জন্য তা প্রতিরোধ করা ওয়াজিব। যদি সে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয় এবং না করে, তাহলে সে গুনাহগার হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৫৪)
সুতরাং, আপনার জন্য এখনই করণীয় হলো:
- আপনি নিজে গিয়ে অথবা পরিবারের লোকজনকে দিয়ে সেই ব্যক্তিকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করুন।
- যদি সম্ভব হয়, গাছটির চারপাশে বেড়া বা নেট দিয়ে ঘিরে দিন, যাতে কেউ সহজে ফুল তুলতে না পারে।
- যদি নিষেধ করার পরও সে ফুল নেয়, তাহলে আপনি গুনাহের অংশীদার হবেন না, বরং সে নিজেই পাপী হবে।
২) আপনার অজান্তে পূর্বে ফুল নিয়ে পূজা করার গুনাহ আপনার উপর বর্তাবে কি?
আপনি যখন জানতেনই না যে, আপনার গাছ থেকে ফুল নিয়ে পূজা করা হচ্ছে, তখন আপনার উপর এর কোনো গুনাহ হবে না। ইসলামে গুনাহের শর্ত হলো—সেটি জেনে-বুঝে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে করা। আপনি তো জানতেই ছিলেন না, বরং আপনি নিজেও সম্ভবত ফুলটি ব্যবহার করতেন বা গাছটি দেখাশোনা করতেন। তাই বিগত দিনগুলোর জন্য আপনি সম্পূর্ণ দায়মুক্ত।
হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যা করতে বাধ্য করা হয় (জবরদস্তি) তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৫, সহীহ)
যেহেতু আপনি অজান্তে ছিলেন, তাই এটি 'ভুল' বা 'অজ্ঞতা' এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর রহমতে আপনার কোনো গুনাহ হবে না।
রাস্তার পাশের আরেকটি গাছ প্রসঙ্গে
আপনি উল্লেখ করেছেন, রাস্তার পাশে আরেকটি গাছ আছে, সেখান থেকেও কেউ ফুল নিতে পারে এবং আপনি জানতেও পারবেন না। এই বিষয়ে ইসলামী নিয়ম হলো:
- যদি গাছটি আপনার নিজের জমিতে বা আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে সেটি আপনার সম্পত্তি। কেউ আপনার অনুমতি ছাড়া তা নিলে সে চোর বা গনীমতের (অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাৎকারী) গুনাহগার হবে। আপনি যদি জানতে না পারেন, তাহলে আপনার কোনো গুনাহ নেই।
- তবে আপনি যদি আগে থেকেই জানেন যে, এই গাছ থেকে লোকজন ফুল নিয়ে পূজা করছে এবং আপনি তা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েও প্রতিরোধ না করেন, তাহলে আপনি গুনাহের অংশীদার হবেন। তাই আপনি যদি মনে করেন, রাস্তার পাশের গাছটি থেকে ফুল নিয়ে পূজা হওয়ার আশঙ্কা প্রবল, তাহলে আপনার কর্তব্য হলো: ১. গাছটি কেটে ফেলা (যদি এটি আপনার নিজের হয় এবং আপনি চান) অথবা ২. গাছটি অন্য জায়গায় প্রতিস্থাপন করা অথবা ৩. এমন ব্যবস্থা করা যাতে কেউ ফুল তুলতে না পারে (যেমন: কাঁটাতারের বেড়া)।
আপনি যে প্রশ্নে বলেছেন, "গুনাহ্ হলে কেটে দিবো ওই গাছ" — হ্যাঁ, যদি আপনি নিশ্চিত হন যে, এই গাছের ফুল পূজায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আপনি তা প্রতিরোধ করতে পারছেন না, তাহলে গাছটি কেটে ফেলা বা ধ্বংস করা আপনার জন্য জায়েজ (অনুমোদিত) হবে। কেননা, ফিতনা (গুনাহের মাধ্যম) দূর করা ওয়াজিব। তবে মনে রাখবেন, গাছ কাটা সাধারণত নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কিন্তু এখানে গুনাহের মাধ্যম হওয়ার কারণে এটি জায়েজ হয়ে যাবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর নীতি: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, "যদি কোনো মুসলিমের সম্পদ দ্বারা অমুসলিমের গুনাহের কাজ সম্পাদিত হয় এবং মুসলিম তা জানতে পেরে প্রতিরোধে সক্ষম হয়, তাহলে তার জন্য তা প্রতিরোধ করা ওয়াজিব। প্রতিরোধের একমাত্র উপায় যদি সম্পদটি ধ্বংস করা হয়, তাহলে তা ধ্বংস করা জায়েজ।" (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ১৩৩)
সংক্ষিপ্ত উত্তর ও করণীয়
১. আগের দিনগুলোর গুনাহ: আপনার অজান্তে হওয়ায় আপনার কোনো গুনাহ হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল। ২. বর্তমান অবস্থা: যেহেতু আপনি জানতে পেরেছেন, তাই এখন নিষেধ করা আপনার উপর ওয়াজিব। নিষেধ করার পরও যদি কেউ নেয়, তাহলে তার পাপ তার নিজের, আপনার নয়। ৩. রাস্তার পাশের গাছ: আপনি যদি মনে করেন এটি থেকে ফুল নিয়ে পূজা হচ্ছে এবং আপনি প্রতিরোধ করতে পারছেন না, তাহলে গাছটি কেটে ফেলা বা অন্যত্র সরিয়ে ফেলা আপনার জন্য জায়েজ এবং গুনাহ থেকে বাঁচার উপায়।
আপনার জন্য দোয়া: আল্লাহ তাআলা আপনাকে এই ফিতনা থেকে হিফাজত করুন এবং আপনার এই সতর্কতা ও দ্বীনদারির জন্য উত্তম প্রতিদান দিন। আমিন।
উত্তর প্রদানে: দারুল ইফতা, জামিয়া রহমানিয়া, ঢাকা।