ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্কের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই
Family Life · Hanafi
Question
আমার বিয়েতে গার্জিয়ান হিসেবে আমার মামা ছিলো,কিন্তু তিনি আমার আকদ এ থাকলেও বিয়ের যে প্রোগ্রাম হয় সেই প্রোগ্রাম এ এটেন্ড করেনি, পারিবারিক সমস্যার জন্য আমার মামিও আসেননি আর আমার মামা এবং আমার মামাতো বোনদেরও আসতে দেয়নি।
এখন আমার মামাতো বোন বড়টার বিয়ে,এমতাবস্থায় আমার হাসবেন্ড বলতেছে উনি যেহেতু আসেনি আমরাও যাবোনা,অথচ সব ঠিকঠাক হওয়ার পর মামা সরি বলেছে,তিনি ভুল করেছেন।
এই অবস্থায় আমার হাসবেন্ডকে কিভাবে মানানো যায়?
এটেন্ড না করলে তো এক প্রকার সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার দিকেই এগোচ্ছে!
আমার হাসবেন্ড বলতেছে তার আত্মসম্মান এ লাগতেছে বিয়েতে যাওয়াটা
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর প্রদানে আমি নিম্নোক্তভাবে আলোকপাত করছি—
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার বিবাহের সময় আপনার মামা অভিভাবক (গার্ডিয়ান) হিসেবে আকদে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু বিবাহের অন্যান্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেননি। পারিবারিক সমস্যার কারণে আপনার মামিও আসেননি এবং মামা আপনার মামাতো বোনদেরও আসতে দেননি। এখন আপনার মামাতো বোনের বিয়েতে আপনার স্বামী যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, কারণ মামা তখন আসেননি। অথচ মামা পরে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। এখন আপনার স্বামীকে কীভাবে বোঝাবেন?
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
১. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন ও হাদিসে এর উপর ব্যাপক তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ "আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট চাও এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে সাবধান থাক।" (সূরা আন-নিসা: ১)
হাদিসে এসেছে:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ "যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (সহীহ বুখারী: ২০৬৭)
২. অন্যায়ের জবাবে অন্যায় না করা
আপনার স্বামী যে আচরণ করতে চাচ্ছেন—অর্থাৎ মামা আসেননি বলে আমরাও যাব না—এটি ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী। ইসলামে প্রতিশোধপরায়ণতা ও সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিবর্তে ক্ষমা ও সহনশীলতার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ "ভাল ও মন্দ সমান নয়। মন্দের প্রতিকার কর উৎকৃষ্টতর পদ্ধতিতে। ফলে যে ব্যক্তির সাথে তোমার শত্রুতা রয়েছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।" (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪)
৩. ক্ষমা ও উদারতার গুরুত্ব
আপনার মামা ইতিমধ্যে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। ইসলামে ক্ষমা করার অত্যন্ত গুরুত্ব রয়েছে।
হাদিসে এসেছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا "দান-সদকা সম্পদ কমায় না, আর বান্দা ক্ষমা করার কারণে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮)
৪. বিবাহের দাওয়াতে সাড়া দেওয়ার গুরুত্ব
বিবাহের দাওয়াতে সাড়া দেওয়া ইসলামী আদবের অংশ। হাদিসে বিবাহের দাওয়াত কবুল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাদিসে এসেছে:
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا دُعِيَ أَحَدُكُمْ إِلَى الْوَلِيمَةِ فَلْيَأْتِهَا "তোমাদের কাউকে ওলিমার দাওয়াত দেওয়া হলে সে যেন তাতে উপস্থিত হয়।" (সহীহ বুখারী: ৫১৭৩)
স্বামীকে বোঝানোর উপায়
আপনার স্বামীকে নিম্নোক্ত যুক্তিগুলো দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন:
১. ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা
- আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে কবিরা গুনাহ। হাদিসে বলা হয়েছে, "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৮৪)
- আমাদের প্রতিক্রিয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ না হয়ে সওয়াবের কাজ হওয়া উচিত।
২. মামার ভুল স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা
- মামা ইতিমধ্যে ভুল স্বীকার করেছেন এবং ক্ষমা চেয়েছেন। ইসলামে ক্ষমা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
- "যে ব্যক্তি ক্ষমা করে এবং ক্ষমা করে দেয়, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে।" (সূরা আশ-শূরা: ৪০)
৩. সম্পর্কের গুরুত্ব
- আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা আমাদের ঈমানের অংশ। এই সম্পর্ক ছিন্ন করলে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হবে।
- আপনার মামাতো বোনের বিয়েতে না গেলে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হবে, যা পরবর্তীতে আরও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
৪. আত্মসম্মানের বিষয়টি
- স্বামী বলেছেন তার আত্মসম্মানে লাগছে। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে, ক্ষমা করা ও উদারতা প্রদর্শন করাই বড় মর্যাদার কাজ।
- "ক্ষমা করা বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করে" — এই হাদিসটি স্মরণ করিয়ে দিন।
৫. ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করা
- সম্পর্ক নষ্ট হলে ভবিষ্যতে পারিবারিক অনুষ্ঠান, সুখ-দুঃখে অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে যাবে।
- আমাদের সন্তানদের জন্য আমরা যেন উত্তম উদাহরণ স্থাপন করি।
ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী ফিকহের আলোকে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হারামের কাছাকাছি পর্যায়ের গুনাহ। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) সহ সকল ইমামগণ সিলাতুর রাহিমের উপর জোর দিয়েছেন।
ফাতাওয়া হিন্দিয়্যায় (আলমগীরী) উল্লেখ আছে: আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা ওয়াজিবের নিকটবর্তী। সম্পর্ক ছিন্ন করা হারামের নিকটবর্তী।
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এ উল্লেখ আছে:
وَصِلَةُ الرَّحِمِ وَاجِبَةٌ وَإِنْ كَانُوا فَاسِقِينَ "আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ওয়াজিব, যদিও তারা ফাসিক (গুনাহগার) হয়।"
স্বামীকে বোঝানোর কৌশল
১. নরম ভাষায় কথা বলা — রাগ বা উত্তেজনার পরিবেশে নয়, বরং শান্তভাবে আলোচনা করুন। ২. দ্বীনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা — তাকে মনে করিয়ে দিন যে, এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়। ৩. ভালো উদাহরণ দেওয়া — রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ক্ষমাশীলতার উদাহরণ দিন। ৪. দোয়া করা — আল্লাহর কাছে স্বামীর হিদায়াতের জন্য দোয়া করুন।
উপসংহার
আপনার স্বামীকে বোঝানো উচিত যে, মামার ভুলের প্রতিশোধ নেওয়া ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী। মামা ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন, তাই আমাদের উচিত ক্ষমা করে দেওয়া এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা। বিবাহের দাওয়াতে সাড়া দেওয়া এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।
উত্তর প্রদানে সহায়ক গ্রন্থসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ (আলমগীরী)
- সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী)
- বেহেশতি জেওয়ার (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)