পর্দানশীন মেয়ে বিয়ে করতে মায়ের মত নেই- এখন করণীয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার পরিবার সাধারণ মুসলিম পরিবার। পর্দা কঠোরভাবে পালিত হয় না। আমি ছেলে। আমার বিয়ের জন্য মাহরাম/গায়রে মাহরাম মেনে চলে এরকম দেখে আমি নিজেই মেয়ে খুজেছিলাম। আমি বিয়ের উদ্দেশ্য ইতিমধ্যে তিনজন পর্দানশীন পাত্রী দেখেছি, আম্মাকে দেখিয়েছি। এরা সকলেই আমার খোজা এবং আমার পছন্দও। কিন্তু আম্মার কোনোটিই পছন্দ হয়নি। তাকে পর্দার কন্সেপ্ট টা বহুবার চেষ্টা করেও সঠিকভাবে বুঝাতে ব্যর্থ হই। প্রতিবারই তিনি পাত্রীর অভিভাবকদের সাথে কথা বলে পাত্রীর ছবি তুলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে পরিপূর্ণ পর্দা করে এমন মেয়ে বিয়ে করতে আমি আমার মায়ের সম্মতি পাবো না। উপরন্তু তিনি আমার উপর অসন্তুষ্ট হবেন, বউয়ের জন্য পরিপূর্ণ পর্দার ব্যবস্থা করতেও হয়ত কষ্ট হবে। আম্মা চাচ্ছেন আমাদের গ্রামের মেয়ে বিয়ে করাতে যে সাধারণ শালীনতা বজায় রেখে চলবে। তবে পর্দা করবে না। এখন আমি কি করতে পারি? আমাকে মায়ের সন্তুষ্টি আর পর্দানশীন স্ত্রীর মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে। আমার জন্য এছাড়া কোনো মিডলগ্রাউন্ড নেই।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সহানুভূতি প্রকাশ করছি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা ধর্মীয় ও পারিবারিক উভয় দিক থেকেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মূল নীতি:
১. পিতা-মাতার আনুগত্য ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন করে নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানিতে সৃষ্টজীবের আনুগত্য নেই।" (সহীহ মুসলিম)
২. দ্বীনদার পাত্রী বেছে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "মহিলাকে চারটি বিষয়ের জন্য বিবাহ করা হয়: সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য এবং দ্বীনদারিতা। তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও, তবেই তুমি সফল হবে।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং অন্যান্য হানাফি ইমামগণ দ্বীনদার পাত্রী নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) তে উল্লেখ আছে যে, বিবাহের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আপনার করণীয়:
১. মায়ের সাথে সম্মানের সাথে কথা বলুন - তাকে বোঝান যে পর্দা ইসলামের একটি মৌলিক বিধান এবং দ্বীনদার পাত্রী বেছে নেওয়া আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী দ্বীনদার পাত্রীই উত্তম।
২. মধ্যপন্থা অবলম্বন করুন - আপনি চেষ্টা করুন মাকে বোঝাতে যে, পর্দানশীন পাত্রী মানে তিনি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন না, বরং তিনি একজন সৎ ও চরিত্রবান নারী হবেন।
৩. বিবাহের পর পর্দার ব্যবস্থা - আপনি নিজে চেষ্টা করুন আপনার স্ত্রীর জন্য পর্দার ব্যবস্থা করার। এটি আপনার দায়িত্ব এবং আপনি এটি পালন করবেন বলে মাকে আশ্বস্ত করুন।
৪. ইস্তেখারা করুন - আল্লাহর কাছে ইস্তেখারা করুন এবং নির্দেশনা প্রার্থনা করুন।
গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা:
-
মায়ের অসন্তুষ্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু আল্লাহর বিধান পালন আরও গুরুত্বপূর্ণ। যদি মা এমন কিছু চান যা শরীয়তের পরিপন্থী, তবে সেক্ষেত্রে আল্লাহর আনুগত্য প্রাধান্য পাবে।
-
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তার রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, পিতা-মাতার আনুগত্য ওয়াজিব, কিন্তু তা এমন বিষয়ে যা শরীয়তসম্মত।
আপনার জন্য পরামর্শ:
১. আপনি যে তিনজন পর্দানশীন পাত্রী দেখেছেন, তাদের মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করুন। ২. মায়ের সাথে ধৈর্য ধরে আলোচনা করুন এবং তাকে বোঝান যে পর্দানশীন স্ত্রী আপনার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ৩. প্রয়োজনে একজন আলেম বা বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে মধ্যস্থতা করতে বলুন। ৪. মনে রাখবেন, স্ত্রী নির্বাচন একটি ব্যক্তিগত বিষয় এবং ইসলাম আপনাকে দ্বীনদার পাত্রী বেছে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
ইমাম তিরমিজি (রহ.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "দুনিয়া হলো সামগ্রী, আর দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সামগ্রী হলো সৎকর্মপরায়ণ স্ত্রী।" (সহীহ মুসলিম)
আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফিক দান করুন এবং আপনার মায়ের হৃদয়কে নরম করুন। আমিন।