কবরস্থান ও খোঁড়া কবর, লাল রঙের হিজাব ও পর্দায় ঘাটতি ইত্যাদি স্বপ্নে দেখার ব্যাখ্যা কি?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 3673
Questioner: Nahida Nodi
Question Asked: 08 Aug 2026, 01:49 PM
Reviewed & Published: 08 Aug 2026, 02:04 PM
Views: 10
Tokens: 10,227
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকা তুহ।

আমার কয়েকদিন হলে ভীষণ ভয় করে মৃত্যু কথা মনে হলে। কবরের জীবন ইত্যাদি দিয়ে ভাবলে অনেক ভয় করে কান্না পায়।

এরআগের একদিন কবরকে ঘিরে সপ্ন দেখেছি।
আজকে খুব ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়েছি আর খুব অদ্ভুত একটা একটা সপ্ন দেখেছি।
আমি কোনো একটা কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। সেখানে তেমন জঙ্গল নেই, মোটামুটি পরিস্কার একটা কবরস্থান। আমি দেখেই ভয় পেয়ে গিয়েছি। আমার সাথে খুব পরিচিত দু'জন ছিল।
আমি পর্দা মেইনটেইন করে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি এখন যথেষ্ট সতর্ক ও সিরিয়াস থাকি সবসময়। হাতমোজা, পা মোজা ছাড়া বের হই না কোথাও।
তো সপ্নেও আমি দেখলাম আমি লাল রঙের একটা সুতি হিজাব পড়ে আছি। আর হিজাবের নিচে স্কার্ট মতো পড়েছি। এবং সেটা বোরকার মতোই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু হাতমোজা, পা মোজা কেন যে পড়িনি আর এ অবস্থাতেই আমি বেড়িয়েছি। আর লাল রঙ আমার খুব অপছন্দ সেখানে লাল রঙেরই হিজাব কেন পড়লাম এটা ভাবার বিষয়।
এরপর কবরের পাশ দিয়ে যেতেই একটা কবর দেখলাম খুব সুন্দর করে খোঁড়া আছে কিন্তু কাউকে মাটি দেওয়া হয়নি। আমি মুফতি সাহেবের কাছে গিয়েছি আমার তিন পরিচিত বান্ধবীকে নিয়ে। এমনকি এইরকম হিজাব পড়া অবস্থাতেই গিয়েছি। আর আমার মধ্যে কোনো অনুশোচনাও নেই।
এরপর আমি উনাকে জিজ্ঞেস করায় উনি সম্ভবত এমনটা বললেন, ঐ কবরটা ফাঁকা ওখানে গৃহপালিত পশু কবর দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু দেওয়া হয়নি। তাই ফাঁকা। এমনটা ই বললেন সম্ভবত।

এরপর আমার আরেকটা সঙ্গী যিনি ছিলেন উনি ব্যক্তিগত জীবনেও পর্দা, সলাহ পড়েন না। তো আমার ঐ বান্ধবী একটু বাহিরে যাওয়ায় মুফতি সাহেব বললেন উনি যেন উনার সতরটা ভালোভাবে ঢিকে বের হন। আরও কি কি জানি নসীহা করলেন।
আবার একটা বিষয়, আমরা যখন কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, কবর থেকে উঠে ভয়ংকরভাবে অনেক বাচ্চা আমাদের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে ছিল। যেটাতে অনেক ভয় পেয়েছি।

গতকালকেও একটা সপ্ন দেখেছিলাম। আমি দাওয়াতি কাজের জন্য আমার কাছে হিন্দুবোনদের বাড়িতে নিয়ে এসেছি। তাদের বিনয়ের সাথে দাওয়াত দিচ্ছি এরপর তারা এতো রেগে গেল যে আমাকে ব্লাকম্যাজিক করবে এমন মনোভাব রাগ নিয়ে বের হয়ে গেল। তাদের একটা বাচ্চা থেকে গেল আর আমার একটা পরিহিত কাপড় নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল তখন আমি ওকে খুব কষ্টে আটকিয়ে। এবং আটকাতে যেয়ে সম্ভবত বাচ্চা ছেলেটি আহতও হয়েছিল।

আমি নরমালি সকাল, সন্ধ্যার হেফাজতের আমল করি। আবার ঘুমানোর সময়ও দু'আ পড়ে ঘুমাই। তাহলে এমনটা কেন হচ্ছে বুঝতেছিনা। আল্লাহ কি আমাকে কোনো সাইন দিচ্ছেন? নাকি শয়তানের পক্ষ থেকে। তা-ও বুঝতেছিনা।
আমি তো দু'আ পড়ে ঘুমাই, তাহলে শয়তানের পক্ষ থেকে হবে কেন এটাও বুঝতেছিনা। দয়া করে এর ব্যাখ্যা জানাবেন সম্মানিত মুফতি সাহেব।

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার মনে যে ভয় ও দুশ্চিন্তা তৈরি হচ্ছে, এটি খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। মৃত্যু ও কবরের জীবন নিয়ে চিন্তা করা এবং ভয় পাওয়া মুমিনের ঈমানের পরিচয়। তবে এই ভয় যেন আপনাকে হতাশ না করে, বরং আমলের প্রতি আরও যত্নবান করে তোলে।

আপনার স্বপ্নগুলো নিয়ে বিস্তারিত বলার আগে একটি মূল বিষয় জেনে রাখা জরুরি:

স্বপ্নের ব্যাখ্যা (Ta'bir) সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা:

ইসলামী পরিভাষায় স্বপ্ন তিন প্রকার: ১. সত্য স্বপ্ন (রুইয়া): এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে এবং এটি সুসংবাদ বহন করে। ২. শয়তানের পক্ষ থেকে (আহলাম): এটি শয়তানের প্ররোচনা, যা মানুষকে ভয় দেখাতে বা দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায়। ৩. মনের চিন্তা-ভাবনা (হাদিসুন নাফস): যা সারাদিনের চিন্তা বা কাজের কারণে মনে উদয় হয়।

আপনি যখন সারাদিন মৃত্যু, কবর এবং পর্দা নিয়ে ভাবছেন, তখন আপনার স্বপ্নে এসব বিষয় আসাটা খুবই স্বাভাবিক। এটি মূলত আপনার মনের চিন্তার প্রতিফলন (হাদিসুন নাফস) হতে পারে। শয়তান আপনার এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে আপনাকে আরও অস্থির করার চেষ্টা করছে। আপনি দু'আ পড়ে ঘুমান, এটি খুবই ভালো কাজ। এর ফলে শয়তানের পক্ষ থেকে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে শয়তান মানুষের মনে ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) দেওয়ার চেষ্টা করে, যাতে মানুষ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়।

আপনার স্বপ্নগুলোর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা:

১. কবরস্থান ও খোঁড়া কবর: কবরস্থান এবং খালি কবর দেখা সাধারণত মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি আপনার মনে জাগ্রত অবস্থায় মৃত্যু ও কবর নিয়ে চিন্তারই প্রতিফলন। এটি কোনো অশুভ লক্ষণ নয়, বরং এটি আপনার জন্য একটি নসীহত (উপদেশ) যে, মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। খালি কবরটি সম্ভবত আপনার সামনে মৃত্যুর বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে।

২. লাল রঙের হিজাব ও পর্দার ঘাটতি: স্বপ্নে নিজেকে পর্দাহীন বা অপছন্দের পোশাকে দেখা আপনার মনে একটি গভীর চিন্তার ইঙ্গিত দেয়। আপনি পর্দা নিয়ে খুব সিরিয়াস, তাই স্বপ্নে নিজের কোনো ত্রুটি দেখলে মন খারাপ হয়। এটি শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে, যাতে আপনাকে পর্দার ব্যাপারে হতাশ বা দুর্বল করে তোলে। অথবা এটি আপনার অন্তরের একটি সতর্কতা যে, পর্দার ক্ষেত্রে আরও যত্নবান হতে হবে। তবে মনে রাখবেন, স্বপ্নের এই দৃশ্যটি আপনার বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন নয়, বরং এটি একটি পরীক্ষা বা সতর্কবার্তা।

৩. মুফতি সাহেবের নসীহত: স্বপ্নে আলেম বা মুফতি সাহেবকে দেখা এবং তাদের কাছ থেকে উপদেশ পাওয়া একটি ভালো লক্ষণ। এটি আপনার জন্য দ্বীনের পথে থাকার এবং আরও ভালো আমল করার ইঙ্গিত। আপনার বান্ধবীকে পর্দা করার নসীহত করা হয়েছিল, এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আপনার মাধ্যমে অন্যকেও ভালো কাজের দিকে আহ্বান করার চেষ্টা চলছে।

৪. কবর থেকে বাচ্চাদের তাকিয়ে থাকা: এটি একটি ভয়ের দৃশ্য, যা শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে। শয়তান মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য এমন দৃশ্য দেখায়। যেহেতু আপনি দু'আ পড়ে ঘুমিয়েছেন, তাই এটি আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এটি শুধু একটি ভয়ের অনুভূতি তৈরি করেছে।

৫. দাওয়াতের স্বপ্ন ও হিন্দু পরিবারের রাগ: এটি আপনার দাওয়াতি কাজের প্রতি আগ্রহ এবং এর সাথে জড়িত চিন্তার প্রতিফলন। দাওয়াতের কাজে বাধা আসা বা মানুষের রাগ দেখা একটি সাধারণ বিষয়। স্বপ্নে বাচ্চাটিকে আটকানো এবং আহত হওয়া আপনার মনে দাওয়াতের কাজ নিয়ে দুশ্চিন্তার ইঙ্গিত দেয়। এটি কোনো অশুভ লক্ষণ নয়।

আপনার করণীয়:

১. ভয় দূর করুন: মৃত্যু ও কবরের ভয় প্রতিটি মুমিনের থাকে। এই ভয়কে ইতিবাচক কাজে লাগান। বেশি বেশি নেক আমল করুন, তওবা-ইস্তিগফার করুন। মনে রাখবেন, আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত দয়ালু। যারা তাঁর ওপর ভরসা করে, তিনি তাদের রক্ষা করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: "যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আমি তাদের পাপগুলো অবশ্যই মোচন করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের উৎকৃষ্ট প্রতিদান দেব।" (সূরা আনকাবুত: ৭)

২. স্বপ্নকে গুরুত্ব না দেওয়া: ইসলামী নির্দেশনা হলো, যে স্বপ্ন ভয় দেখায় বা দুশ্চিন্তা তৈরি করে, তা শয়তানের পক্ষ থেকে। তাই এমন স্বপ্ন দেখলে ডান দিকে থুথু ফেলে (হালকা) এবং "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ে ঘুমের অবস্থান পরিবর্তন করুন। এই স্বপ্ন নিয়ে কারো কাছে বিস্তারিত বলবেন না এবং এটাকে গুরুত্ব দেবেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। সুতরাং তোমাদের কেউ যদি অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, তবে সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে এবং শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়।" (সহিহ বুখারি: ৬৯৮৪)

৩. আমল চালিয়ে যান: আপনি সকাল-সন্ধ্যার হেফাজতের আমল এবং ঘুমানোর আগের দু'আগুলো পড়েন, এটি খুবই উত্তম। এই আমলগুলো নিয়মিত চালিয়ে যান। এর সাথে আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে ঘুমান। এতে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে।

৪. দাওয়াতি কাজে ধৈর্য ধরুন: দাওয়াতের কাজে মানুষের রাগ বা বিরোধিতা স্বাভাবিক। এতে হতাশ হবেন না। ধৈর্য ও হিকমতের সাথে দাওয়াত চালিয়ে যান। আল্লাহর কাজে বাধা আসবেই, তবে ফলাফল আল্লাহর হাতে।

৫. মৃত্যু ও কবরের চিন্তা: মৃত্যু ও কবরের চিন্তা করা ভালো, তবে তা যেন আতঙ্কের কারণ না হয়। বেশি বেশি এই দোয়াটি পড়ুন: "আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আউযুবিকা মিনান্নার।" (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই।) মৃত্যুকে স্মরণ করা মুমিনের জন্য একটি বড় উপদেশ, যা তাকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে।

সারসংক্ষেপ:

আপনার স্বপ্নগুলো মূলত আপনার মনের চিন্তা ও শয়তানের প্ররোচনার ফল। এটি কোনো অশুভ লক্ষণ নয়। আল্লাহ আপনাকে কোনো "সাইন" দিচ্ছেন না, বরং এটি আপনার ঈমানী দুর্বলতার কারণে শয়তানের একটি কুমন্ত্রণা। আপনি দ্বীনের পথে আছেন, পর্দা মেনে চলছেন, আমল করছেন—এসব খুবই ভালো। এই আমলগুলো ধরে রাখুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। ভয় পেলে বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দরূদ শরীফ পড়ুন। আশা করি, আল্লাহ আপনাকে এই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেবেন এবং আপনার ঈমান আরও মজবুত করবেন। (আমিন)

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.