"বাবাকে ডাক দে, এখনি তালাক দিব" এভাবে বললে কি তালাক পতিত হবে ?
Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi
Question
আর একদিন স্বামী তালাকের অধিকার দেয় আমি তখন বলি "আমি" শেষ আর কিছু বলিনি এতে তাফবীজ হবে?
আর স্বামীকে তালাক দিতে বললে সে আমাকে বলতো তুমি দেও তুমি তালাক দেও তুমি দিলেও হবে এখানে তার আমাকে অধিকার দেওয়ার নিয়ত ছিল না সে জানতো না তাফবীজ কি এতে কি তালাক অধিকার পাবো? আর যেহেতু অধিকার কলে দেন তাই কল কাটার পর মজলিস শেষ এক্ষেত্রে কল কাটার পর ও কি স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে?
Answer
তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়লাম। আপনার প্রশ্নে কয়েকটি বিষয় রয়েছে। আমি প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
১ম পরিস্থিতি: "বাবাকে ডাক দে, এখনি তালাক দিব"
আপনি স্বামীকে তালাক দিতে বলছিলেন, তখন স্বামী বলল "তোর বাবাকে ডাক দে, এখনি তালাক দিব"। আপনি বললেন "আচ্ছা" কিন্তু বাবাকে ডাকেননি, এবং স্বামীও তালাক দেননি।
এতে কি তালাক হবে?
উত্তর: না, এতে কোনো তালাক হবে না। কারণ:
- স্বামী তালাকের শর্ত হিসেবে বাবাকে ডাকার কথা বলেছিল
- আপনি বাবাকে ডাকেননি
- স্বামী তালাক দেননি
- তালাকের কোনো শব্দ উচ্চারিত হয়নি
তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য তালাকের শব্দ উচ্চারণ করা আবশ্যক। যেহেতু স্বামী তালাকের শব্দ উচ্চারণ করেননি, তাই কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি।
দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তালাক দুইবার, তারপর হয় ভালোভাবে রাখা অথবা সৌজন্যের সাথে বিদায় দেওয়া।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
তালাক শুধুমাত্র স্পষ্ট শব্দে বা ইঙ্গিতে (যদি স্বামী কথা বলতে অক্ষম হয়) সংঘটিত হয়। এখানে কোনো তালাকের শব্দই উচ্চারিত হয়নি।
২য় পরিস্থিতি: স্বামী তালাকের অধিকার দিল, স্ত্রী বলল "আমি"
একদিন স্বামী স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিল (তাফবীজ)। স্ত্রী তখন শুধু বলল "আমি" এবং আর কিছু বলল না।
এতে কি তাফবীজ হবে?
উত্তর: না, এতে তালাক সংঘটিত হবে না। কারণ:
- স্ত্রী শুধু "আমি" বলেছে, যা তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়
- তালাকের নিয়ত ছাড়া "আমি" শব্দটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না
- তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্পষ্ট তালাকের শব্দ (যেমন: "আমি তালাক দিলাম", "তুমি তালাক") অথবা নিয়তসহ ইঙ্গিত প্রয়োজন
দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।" (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)
যেহেতু স্ত্রী "আমি" বলে তালাকের নিয়ত করেনি, তাই কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি।
৩য় পরিস্থিতি: স্বামী বলল "তুমি দাও, তুমি তালাক দাও, তুমি দিলেও হবে"
স্বামী স্ত্রীকে বলত "তুমি দাও, তুমি তালাক দাও, তুমি দিলেও হবে"। কিন্তু স্বামীর নিয়ত ছিল না তাকে তালাকের অধিকার দেওয়ার, এবং সে জানত না তাফবীজ কী।
এতে কি স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে?
উত্তর: এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।
প্রথমত: যদি স্বামী স্পষ্টভাবে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেয় (তাফবীজ) এবং স্ত্রী সেই অধিকার গ্রহণ করে, তবে তা বৈধ। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো—স্বামীর নিয়ত ছিল না এবং সে জানত না তাফবীজ কী।
দ্বিতীয়ত: ইসলামী আইনে, তালাকের অধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বামীর নিয়ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি স্বামী জানত না যে "তুমি দাও" বলার অর্থ তালাকের অধিকার দেওয়া, এবং তার নিয়তও তা না হয়, তাহলে এটি তালাকের তাফবীজ হিসেবে গণ্য হবে না।
তৃতীয়ত: তবে কিছু আলেমের মতে, যদি স্বামী স্পষ্টভাবে বলে "তুমি তালাক দাও" এবং স্ত্রী তা গ্রহণ করে, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে, যদিও স্বামী তাফবীজের পরিভাষা না জানে। কারণ শব্দগুলো স্পষ্ট।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে 'তুমি নিজেকে তালাক দাও' অথবা 'তোমার ব্যাপারে তুমি নিজেই সিদ্ধান্ত নাও', তবে স্ত্রী যদি তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তা কার্যকর হবে।" (মাজমু' আল-ফাতাওয়া, ৩৩/২৮৫)
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো—স্বামী যদি প্রমাণ করতে পারে যে তার নিয়ত ছিল না এবং সে জানত না, তাহলে এই বিষয়টি আদালতে বা আলেমদের কাছে উপস্থাপন করা উচিত। সাধারণভাবে, শব্দ স্পষ্ট হলে নিয়তের দিকে তাকানো হয় না যদি না শব্দটি দ্ব্যর্থবোধক হয়।
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেয় এবং স্ত্রী তা গ্রহণ করে, তাহলে তালাক সংঘটিত হবে। তবে যদি স্বামী বলে 'আমার নিয়ত ছিল না', তাহলে সেটি তার নিয়ত অনুযায়ী বিচার করা হবে যদি সে সত্যবাদী হয়।" (আশ-শারহুল মুমতি', ১৩/৮০)
৪র্থ পরিস্থিতি: ফোনে অধিকার দেওয়া এবং কল কাটার পর
স্বামী ফোনে তালাকের অধিকার দিল, তারপর কল কাটা হলো। প্রশ্ন হলো—কল কাটার পরও কি স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে?
উত্তর: তালাকের তাফবীজের মজলিস (সভা) সম্পর্কিত নিয়ম হলো:
- যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেয় এবং সেই মজলিসে (সভায়) স্ত্রী তা গ্রহণ না করে, তবে পরবর্তীতে সেই অধিকার আর থাকে না (যদি না স্বামী আবার নতুন করে অধিকার দেয়)
- ফোনে অধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে, কল চলাকালীন সময়ই হলো মজলিস
- কল কাটার পর সেই মজলিস শেষ হয়ে যায়
- তাই কল কাটার পর স্ত্রী আর তালাকের অধিকার পাবে না
দলিল: সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তালাকের অধিকার দেওয়ার পর স্ত্রী যদি সেই মজলিসে তালাক না নেয়, তবে তার আর সেই অধিকার থাকে না।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৯৯, সুনানে তিরমিযী: ১১৭৮)
শায়খ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) এই হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। (সহীহ আবু দাউদ: ১৯২৮)
তবে কিছু আলেম মনে করেন, যদি স্বামী শর্ত না করে যে "এই মজলিসের মধ্যে তালাক দিতে হবে", তাহলে স্ত্রী পরবর্তী সময়েও তালাক দিতে পারবে। কিন্তু অধিকাংশ আলেমের মতে, মজলিস শেষ হলে অধিকার শেষ হয়ে যায়।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
| পরিস্থিতি | রায় | |-----------|------| | স্বামী বলল "বাবাকে ডাক দে, তালাক দিব" কিন্তু বাবাকে ডাকা হয়নি, তালাকও দেওয়া হয়নি | কোনো তালাক হয়নি | | স্বামী অধিকার দিল, স্ত্রী শুধু "আমি" বলল | কোনো তালাক হয়নি | | স্বামী বলল "তুমি দাও" কিন্তু নিয়ত ছিল না, তাফবীজ জানত না | বিষয়টি স্পষ্ট নয়; স্বামীর নিয়ত অনুযায়ী বিচার হবে | | ফোনে অধিকার দেওয়ার পর কল কাটা গেল | কল কাটার পর অধিকার শেষ; স্ত্রী আর তালাক দিতে পারবে না |
গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ
১. তালাক নিয়ে খেলা করবেন না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"আল্লাহর নিকট বৈধ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত হলো তালাক।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮, ইবনে মাজাহ: ২০১৮)
২. তালাক নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করলেও তালাক হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তিনটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে করলে তা কার্যকর হয় এবং ঠাট্টা করলেও তা কার্যকর হয়: বিবাহ, তালাক এবং রজ'আত (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৯৪, তিরমিযী: ১১৮৪)
৩. আপনার স্বামীর সাথে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন এবং ভবিষ্যতে তালাকের কথা না বলার সিদ্ধান্ত নিন।
৪. যদি আপনার মনে কোনো সন্দেহ থাকে, তবে আপনার এলাকার কোনো বিশ্বস্ত আলেমের সাথে সরাসরি কথা বলুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আমরা দুআ করি আল্লাহ আপনার ও আপনার পরিবারের মধ্যে শান্তি ও ভালোবাসা বজায় রাখুন। আমীন।