কারণে অকারণে স্ত্রীর সাথে ঝগড়া এবং একপর্যায়ে তালাকের হুমকি দিয়েছি,- এত্থেকে বাচার উপায় কি?
Family Life · Hanafi
Question
আমাদের বিয়ের প্রায় ২ বছর হতে চলেছে। আমি একজন চাকুরীপ্রার্থী। চাকুরীর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। আর আমার স্ত্রী তার দাওরা সম্পন্ন করেছেন।বর্তমানে তিনি জেনারেল লাইনে পড়াশোনা করছেন। আমার এবং আমার স্ত্রীর মধ্যে কিছুদিন পরপরই বিভিন্ন বিষয়ে ঝামেলা দেখা যাচ্ছে। আবার তা কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু এভাবে আমাদের মধ্যে বেশ কয়েকবার সমস্যা হয়েছে এবং কিছুদিন পূর্বে পরিস্থিতি বেশ খারাপের পর্যায়ে চলে যায় এবং এক পর্যায়ে আমি তালাকের হুমকি দিয়ে বসি।আমাদের উভয় পরিবারের লোকজনই আমাদেরকে নিয়ে বেশ চিন্তিত। এবং আমিও আমার নিজেকে নিয়ে চিন্তিত। কারণ দেখা যায় আমিই আমার স্ত্রীর বিভিন্ন বিষয়ে ধৈর্য হারিয়ে ফেলি। এমতাবস্থায় আমার করণীয় কী হবে?? আমি চাচ্ছি এরকম ঝামেলা যেন আর না হয়।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, প্রথমেই আপনাকে জানিয়ে রাখি, দাম্পত্য জীবনে ছোটখাটো মতানৈক্য ও ঝামেলা একটি স্বাভাবিক বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনেও এর নজির রয়েছে। তবে সমস্যা হলো, যখন তা নিয়মিত রূপ নেয় এবং তালাকের হুমকির পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তা গুরুতর। আপনি যে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধৈর্য হারানোর মূল কারণ আপনি নিজেই—এটি আপনার আত্মসচেতনতার পরিচয় এবং সমাধানের প্রথম ধাপ। আল্লাহ তাআলা আপনাকে হিদায়াত দান করুন।
আপনার প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামি নির্দেশনা ও করণীয় নিম্নরূপ:
১. তালাকের হুমকির শারঈ বিধান
সর্বপ্রথম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে রাখা দরকার। আপনি লিখেছেন, "এক পর্যায়ে আমি তালাকের হুমকি দিয়ে বসি।" শুধু হুমকি দেওয়া এবং প্রকৃত তালাক দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে সতর্কতার জন্য জেনে রাখুন, হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, যদি কেউ রাগের মাথায় স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দ উচ্চারণ করে ফেলে, তবে তা একটি তালাকে বায়িন (অপারিবর্তনীয় তালাক) হয়ে যায়, যদিও উদ্দেশ্য শুধু ভয় দেখানো হয়। কিন্তু যদি কেউ বলে, "আমি তালাক দেব" বা "তালাকের হুমকি দিচ্ছি" (ভবিষ্যতের কথা উল্লেখ করে), তবে তা তালাক গণ্য হয় না, যতক্ষণ না প্রকৃতপক্ষে তালাক দেওয়া হয়।
সতর্কতা: আপনি যদি শুধু "তালাক দেব" বা "তালাকের হুমকি" এই ধরনের কথা বলে থাকেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ আপনার তালাক হয়নি। কিন্তু ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা অপরিহার্য। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তালাক এমন একটি বৈধ কাজ, যা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত। (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮) রাগের মাথায় উচ্চারিত তালাকও হানাফি মাযহাব মতে কার্যকরী হয়ে যায়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৩০)
২. ধৈর্য ও সহনশীলতা অর্জন
আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, আপনি ধৈর্য হারান। ইসলাম ধৈর্যকে ঈমানের অর্ধেক বলেছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
"আর তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই সালাত কঠিন, কিন্তু বিনয়ীদের জন্য নয়।" (সূরা আল-বাকারা: ৪৫)
দাম্পত্য জীবনে ধৈর্য ধারণের অসংখ্য ফজিলত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি স্ত্রীর খারাপ আচরণে ধৈর্য ধারণ করবে, আল্লাহ তাকে ধৈর্যের বিনিময়ে জান্নাত দান করবেন।" (মুসনাদে বাযযার)
ব্যবহারিক পদক্ষেপ: যখনই রাগ চলে আসবে, তখন:
- আউযুবিল্লাহ পড়ুন এবং চুপ থাকুন। রাসূল (সা.) বলেছেন, "তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে সে যেন চুপ থাকে।" (মুসনাদে আহমাদ)
- ওযু করে নিন। কেননা, রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে এবং পানি তা নিভিয়ে দেয়। (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮৪)
- ঘর থেকে বের হয়ে যান অথবা স্থান পরিবর্তন করুন। (সহিহ বুখারি: ৬১১৪)
৩. স্ত্রীর সাথে উত্তম ব্যবহার
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
"আর তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)
আপনার স্ত্রী দাওরা সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে জেনারেল লাইনে পড়াশোনা করছেন। এটি একটি মহৎ কাজ। তাকে উৎসাহিত করুন, তার পড়াশোনার সময়টুকু সম্মান করুন। তার সাথে কোমল ভাষায় কথা বলুন। মনে রাখবেন, নবী করিম (সা.) কখনো তার স্ত্রীদের সাথে রূঢ় আচরণ করেননি।
৪. পারস্পরিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগ
ঝামেলার মূল কারণ প্রায়শই ভুল বোঝাবুঝি ও যোগাযোগের অভাব। তাই:
- প্রতিদিন কিছু সময় একান্তে বসে কথা বলুন।
- একে অপরের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, শুধু নিজের কথা বলবেন না।
- সমস্যা থাকলে তা নিয়ে শান্তভাবে আলোচনা করুন, রাগের মাথায় নয়।
- একে অপরের দোষ খোঁজার বদলে সমাধানের চেষ্টা করুন।
৫. পরিবারের ভূমিকা
আপনারা উভয় পরিবারের লোকজনই চিন্তিত। এটি একটি ইতিবাচক দিক। প্রয়োজনে উভয় পরিবারের কোনো বিজ্ঞ ও পরিণত বয়স্ক ব্যক্তিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিয়োগ করুন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
"আর যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক নিয়োগ কর। তারা উভয়ে যদি সংশোধন করতে চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলিয়ে দেবেন।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
৬. তালাকের চিন্তা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করুন
তালাক আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল কাজ। এটি সর্বশেষ সমাধান, যখন আর কোনো পথ খোলা না থাকে। আপনার ক্ষেত্রে এখনো তা নয়। তাই মনে থেকে তালাকের চিন্তা সম্পূর্ণ বাদ দিন। রাসূল (সা.) বলেছেন:
"তালাক দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারে শয়তান সবচেয়ে বেশি খুশি হয়।" (সুনানে আবু দাউদ)
৭. দোয়া ও ইস্তিগফার
সর্বোপরি, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। নবী করিম (সা.)-এর শেখানো দোয়া পড়ুন:
"اللهم أصلح لي ديني الذي هو عصمة أمري، وأصلح لي دنياي التي فيها معاشي، وأصلح لي آخرتي التي فيها معادي، واجعل الحياة زيادة لي في كل خير، واجعل الموت راحة لي من كل شر" (উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আসলিহলি দীনিয়াল্লাযি হুয়া ইসমাতু আমরি, ওয়া আসলিহলি দুনইয়ায়াল্লাতি ফিহা মাআশি, ওয়া আসলিহলি আখিরাতিল্লাতি ফিহা মাআদি, ওয়াজআলিল হায়াতা জিয়াদাতাল লি ফি কুল্লি খাইর, ওয়াজআলিল মাওতা রাহাতাল লি মিন কুল্লি শারর।) (অর্থ: হে আল্লাহ! আমার দীনকে সংশোধন করে দিন, যা আমার কাজের রক্ষাকবচ। আমার দুনিয়াকে সংশোধন করে দিন, যেখানে আমার জীবিকা। আমার আখিরাতকে সংশোধন করে দিন, যেখানে আমার প্রত্যাবর্তন। জীবনকে আমার জন্য প্রতিটি কল্যাণে বৃদ্ধি করুন এবং মৃত্যুকে আমার জন্য প্রতিটি অনিষ্ট থেকে বিশ্রাম করুন।) (সহিহ মুসলিম: ২৭২০)
৮. চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যান
আপনি চাকরিপ্রার্থী। চাকরির জন্য চেষ্টা করা একটি ইবাদত। চাকরি না থাকার কারণে মানসিক চাপ বাড়তে পারে, যা দাম্পত্য সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। তাই চেষ্টা চালিয়ে যান এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। আল্লাহ বলেন:
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
সংক্ষিপ্ত করণীয়: ১. তালাকের হুমকি বা এ ধরনের কথা চিরতরে বর্জন করুন। ২. রাগ নিয়ন্ত্রণে ধৈর্য, ওযু ও স্থান পরিবর্তনের কৌশল অবলম্বন করুন। ৩. স্ত্রীর সাথে নিয়মিত শান্তিপূর্ণ আলোচনা করুন। ৪. প্রয়োজনে উভয় পরিবারের বিজ্ঞ ব্যক্তিকে মধ্যস্থতাকারী করুন। ৫. স্ত্রীর পড়াশোনায় উৎসাহ দিন এবং তার সাথে সদ্ব্যবহার করুন। ৬. নিয়মিত দোয়া ও ইস্তিগফার করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার দাম্পত্য জীবনকে সুখময় করুন এবং আপনাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সূরা আন-নিসা: ১৯, ৩৫
- সূরা আল-বাকারা: ৪৫
- সূরা আত-তালাক: ২-৩
- সহিহ বুখারি: ৬১১৪
- সহিহ মুসলিম: ২৭২০
- সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮, ৪৭৮৪
- সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫
- রদ্দুল মুহতার: ৩/২৩০