কাবিননামার ১৮ নং কলাম ফাঁকা থাকা অবস্থায় স্বাক্ষর ও পরবর্তীতে কাজী কর্তৃক পূরণ করলে কি স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে?
Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল। আমি ধাপে ধাপে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি:
১. কাবিননামার ১৮ নং কলামে তালাকের অধিকার প্রসঙ্গে
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, কাবিননামায় স্বাক্ষরের সময় ১৮ নং কলাম ফাঁকা ছিল এবং পরে কাজী নিজে সিল মেরে তা পূরণ করেছেন। এ বিষয়ে ইসলামি বিধান হলো:
মূলনীতি: তালাকের ক্ষমতা (তাফউইদ আত-তালাক) স্বামী স্ত্রীকে দিতে পারেন। তবে তা অবশ্যই স্বামীর স্পষ্ট সম্মতিতে হতে হবে। স্বামী যদি ফাঁকা ফরমে স্বাক্ষর করেন এবং পরবর্তীতে কাজী তা পূরণ করেন, তাহলে এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ রয়েছে:
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: যদি স্বামী জানত যে ফরমটি ফাঁকা আছে এবং পরবর্তীতে তা পূরণ করা হবে, এবং তিনি তা মেনে নিয়ে স্বাক্ষর করেছেন, তাহলে তা স্বামীর পক্ষ থেকে অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে। তবে যদি স্বামী জানত না যে এতে তালাকের অধিকার দেওয়া হচ্ছে, তাহলে তা বৈধ হবে না।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: তালাকের ক্ষমতা অর্পণ (তাফউইদ) স্বামীর স্পষ্ট ইচ্ছা ও সম্মতি ছাড়া কার্যকর হয় না। যদি স্বামী ফাঁকা ফরমে স্বাক্ষর করে এবং পরে অন্য কেউ তা পূরণ করে, তাহলে তা স্বামীর পক্ষ থেকে অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে না যদি না স্বামী তা জেনে এবং মেনে নিয়ে স্বাক্ষর করে থাকেন।
আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনি বলেছেন যে, "আমরা এসব ব্যাপারে ওই সময় কিছু জানতাম না স্বামী ও না", অর্থাৎ আপনার স্বামী জানতেন না যে ১৮ নং কলামে তালাকের অধিকার দেওয়া হচ্ছে, তাই এই শর্তটি আপনার স্বামীর পক্ষ থেকে বৈধভাবে দেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হবে না। কারণ স্বামী জানতেন না তিনি কী স্বাক্ষর করছেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: আপনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে আপনার স্বামী জানতেন এবং মেনে নিয়েছিলেন যে ১৮ নং কলামে তালাকের অধিকার দেওয়া হবে, তাহলে তা বৈধ হবে। কিন্তু যেহেতু আপনি বলেছেন তিনি জানতেন না, তাই এটি বৈধ হবে না।
২. কিনায়া (ইশারাভিত্তিক) বাক্য প্রসঙ্গে
আপনি বলেছেন যে আপনি রাগে ঝগড়ায় অনেক কিনায়া বাক্য বলেছেন, যেমন ফেসবুকে "ডিভোর্সড", "সিঙ্গেল" স্ট্যাটাস দেওয়া ইত্যাদি।
মূলনীতি: কিনায়া বাক্য দ্বারা তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য নিয়ত (ইচ্ছা) শর্ত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"ইন্নামাল আ'মালু বিন নিয়্যাত" - "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: কিনায়া বাক্য দ্বারা তালাক কার্যকর হবে না যতক্ষণ না ব্যক্তির নিয়ত তালাকের হয়। যদি নিয়ত না থাকে, তাহলে তালাক পতিত হবে না।
শায়খ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক কার্যকর হবে যদি নিয়ত থাকে। নিয়ত না থাকলে তালাক পতিত হবে না।
আপনার ক্ষেত্রে: আপনি বলেছেন যে আপনি জানতেন না যে এসব বাক্য দ্বারা তালাক হতে পারে, এবং আপনার নিয়ত তালাকের ছিল না। তাই আপনার এসব বাক্য দ্বারা তালাক পতিত হয়নি।
তবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: আপনি যদি কোনো সময় তালাকের নিয়তে এসব বাক্য বলে থাকেন, তাহলে তা গণ্য হবে। কিন্তু আপনি বলেছেন যে আপনার নিয়ত ছিল না, তাই তালাক পতিত হয়নি।
৩. আপনার বর্তমান অবস্থা
যেহেতু:
- ১৮ নং কলামে তালাকের অধিকার বৈধভাবে দেওয়া হয়নি (কারণ স্বামী জানতেন না)
- আপনার কিনায়া বাক্যগুলোতে তালাকের নিয়ত ছিল না
সুতরাং, আপনি তালাকের অধিকার পাবেন না এবং আপনার কিনায়া বাক্যগুলো দ্বারা তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ এখনও বৈধ রয়েছে।
৪. আপনার করণীয়
১. আপনার স্বামীর সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন - যদি আপনি তালাকের অধিকার চান, তাহলে স্বামীর সাথে আলোচনা করে তিনি আপনাকে এই অধিকার দিতে পারেন।
২. ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ) থেকে দূরে থাকুন - শয়তান মানুষকে এ ধরনের সন্দেহে ফেলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللَّهِ" - "আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ বলে, আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি, কিন্তু যখন আল্লাহর পথে কষ্ট পায়, তখন মানুষের কষ্টকে আল্লাহর আযাবের মতো মনে করে।" (সূরা আল-আনকাবুত: ১০)
৩. তাওবাহ করুন - আপনি রাগে এসব কথা বলেছেন, এর জন্য আল্লাহর কাছে তাওবাহ করুন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।
৪. স্থানীয় আলেমের সাথে পরামর্শ করুন - আপনার এলাকার কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন।
উপসংহার
আপনার বিবাহ বৈধ রয়েছে এবং আপনি তালাকের অধিকার পাবেন না, কারণ:
- ১৮ নং কলামে তালাকের অধিকার বৈধভাবে দেওয়া হয়নি (স্বামী জানতেন না)
- আপনার কিনায়া বাক্যগুলোতে তালাকের নিয়ত ছিল না
আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ধৈর্য ও সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আমিন।