বেদ্বীন পরিবেশে পর্দা ও সন্তান প্রতিপালন

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 3620
Questioner: sss
Question Asked: 07 Aug 2026, 07:30 PM
Reviewed & Published: 07 Aug 2026, 07:38 PM
Views: 14
Tokens: 14,172
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। প্রশ্নটি বড় হয়ে যাওয়ার জন্য ক্ষমা চাচ্ছি, তাছাড়া আমার পরিস্থিতি সঠিকভাবে বুঝানো সম্ভব নয়।

আমি একজন বিবাহিত নারী। আমার শশুড়বাড়ির পরিবার সবাই শহরে আলাদা যে যার বাসায় থাকে এবং সবসময় সবাই সবার বাসায় যাওয়া আসা করে। মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পুরো পরিবার একত্রিত হয়, বিশেষ করে ঈদে, এবং কমবেশি এক সপ্তাহের মত থাকে। পরিবারে শুধু আমি পরিপূর্ণরুপে পর্দা পালন করে চলার চেষ্টা করি। বাকি আমার শশুরবাড়ির লোকজন দ্বীন মেনে চলেন না। আমার পর্দার ব্যাপারে তারা সচেতন নয় এবং সাহায্যকারীও নন। ফলে আমি যখন গ্রামের বাড়ি যাই তখন আমার পর্দা মেনে চলতে খুবই কষ্ট হয়। আমার রুমের বাহিরে আমি সারাদিন হিজাব নিকাব হাতমোজা পা মোজা পরে থাকি। এভাবে থাকতে ও কাজ করতে আমার কষ্ট হয়। এরপরেও প্রায় প্রত্যেকবার কোনো না কোনোভাবে আমার পর্দা লঙ্ঘন হয়। কারণ পুরুষদের পুরো ঘরে (আমার রুম ব্যতীত) এবং রান্নাঘরে অবাধ চলাফেরা। ফলে অনেক সময় আমার চেহারা দেখে ফেলে যেহেতু রান্নাঘরে খুবই গরম থাকে এবং সেখানে নেকাব পরে থাকা যায়না, আবার মাঝেমধ্যে রান্নাঘরেই খেতে হয়, থালাবাসন ধোয়ার সময় হাতের কাপড় উপরে উঠাতে হয়। পুরুষদের অবাধ বিচরণের ফলে কাজ করার সময় তাদের গায়ের সাথে কখনো স্পর্শ লাগে, কখনো ধাক্কা লাগে। দুইএকবার আমার স্বামীর ভাইয়েরা না বলেই হঠাৎ আমার রুমে প্রবেশ করে আমি পরিপূর্ণ পর্দা করি জানা সত্ত্বেও এবং এটি ঘটেছে আমি সর্বশেষ গ্রামের বাড়িতে অবস্থানকালে। তাদের আমার স্বামী মাঝেমধ্যে বুঝালেও তারা কখনো ঠিক থাকে, কখনো আবার নিজেদের মত চলে। ভাইদের মধ্যে আমার স্বামী সবার ছোট হওয়ায় তাদের কঠোরভাবে কিছু বলতে পারে না, উল্টো মাঝেমধ্যে আমার সাথেই রাগ করে। কখনো রাগ করে এটা বলে যে " আমার পর্দা করা মেয়ে বিয়ে করাই ভুল ছিল, আমার পরিবার পর্দা বুঝে না"। আমার রুমের সাথে এটাচ বাথরুম নেই ফলে পর্দা মেনে চলা আরও কষ্টকর হয়। একই বাথরুম আমি আর আমার ভাসুরেরা (যাদের মধ্যে অবিবাহিত পুরুষ ও রয়েছে) ব্যবহার করি। এটাচ বাথরুম সহ দুটি রুমের একটিতে আমার শাশুড়ি এবং অন্যটিতে আমার জা থাকে। যেহেতু এটাচ বাথরুমসহ রুমে থাকলে আমার জন্য কিছুটা সুবিধা হয় তাই আমার পর্দার সমস্যার কথা আমার শাশুড়িকে বুঝিয়ে বলা হলেও তিনি সে রুমে আমাকে থাকতে দেয়না। আমার স্বামীকে আমার পর্দা নষ্টের বিষয়ে বলার পর তিনি বলেছেন আমার সমস্যা হলে পরেরবার থেকে বাড়িতে না যেতে। যদিও তিনি সেটা মন থেকে বলেন নি, শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে আমার হক নষ্টের গুনাহ থেকে বাঁচতে বলেছেন। কিন্তু তিনি চান যেন আমি সব মেনে নিয়ে বাড়িতে থাকি। তার মতে তারা যদি হঠাৎ করে আমাকে দেখেও ফেলে এতে তো আমার কোনো গুনাহ হবে না। এখানে তো আমার কোনো দোষ নেই। আর অল্প কয়েকদিনের জন্য আমি কেন কষ্ট সহ্য করতে পারব না। যদিও বিষয়টি আমার নিকট খুবই কষ্টদায়ক। এছাড়াও আমি যেহেতু জানি যে সেখানে গেলে আমার পর্দা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি এবং যতবারই গিয়েছি প্রায় প্রত্যেকবারই পর্দা নষ্ট হয়েছে তাহলে আমার কি জেনেশুনে সেখানে যাওয়া উচিত হবে? একজন মুমিনা হিসেবে আমার কি করা উচিত?(যদি সেখানে না যাই তাহলে শাশুড়ি এবং স্বামীর ভাইয়েরা বিষয়টিকে স্বাভাবিক ভাবে নিবে না এবং নানা কথা হবে, স্বামীও হয়তো মনে মনে কষ্ট পাবে)।

তাছাড়া মাঝেমধ্যে তারা টিভিতে, সাউন্ড বক্সে উচ্চ ভলিউমে গান শুনে বাচ্চাদের নিয়ে, নাটক- সিনেমা দেখে , বাচ্চারা মোবাইল দেখে। এমতাবস্থায় আমার সন্তানকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখব এবং এই পরিবেশ থেকে দূরে রাখব? গ্রামের বাড়িতে অনেক কাজ থাকায় প্রায়ই রান্নাঘরে থাকতে হয়, তাই রান্নাঘরে কাজ করার সময় সন্তানের দিকে খেয়াল রাখা যায় না। আবার আমার স্বামীর ভরসায়ও রেখে যেতে পারি না কারণ আমার স্বামী নিজেই পরিপূর্ণরুপে দ্বীন পালন করেন না। তিনি দ্বীনের কিছু অংশ কঠোরভাবে মেনে চলেন আবার কিছু অংশে একেবারেই গাফেল। যেমন তিনি হালাল উপার্জনের বিষয়ে সচেতন কিন্তু পর্দা, গান শুনা এসব বিষয়ে সচেতন নন।

Answer

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পরিস্থিতি সত্যিই কঠিন এবং আপনি একজন মুমিনা হিসেবে পর্দা রক্ষার জন্য যে সংগ্রাম করছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।

পর্দার গুরুত্ব ও বিধান

পর্দা ইসলামের একটি অপরিহার্য বিধান। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا "আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে, এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে পড়ে তা ছাড়া।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

আল্লাহ আরও বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ "হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, আপনার কন্যাগণ এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

"যে নারী আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটু পর্দা করল, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।" (তিরমিযী, হাদীস সহীহ)

অমুসলিম/গাফেল পরিবেশে পর্দা রক্ষার করণীয়

১. পর্দা রক্ষা করা ফরজ, তা যেকোনো পরিবেশেই হোক

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"পর্দা করা ফরজ এবং তা আল্লাহর আদেশ। কোনো পরিবেশ বা পরিস্থিতিতে তা পরিত্যাগ করা জায়েয নয়।"

২. জেনে-শুনে পর্দা নষ্ট হয় এমন স্থানে যাওয়া

আপনি যদি নিশ্চিতভাবে জানেন যে সেখানে গেলে আপনার পর্দা নষ্ট হবে, তাহলে সেখানে যাওয়া আপনার জন্য জায়েয নয়। শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"যদি কোনো নারী জানেন যে কোনো স্থানে গেলে তার পর্দা নষ্ট হবে বা ফিতনায় পড়বে, তাহলে তার জন্য সেখানে যাওয়া জায়েয নয়, যদিও তা তার আত্মীয়ের বাড়ি হয়।"

৩. স্বামীর আনুগত্য বনাম পর্দা রক্ষা

স্বামীর আনুগত্য ফরজ, কিন্তু আল্লাহর নাফরমানিতে স্বামীর আনুগত্য জায়েয নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহর নাফরমানিতে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসলিম)

শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:

"যদি স্বামী স্ত্রীকে এমন স্থানে যেতে বলে যেখানে তার পর্দা নষ্ট হবে বা দ্বীন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাহলে স্ত্রীর জন্য সেখানে যাওয়া জায়েয নয়। আল্লাহর আদেশের সামনে সবার আদেশ গৌণ।"

৪. আপনার করণীয়

১. স্বামীর সাথে দৃঢ়ভাবে কথা বলুন: আপনার স্বামীকে বুঝান যে পর্দা আল্লাহর আদেশ এবং এটি আপনার ঈমানের অংশ। আপনি যদি পর্দা না করতে পারেন, তাহলে আল্লাহর শাস্তির ভয় আছে।

২. শাশুড়িকে বুঝান: আপনার শাশুড়িকে দ্বীনের দাওয়াত দিন এবং পর্দার গুরুত্ব বোঝান। এটাচ বাথরুমসহ রুমে থাকার প্রয়োজনীয়তা বুঝান।

৩. গ্রামের বাড়িতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত: যদি সেখানে গেলে পর্দা নষ্ট হওয়া নিশ্চিত হয়, তাহলে সেখানে না যাওয়াই উত্তম। আপনি আপনার স্বামীকে বলতে পারেন:

  • "আমি আল্লাহর আদেশ পালনে অক্ষম, তাই আমি সেখানে যেতে পারছি না।"
  • "আমি চাই না আল্লাহর গযব নেমে আসুক আমাদের উপর।"

৪. স্বামীকে সাথে নিয়ে দ্বীন শিখুন: আপনার স্বামীকে দ্বীনের দাওয়াত দিন। তাকে বুঝান যে পর্দা, গান-বাজনা ইত্যাদি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

সন্তান প্রতিপালন

১. সন্তানকে গুনাহের পরিবেশ থেকে দূরে রাখা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا "হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো জাহান্নামের আগুন থেকে।" (সূরা আত-তাহরীম: ৬)

২. সন্তানের উপর নজর রাখা

  • রান্নাঘরে কাজ করার সময় সন্তানকে আপনার কাছেই রাখুন, যেখানে আপনি দেখতে পারেন।
  • সন্তানকে ইসলামী শিক্ষা দিন এবং গান-বাজনা, নাটক-সিনেমার ক্ষতি বোঝান।

৩. স্বামীকে দায়িত্বশীল করা

আপনার স্বামীকে বলুন:

"আপনি আমাদের সন্তানের পিতা। সন্তানের দ্বীনি তরবিয়ত আপনার দায়িত্ব। আপনি যদি সন্তানকে গান-বাজনা, নাটক-সিনেমা থেকে দূরে না রাখেন, তাহলে আল্লাহর কাছে আপনি জবাবদিহি করবেন।"

গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা

১. ভাসুরের সাথে পর্দা

ভাসুর (স্বামীর ভাই) আপনার জন্য গায়রে-মাহরাম। তাদের থেকে পর্দা করা ফরজ। শাইখ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"স্বামীর ভাই স্ত্রীর জন্য গায়রে-মাহরাম। তার থেকে পর্দা করা ফরজ।"

২. বাথরুম ব্যবহার

একই বাথরুম ভাসুরদের সাথে ব্যবহার করা উচিত নয়। শাইখ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"নারীদের জন্য গায়রে-মাহরাম পুরুষদের সাথে বাথরুম ভাগ করে নেওয়া জায়েয নয়।"

৩. আকস্মিক দেখা হয়ে গেলে

যদি কেউ আকস্মিকভাবে আপনাকে দেখে ফেলে, তাহলে আপনার গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ। কারণ আপনি তো পর্দা করার চেষ্টা করেছেন। আল্লাহ বলেন:

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا "আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬)

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আপনার জন্য উত্তম হবে:

  1. গ্রামের বাড়িতে না যাওয়া যদি সেখানে পর্দা রক্ষা করা সম্ভব না হয়।
  2. স্বামীকে দাওয়াত দেওয়া এবং তাকে দ্বীনের গুরুত্ব বোঝানো।
  3. সন্তানকে ইসলামী পরিবেশে রাখার চেষ্টা করা
  4. আল্লাহর কাছে ধৈর্য প্রার্থনা করা এবং দোয়া করা।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন।"

আপনি যদি পর্দা রক্ষার জন্য গ্রামের বাড়িতে না যান, তাহলে আল্লাহ আপনাকে এর উত্তম প্রতিদান দেবেন। আপনার স্বামী ও শাশুড়ি যদি রাগ করেন, তবুও আল্লাহর আদেশ পালন করা আপনার জন্য অপরিহার্য।

দোয়া:

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا "হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী-স্বামী ও সন্তান-সন্ততিদের মাধ্যমে আমাদের চোখ জুড়ান এবং আমাদের মুত্তাকীদের ইমাম বানান।" (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)

আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সাহায্য দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.