অন্যের হক গ্রহণ এবং ফেরত দেওয়া সম্পর্কে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
. প্রশ্ন ১ঃ একজন ভাই আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে একজন হিন্দুর দোকান থেকে কিছু বাকি খেয়েছিল। টাকার পরিমাণ ১০০০ টাকার মধ্যে হবে। যে দোকান থেকে বাকি খেয়েছিল; দোকানের মালিকেরা তারা এখন আর বাংলাদেশে থাকে না সবাই ভারতে চলে গেছে। এখন যে ভাই বাকি খেয়েছিল; তার কাছে মনে হচ্ছে যে টাকাটা আমার ফেরত দেওয়া দরকার। কিন্তু দোকানদাররা তো বাংলাদেশে থাকেন না তাহলে এখন ওই টাকাটা সে কিভাবে দিবে বা তার এখন করণীয় কি?
প্রশ্ন ২ঃ একজন মুসলিম ভাই যার কোন ছেলে সন্তান নেই; দুইটা মেয়ে সন্তান আছে। সে কিছুটা অসুস্থ হাওয়ায় একজন ব্যক্তি তাকে পরামর্শ দিছে যে, তোমার যেহেতু ছেলে সন্তান নেই; তাহলে তোমার জমির একটা অংশ স্ত্রীর নামে লিখে দাও, কারন তোমার কখন কি হয়ে যায়!
সে অসুস্থ হওয়ায় তার জমির কিছু অংশ তার স্ত্রীর নামে দিছে, সম্পূর্ণটা না।
এখন তার মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করতেছে যে, যেহেতু আমি মারা যাওয়ার পর আমার সম্পদের ভাগীদার আমার ভাতিজারাও হতো; তো আমার স্ত্রীর নামে আমি কিছু সম্পদ দিয়ে অপরাধ করলাম কিনা!
এরকম পরিস্থিতিতে নিজের সম্পদের কিছু অংশ স্ত্রীর নামে দেয়া কি অপরাধ?
Answer
প্রশ্ন ১ ও ২ এর উত্তর
প্রশ্ন ১: অন্যের হক গ্রহণ এবং ফেরত দেওয়া সম্পর্কে
উত্তর
মূলনীতি: ইসলামে অন্যের হক আত্মসাৎ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং গুনাহের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানতসমূহ তার মালিকের কাছে পৌঁছে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
১. ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা: যে ব্যক্তি অন্যের কাছ থেকে বাকি খেয়েছে, তার উপর তা পরিশোধ করা ফরজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ "সচ্ছল ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা জুলুম।" (সহীহ বুখারী: ২৪০০)
২. মালিক খুঁজে না পাওয়া গেলে করণীয়: যেহেতু দোকানদাররা বাংলাদেশে নেই এবং ভারতে চলে গেছে, তাই তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা উচিত। যদি তাদের সন্ধান পাওয়া না যায়, তাহলে:
- প্রথম পদক্ষেপ: যথাসাধ্য চেষ্টা করা তাদের ঠিকানা বা যোগাযোগের উপায় খুঁজে বের করার।
- দ্বিতীয় পদক্ষেপ: যদি সত্যিই তাদের খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে সেই টাকা তাদের পক্ষ থেকে সদকা করে দেওয়া। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, যদি ঋণের মালিককে খুঁজে পাওয়া না যায় এবং তার সম্পর্কে কোনো আশা না থাকে, তাহলে তার পক্ষ থেকে সদকা করা জায়েয। (বাদায়েউস সানায়ে: ৭/১৭০)
৩. ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
إذا تعذر الوصول إلى صاحب الحق وتصدق به عنه جاز "যখন হকের মালিকের কাছে পৌঁছানো অসম্ভব হয়, তখন তার পক্ষ থেকে সদকা করা জায়েয।" (রদ্দুল মুহতার: ৫/১২০)
৪. মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর মত: তিনি বলেন, ঋণদাতাকে খুঁজে না পাওয়া গেলে এবং তার সম্পর্কে কোনো খোঁজ না মিললে, সেই টাকা তার পক্ষ থেকে সদকা করে দেওয়া উচিত। তবে পরবর্তীতে যদি মালিক পাওয়া যায়, তাহলে তাকে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে তার টাকা সদকা করা হয়েছে; সে চাইলে তা মেনে নিতে পারে অথবা সদকার সওয়াব নিতে পারে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৩/৩৯০)
৫. মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম)-এর মত: তিনি বলেন, ঋণদাতার সন্ধান না পাওয়া গেলে এবং তার সম্পর্কে কোনো আশা না থাকলে, তার পক্ষ থেকে সদকা করা জায়েয। তবে সদকা করার পূর্বে যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত। (ফিকহুল বুয়ূ: ২/৫৪৫)
সারকথা: যেহেতু দোকানদাররা ভারতে চলে গেছে, তাই প্রথমে তাদের খোঁজ করার চেষ্টা করুন। যদি সত্যিই তাদের খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে সেই ১০০০ টাকা তাদের পক্ষ থেকে সদকা করে দিন। সদকা করার সময় নিয়ত করুন যে, এটি অমুকের পক্ষ থেকে সদকা। যদি পরবর্তীতে মালিক পাওয়া যায়, তাহলে তাকে জানিয়ে দেবেন।
প্রশ্ন ২: স্ত্রীর নামে সম্পদ দান করা সম্পর্কে
উত্তর
মূলনীতি: নিজের সম্পদ থেকে স্ত্রীকে দান করা বা হেবা করা জায়েয। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও স্ত্রীদেরকে উপহার দিতেন এবং সাহাবায়ে কেরামও স্ত্রীদের নামে সম্পদ লিখে দিতেন।
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
১. স্ত্রীকে দান করা জায়েয: ইসলামে স্বামীর জন্য স্ত্রীকে দান-উপহার করা সম্পূর্ণ জায়েয এবং উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً "আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহরানা আদায় করে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৪)
২. অসুস্থ অবস্থায় দান করার বিধান: প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় স্ত্রীর নামে জমির কিছু অংশ লিখে দিয়েছেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:
- যদি অসুস্থতা মারাত্মক হয় (যে রোগে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে), তাহলে তা "মরীজুল মাওত" (মৃত্যুপথযাত্রী রোগী) হিসেবে গণ্য হবে।
- মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর দান-হেবা সম্পর্কে হানাফী ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা আছে।
৩. মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর দানের বিধান: ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, মৃত্যুপথযাত্রী রোগী যদি তার সম্পদের ১/৩ অংশের বেশি দান করে, তাহলে তা ওয়ারিসদের অনুমতি ছাড়া কার্যকর হবে না। তবে ১/৩ অংশের মধ্যে দান করলে তা কার্যকর হবে। (আল-হিদায়া: ৪/৪৫০)
৪. ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত: তাঁদের মতে, মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর দান সম্পূর্ণ সম্পদ থেকে কার্যকর হবে যদি তা ১/৩ অংশের মধ্যে হয়; এর বেশি হলে ওয়ারিসদের অনুমতি প্রয়োজন। (রদ্দুল মুহতার: ৬/৭৮০)
৫. স্ত্রী ওয়ারিস হওয়ার কারণে: স্ত্রী স্বামীর সম্পদের ওয়ারিস। তাই মৃত্যুপথযাত্রী অবস্থায় স্ত্রীকে দান করলে তা অন্যান্য ওয়ারিসদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
لو تصدق المريض لوارثه لا يجوز عند أبي حنيفة "মৃত্যুপথযাত্রী রোগী যদি তার ওয়ারিসকে দান করে, তবে তা আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে জায়েয নয়।" (রদ্দুল মুহতার: ৬/৭৮৫)
৬. তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তি "সম্পূর্ণটা না দিয়ে কিছু অংশ" দিয়েছেন। যদি তা তার সম্পদের ১/৩ অংশের মধ্যে হয় এবং তিনি সত্যিই মৃত্যুপথযাত্রী রোগী না হন (অর্থাৎ সাধারণ অসুস্থতা), তাহলে তা জায়েয। কিন্তু যদি তিনি মৃত্যুপথযাত্রী রোগী হন এবং স্ত্রীকে দান করেন, তাহলে তা অন্যান্য ওয়ারিসদের (যেমন: ভাতিজা) অনুমতি ছাড়া কার্যকর হবে না, কারণ স্ত্রী নিজেও ওয়ারিস।
৭. ভাতিজাদের প্রসঙ্গ: ভাতিজারা চাচার সম্পদের ওয়ারিস তখনই হয়, যখন চাচার নিজের সন্তান (ছেলে বা মেয়ে) না থাকে। কিন্তু এখানে দুইটি মেয়ে সন্তান আছে, তাই ভাতিজারা মূলত ওয়ারিস হবে না। মেয়েরা থাকা অবস্থায় ভাতিজারা ওয়ারিস হয় না। (সূরা আন-নিসা: ১১-১২)
৮. মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর জন্য ওয়ারিসকে দান করা জায়েয নয়, কারণ এতে অন্যান্য ওয়ারিসদের ক্ষতি হয়। তবে যদি তা ১/৩ অংশের মধ্যে হয় এবং অন্যান্য ওয়ারিসরা সম্মতি দেয়, তাহলে জায়েয। (ফিকহুল বুয়ূ: ২/৫৫০)
সারকথা:
- স্ত্রীকে দান করা জায়েয, তবে মৃত্যুপথযাত্রী অবস্থায় ওয়ারিসকে দান করা হানাফী মতে জায়েয নয়।
- যেহেতু ভাতিজারা এখানে ওয়ারিস নয় (মেয়ে সন্তান থাকার কারণে), তাই স্ত্রীকে দান করলে ভাতিজাদের কোনো ক্ষতি হয় না।
- তবে যদি অসুস্থতা মারাত্মক হয় এবং স্ত্রী ওয়ারিস হিসেবে থাকে, তাহলে স্ত্রীকে দান করা অন্যান্য ওয়ারিসদের (মেয়েদের) ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই উত্তম হলো, অসুস্থ অবস্থায় স্ত্রীকে দান না করে সুস্থ অবস্থায় দান করা।
- যদি ইতিমধ্যেই দান করে থাকেন এবং তা ১/৩ অংশের মধ্যে হয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ সমস্যা নেই। তবে ১/৩ অংশের বেশি হলে এবং মৃত্যুপথযাত্রী রোগী হলে, অন্যান্য ওয়ারিসদের সম্মতি নেওয়া প্রয়োজন।
অপরাধবোধ সম্পর্কে: আপনার অপরাধবোধ ঠিক নয়। স্ত্রীকে দান করা অপরাধ নয়। তবে ইসলামী বিধান মেনে চলা জরুরি। যদি দানটি সঠিক নিয়মে হয়ে থাকে, তাহলে কোনো অপরাধ নেই। আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
দলিলসমূহ:
- সূরা আন-নিসা: ৫৮ (আমানত আদায়)
- সহীহ বুখারী: ২৪০০ (ঋণ পরিশোধে বিলম্ব জুলুম)
- আল-হিদায়া: ৪/৪৫০ (মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর দান)
- রদ্দুল মুহতার: ৬/৭৮০-৭৮৫ (ওয়ারিসকে দান)
- বাদায়েউস সানায়ে: ৭/১৭০ (মালিক না পাওয়া গেলে সদকা)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৩/৩৯০ (ঋণ সদকা করা)
- ফিকহুল বুয়ূ: ২/৫৪৫, ৫৫০ (ঋণ ও দানের বিধান)