নামাজে চুল চেক করলে নামাজ ভঙ্গ হবে কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
উস্তাজ আমি আজকে নামাজে দাঁড়ানো থাকা অবস্থায় দুইবার কোনো চুল বের হয়েছে কিনা চেক করেছি। তারপর একবার নাক মুছেছি। এগুলো কি আমলে কাসির হবে? নামাজ দোহরাবো?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা প্রথমে "আমলে কাসির" (অধিক কাজ) এর সংজ্ঞা এবং হানাফি মাযহাবের নিয়মাবলী সম্পর্কে আলোচনা করব।
আমলে কাসির কী?
হানাফি ফিকহের পরিভাষায়, নামাজের মধ্যে এমন কোনো কাজ করা যা নামাজের বাইরের লোক দেখলে মনে করবে যে ব্যক্তি নামাজে নেই, তাকে "আমলে কাসির" বলা হয়। আর যে কাজটি এমন পর্যায়ের নয়, অর্থাৎ নামাজের বাইরের কেউ দেখলে মনে করবে না যে ব্যক্তি নামাজে নেই, তাকে "আমলে কালিল" (অল্প কাজ) বলা হয়।
আল-হিদায়াহ ও রদ্দুল মুহতার-এর বক্তব্য:
আল-হিদায়াহ গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"আমলে কাসির হলো এমন কাজ যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় ব্যক্তি নামাজে নেই। আর আমলে কালিল হলো এমন কাজ যা দেখে নামাজের খেলাফ মনে হয় না।"
(আল-হিদায়াহ, কিতাবুস সালাত)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
"আমলে কাসিরের মানদণ্ড হলো—নামাজরত ব্যক্তির এমন কাজ যা দেখে দূর থেকে দর্শক মনে করবে যে সে নামাজে নেই। আর এর চেয়ে কম হলে তা আমলে কালিল।"
(রদ্দুল মুহতার, ২/৪০৬)
আপনার প্রশ্নের বিশ্লেষণ:
১. দুইবার চুল বের হয়েছে কিনা চেক করা: নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় মাথার চুল বের হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য হাত দিয়ে চুল স্পর্শ করা বা চেক করা একটি সামান্য কাজ। এটি সাধারণত আমলে কালিল হিসেবে গণ্য হয়। কারণ এটি এমন একটি কাজ নয় যা দেখে বাইরের কেউ মনে করবে যে ব্যক্তি নামাজে নেই। বরং এটি নামাজরত অবস্থায়ও মানুষ করতে পারে।
২. একবার নাক মোছা: নাক মোছাও একটি সামান্য কাজ। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাজে নাক মোছার অনুমতি দিয়েছেন। ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর সহিহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:
"রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাজে থুথু বা নাকের ময়লা মুছার অনুমতি দিয়েছেন।"
(সহিহ বুখারী, হাদিস নং: ১২১৩)
হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত:
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:
"নামাজে হাত দিয়ে শরীরের কোনো অংশ স্পর্শ করা, চুল ঠিক করা, নাক মোছা, কাপড় সোজা করা—এসব কাজ আমলে কালিল। এতে নামাজ ভঙ্গ হয় না।"
(ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ১/১০৩)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর ইমদাদুল ফতোয়া-তে বলেন:
"নামাজে ছোটখাটো কাজ যেমন—চুল স্পর্শ করা, নাক মোছা, কাপড় সোজা করা—এগুলো আমলে কালিল। এতে নামাজ ভঙ্গ হয় না এবং সিজদায়ে সাহুও ওয়াজিব হয় না।"
(ইমদাদুল ফতোয়া, ১/২৩৪)
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফতোয়ায় বলেন:
"নামাজে একবার বা দুইবার হাত দিয়ে চুল স্পর্শ করা বা নাক মোছা আমলে কালিল। এতে নামাজ ভঙ্গ হবে না। তবে নামাজে অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ এটি নামাজের আদবের খিলাফ।"
(ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/১৮৫)
সিদ্ধান্ত:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী—নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় দুইবার চুল বের হয়েছে কিনা চেক করা এবং একবার নাক মোছা—এগুলো আমলে কালিল (সামান্য কাজ)। এতে নামাজ ভঙ্গ হবে না এবং নামাজ দোহরানোর প্রয়োজন নেই। আপনার নামাজ সহিহ হয়েছে।
তবে ভবিষ্যতে নামাজে অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া থেকে বিরত থাকা উচিত। নামাজে একাগ্রতা (খুশু-খুজু) বজায় রাখা ফরজের অন্তর্ভুক্ত না হলেও এটি নামাজের রূহ এবং আত্মা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে খুশু-খুজুর সাথে নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
১. আল-হিদায়াহ, কিতাবুস সালাত ২. রদ্দুল মুহতার, ২/৪০৬ ৩. ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ১/১০৩ ৪. ইমদাদুল ফতোয়া, ১/২৩৪ ৫. ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/১৮৫ ৬. সহিহ বুখারী, হাদিস নং: ১২১৩