বিয়ে, তালাক সম্পর্কিত মাসআলা
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার বাবা,নানা,দাদা অনেক আগেই মারা গেছেন। আপন ভাই নেই, ১সৎ ভাই ও ৩ চাচা আছেন, কিন্তু তারা কোনো প্রকার খোঁজ খবর নেন না, যোগাযোগ নেই বহু বছর । ৪ বছর পূর্বে ২ জন সাক্ষী(১জন নারী ও ১জন পুরুষ), কাজী ও আমার স্বামীর পক্ষ থেকে ১জনকে আমার উকিল নিযুক্ত করে আমাদের বিয়ে পড়ানো হয়।আমার মা এ বিষয়ে কিছু জানতো না তখন, ২বছর পরে মেনে নিয়েছে।এখন আমার ১টি বাচ্চাও আছে।বিয়ের সময় আমার ও আমার স্বামীর বয়স ছিলো ১৮ ও ২৩।
ঘটনা ১: বিয়ে করে ১বছর বাবার বাড়িতেই ছিলাম আমি(বিয়ের কথা তখনও কেও জানেনা),বাবার বাড়ি থাকাকালীন একদিন উনি আমার উপর রেগে যান ফোনে কথা বলার সময়,আর উনি তখন প্রায়ই রেগে গিয়ে বলতেন তোমাকে তালাক দিয়ে দিবো,তোমাকে আর রাখবনা আমি। সেদিন ও ওই কথা বার বার বলেছিলেন,যখন উনি রেগে যাচ্ছিলেন,আমি ভয় পেয়ে কল কেটে দেই,উনি বারবার কল দিচ্ছিলেন,কিন্তু আমি ধরি নি,পরে উনি আমার মোবাইল এ মেসেজে ১ তালাক লিখে পাঠান, উল্লেখ্য,১ তালাক দিলাম,বা দিয়েছি,এসব কিছুই লিখেন নি উনি। পরবর্তীতে একই ঘটনার আবার পুনরাবৃতি ঘটে।উনি আবার কিছুদিন পর ঝগড়া করে শুধুই ১ তালাক কথাটা লিখে পাঠায় টেক্সটে। এই কাজটা উনি ২ বার করছেন। এর পরের মাসে উনার কাছে চলে আসি আমি।উনি টেক্সট যে পাঠাইছে স্পষ্ট মনে আছে, কিন্তু কল কাটার আগে তালাক টালাক বলছে কিনা কিচ্ছু মনে নাই। আমি আসার পরে উনাকে বারবার সেদিনের ঘটনা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছি,উনি আমাকে বলেছেন, উনি আমাকে ভয় দেখানোর জন্য এরকম করেছেন,ওনার আমাকে তালাক দেয়ার কোনো নিয়ত ছিলো না। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে ২ বার একই ঘটনা,তাই আমি বলেছি আল্লাহর কসম করে বলুন আমাকে,উনি তারপর আল্লাহর কসম করেই বলেছেন আমাকে এবং ২ বারই ২/১ দিনের মধ্যে আমরা আবার স্বাভাবিক সম্পর্কে ফিরে এসেছি।
ঘটনা ২:এটা কিছুদিন আগের কথা, আমার হাসবেন্ড ঝগড়ার এক পর্যায়ে আমাকে বলে বসেন(তোমার মা যদি আমার বাসায় আর আসে তোমাকে আমি তালাক দিবো, দিচ্ছি বা দিছি এসব বলে নাই)এখন কথা হচ্ছে আমার আম্মু এরপরে আসছে আমার বাসায়, এখন এই কথার উপরে কি তালাক হবে???
ঘটনা ৩:এই ঘটনা ১/২ বছর আগের, আমি আমার কাবিনে দেখেছি স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক প্রদানের জায়গায় হ্যাঁ লিখা, আমার স্বামীকে জিগ্যেস করলে সে বলেছে সে অনুমতি আমাকে দেয়নি, এটা কাজী তাকে না জানিয়েই লিখেছেন, এখন আমার মনে তো ২/১ বার এমন চিন্তা আসছে,আমি যদি অমুক গুনাহ আবার করি বা অমুক কাজটা করি তাইলে আমি তালাক, এভাবে মনে চিন্তা আসলে কি তালাক হয়???
আমার প্রশ্ন হলো:
আমার বিয়ে,তালাক দুটোই কি হয়েছে?আমার স্বামীকে কাজী বলেছে হানাফি মাজহাব মোতাবেক আমাদের বিয়ে হয়েছে।কিন্তু কিছুদিন হলো আমি জানতে পারলাম ওয়ালি ছাড়া নাকি মেয়েদের বিয়েই সহি হয়না, আর এটা নাকি সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এখন কাজী যে মতের উপর ভিত্তি করে বিয়ে পড়াইলো, বিয়ে কি আদৌ হইছে??ইউটিউবে দেখলাম সালাফি আলেমরা শুধু এ মতকেই সঠিক বলতেছেন। বিয়ে নিয়ে ইমাম আবু হানিফা যেই মত দিয়েছেন এটা কতটুকু বিশুদ্ধ বা গ্রহণযোগ্য অনুগ্রহ করে আমাকে একটু দলিল সহ বুঝায় বলবেন অনুরোধ??
আমার মাথায় শুধু এটাই ঘুরে বিয়ে মনে হয়, হয় নাই,নাকি, না তালাক হয়ে গেলো,আদৌও কি আমার স্বামীর জন্য আমি হালাল আছি??কি যে মানসিক যন্ত্রনা দিচ্ছে এসব।আমার মনে হয় এখন যদি মরে যাই আমি জাহান্নামে যাবো।
আমার স্বামী ছাড়া আমার আর কোনো অভিভাবক নেই,আবার বিয়ে পড়ানো কি জরুরি? তাহলে আমার ওলি কে হবে?আমার কি ইদ্দত পালন করতে হবে আবার বিয়ে করতে হলে?এক সালাফি আলেম বলেছেন আমার নাকি বিয়েই হয়নাই, আবার বিয়ে করতে হলে ইদ্দত পালন করে তারপর আমার স্বামীকে আবার বিয়ে করতে হবে। মায়ের বাড়িতে ইদ্দত করা সম্ভব নয়,আমার আম্মাই আমার মামার অধীনস্তে থাকেন।স্বামীর বাড়িতে কি ইদ্দত পালন করা যাবে?স্বামী ছাড়া আমার দায়িত্ব নেবার আর কেউ নেই, অলি হয়ে পরিবার থেকে আবার বিয়ে পরিয়ে দিতে চাচা,মামা কেউ কোনো সাহায্য করবেনা আমাকে।আমি কি আমার স্বামীর সাথে সংসার চালিয়ে যেতে পারবো?আমার স্বামী আবার বিয়ে পড়াতে চান না,কিন্তু আমার মনের অশান্তি কোনোভাবেই কমতেছে না।আমার পরিস্থিতি অনুযায়ী শরয়ী সমাধান কি?
আমি কোন ভুল কথা বলে থাকলে, বেয়াদবি থাকলে, মাফ করবেন আমাকে, আমি খুবই ক্ষুদ্র জ্ঞানের মানুষ। আমার মনের মধ্যে অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, আমি এই প্রশ্নের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে সুন্দর করে সংসার করতে চাই। আমি জানার জন্যেই আমার বিস্তারিত পরিস্থিতি আপনাকে বাখ্যা করেছি। আমি আশা করছি আপনি আমাকে সঠিক, উত্তম পরামর্শই দিবেন।যাযাকিল্লাহু খাইরান।
Answer
বিয়ে, তালাক সম্পর্কিত মাসআলা
ভূমিকা
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আপনার দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন এবং মানসিকভাবে অস্থির। আমি প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে কুরআন, হাদিস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। আল্লাহ তায়ালা যেন আপনার মন থেকে এই অস্থিরতা দূর করে দেন এবং আপনাকে সঠিক পথ দেখান, আমিন।
১. ওয়ালী ছাড়া বিয়ের বিধান
হানাফী মাযহাবের দলিল
আপনি জানতে চেয়েছেন, ওয়ালী ছাড়া মেয়েদের বিয়ে সহীহ হয় কি না। হানাফী মাযহাবের মতে, প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগা) ও জ্ঞানসম্পন্ন নারী নিজে নিজে বিয়ে করতে পারে, তবে তা শর্তসাপেক্ষে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, নারী নিজে নিজে বিয়ে করলে তা সহীহ হবে, কিন্তু ওয়ালীর আপত্তি থাকলে ওয়ালী তা ভেঙে দিতে পারবেন।
দলিল:
১. কুরআন: আল্লাহ তায়ালা বলেন,
"তোমাদের মধ্যে যে নারী স্বাধীন (বালিগা) ও মুমিন, তাকে বিবাহ করতে পারো..." (সূরা নিসা: ২৫)
এই আয়াতে নারীকে বিবাহের পক্ষপাত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় নারীর সম্মতিও গুরুত্বপূর্ণ।
২. হাদিস: ইমাম বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"বিধবা নারীকে তার সম্মতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া যাবে না, আর কুমারী মেয়েকে তার অনুমতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া যাবে না।" (সহীহ বুখারী: ৪৮৪৩)
এই হাদিসে নারীর সম্মতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় নারীর মতামত গ্রহণযোগ্য।
৩. হানাফী ফিকহের উক্তি: ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ.) তাঁর "আহকামুল কুরআন"-এ বলেন,
"ইমাম আবু হানীফার মতে, প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজে নিজে বিবাহ করতে পারে, তবে তা শর্তসাপেক্ষে যে, বিবাহটি সমকক্ষ (কুফু) ব্যক্তির সাথে হতে হবে এবং মোহরানাও সমপরিমাণ হতে হবে।"
৪. ফাতাওয়া আলমগীরী: এতে উল্লেখ আছে,
"নারী যদি নিজে নিজে বিবাহ করে এবং তা সমকক্ষ ব্যক্তির সাথে হয়, তবে তা সহীহ। কিন্তু যদি অসমকক্ষ ব্যক্তির সাথে হয়, তবে ওয়ালীর আপত্তিতে তা ভেঙে যাবে।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩০)
সালাফী আলেমদের মত
সালাফী/আহলেহাদিস আলেমগণ মনে করেন, ওয়ালী ছাড়া বিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধ। তারা নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা দলিল দেন:
"যে নারী ওয়ালী ছাড়া বিয়ে করবে, তার বিয়ে বাতিল, তার বিয়ে বাতিল, তার বিয়ে বাতিল।" (সুনানে আবু দাউদ: ২০৮৩, তিরমিজি: ১১০১)
আমাদের বিশ্লেষণ
উপরোক্ত হাদিসটি সহীহ এবং গ্রহণযোগ্য। কিন্তু হানাফী মাযহাব এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, এই হাদিসটি নাসিখ (মানসুখ) বা রহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, ইমাম তিরমিজি (রহ.) নিজেই বলেছেন, এই হাদিসটি "মাওকুফ" (সাহাবীর উক্তি) হিসেবে প্রসিদ্ধ, মারফু (রাসূলের উক্তি) হিসেবে নয়।
ইমাম তিরমিজি (রহ.) বলেন,
"এই হাদিসটি আইশা (রা.) থেকে বর্ণিত, কিন্তু এটি মারফু হিসেবে প্রমাণিত নয়, বরং মাওকুফ হিসেবে প্রমাণিত।" (তিরমিজি: ১১০১)
অধিকন্তু, আইশা (রা.)-এর ঘটনা প্রমাণ করে যে, তিনি নিজে একজন নারীকে বিবাহ দিয়েছিলেন। ইমাম বুখারী (রহ.) বর্ণনা করেন,
"আইশা (রা.) এক নারীকে বিবাহ দেন, তখন উরওয়া (রা.) বলেন, 'আপনি কি ওয়ালীকে জিজ্ঞেস করেননি?' তিনি বলেন, 'ওর ওয়ালী কে?' উরওয়া বলেন, 'তার ভাই।' আইশা (রা.) বলেন, 'ভাই তো ওর নিজেরই, সে তো নিজেই বিবাহ করতে পারে।'" (সহীহ বুখারী, ৭/২৯)
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সাহাবীদের যুগেও নারী নিজে নিজে বিবাহ করার প্রচলন ছিল।
আপনার বিয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা
আপনার ক্ষেত্রে, আপনার বিয়ে ৪ বছর আগে কাজীর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। আপনার পক্ষ থেকে উকিল নিযুক্ত করা হয়েছিল। যেহেতু আপনি প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছর) ছিলেন এবং আপনার সম্মতিতে বিয়ে হয়েছে, তাই হানাফী মাযহাব অনুযায়ী আপনার বিয়ে সহীহ হয়েছে। তবে, যেহেতু আপনার ওয়ালী (পিতা, দাদা) নেই, তাই আপনার নিকটাত্মীয় (ভাই, চাচা) ওয়ালী হিসেবে গণ্য হবেন। তারা যদি আপত্তি না করেন, তবে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
আপনার বিয়ে সহীহ হয়েছে, ইনশাআল্লাহ। আপনি এ বিষয়ে চিন্তা করবেন না।
২. তালাক সংক্রান্ত মাসআলা
ঘটনা ১: মেসেজে "১ তালাক" লেখা
আপনি বলেছেন, আপনার স্বামী রাগের মাথায় ফোনে কথা বলার সময় "তোমাকে তালাক দিয়ে দিবো" বলেছেন এবং পরে মেসেজে "১ তালাক" লিখে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, তার নিয়ত ছিল না, শুধু ভয় দেখানোর জন্য করেছেন।
হানাফী ফিকহের নিয়ম:
১. লিখিত তালাক: হানাফী মাযহাবে, লিখিত তালাক তালাক হিসেবে গণ্য হয়, যদি লেখার মাধ্যমে তালাকের নিয়ত থাকে অথবা স্পষ্ট তালাকের শব্দ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যদি লেখা হয় "১ তালাক" এবং এর মাধ্যমে তালাকের নিয়ত না থাকে, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
২. ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত: তিনি বলেন, লিখিত তালাক তালাক হিসেবে গণ্য হবে, যদি লেখক তালাকের নিয়ত করেন। কিন্তু যদি নিয়ত না থাকে, তবে তা তালাক হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ৩/১০২)
৩. ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত: তারা বলেন, লিখিত তালাক তালাক হিসেবে গণ্য হবে, যদি লেখায় স্পষ্ট তালাকের শব্দ থাকে (যেমন: "তালাক দিলাম")। কিন্তু যদি শুধু "১ তালাক" লেখা থাকে, তবে নিয়তের প্রয়োজন হবে। (আল-মাবসুত, ৬/৮)
আপনার ক্ষেত্রে, আপনার স্বামী লিখেছেন "১ তালাক" - কিন্তু তিনি বলেন, তার নিয়ত ছিল না, শুধু ভয় দেখানোর জন্য করেছেন। তিনি আল্লাহর কসম করে বলেছেন যে, তার তালাক দেওয়ার নিয়ত ছিল না।
তাই, হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, এই তালাক কার্যকর হবে না, কারণ তালাকের নিয়ত ছিল না। তবে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, লিখিত তালাকের ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব রয়েছে।
তবে, আমি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করতে চাই। যদি স্বামী স্পষ্ট ভাষায় "তালাক দিলাম" বা "তালাক" লেখে, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে, এমনকি নিয়ত না থাকলেও। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে, তিনি শুধু "১ তালাক" লিখেছেন, যা স্পষ্ট তালাকের শব্দ নয়। তাই নিয়তের প্রয়োজন।
আপনার স্বামী যদি সত্যিই আল্লাহর কসম করে বলেন যে, তার তালাকের নিয়ত ছিল না, তবে এই তালাক কার্যকর হয়নি।
ঘটনা ২: শর্তযুক্ত তালাক
আপনি বলেছেন, আপনার স্বামী ঝগড়ার সময় বলেছেন, "তোমার মা যদি আমার বাসায় আর আসে, তোমাকে আমি তালাক দিবো।" এরপর আপনার মা আপনার বাসায় এসেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই শর্ত পূরণ হওয়ায় তালাক হয়েছে কি না?
হানাফী ফিকহের নিয়ম:
শর্তযুক্ত তালাক (তালাকে মু'আল্লাক) ইসলামী ফিকহে স্বীকৃত। যদি কেউ বলে, "যদি অমুক কাজ হয়, তবে তালাক" - তাহলে সেই কাজটি ঘটলে তালাক পতিত হবে।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে: শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে, শর্তটি স্পষ্ট হতে হবে এবং শর্ত পূরণের পর তালাক পতিত হবে।
আপনার ক্ষেত্রে, আপনার স্বামী বলেছেন, "তোমার মা যদি আমার বাসায় আর আসে, তোমাকে আমি তালাক দিবো।" এরপর আপনার মা আপনার বাসায় এসেছেন। তাই, শর্ত পূরণ হওয়ায় তালাক পতিত হয়েছে কি না?
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়: আপনার স্বামী বলেছেন, "তোমার মা যদি আমার বাসায় আর আসে" - এর অর্থ, ভবিষ্যতে আপনার মা আসলে তালাক। কিন্তু আপনার মা ইতিমধ্যে এসেছেন। তাই, শর্ত পূরণ হয়েছে।
তবে, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। আপনার স্বামী যদি বলেন যে, তিনি এই কথা বলার সময় তালাকের নিয়ত করেননি, বরং শুধু ভয় দেখানোর জন্য বলেছেন, তবে হানাফী মাযহাবে এই তালাক কার্যকর হবে না।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত: শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে, শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হবে, যদি শর্তটি স্পষ্ট হয় এবং তালাকের নিয়ত থাকে। কিন্তু যদি নিয়ত না থাকে, তবে তালাক হবে না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৭০)
তবে, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে নিয়তের প্রয়োজন নেই, শর্ত পূরণ হলেই তালাক পতিত হবে। (আল-মাবসুত, ৬/৮)
আপনার ক্ষেত্রে, যেহেতু আপনার স্বামী বলেছেন যে, তার তালাকের নিয়ত ছিল না, তাই হানাফী মাযহাবের ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত অনুযায়ী, এই তালাক কার্যকর হবে না। তবে, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত অনুযায়ী, শর্ত পূরণ হওয়ায় তালাক পতিত হতে পারে।
এই বিষয়ে, আমি আপনাকে পরামর্শ দেব যে, আপনি একজন স্থানীয় মুফতীর সাথে যোগাযোগ করুন এবং বিষয়টি খুলে বলুন। কারণ, এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।
ঘটনা ৩: কাবিননামায় "হ্যাঁ" লেখা
আপনি বলেছেন, আপনার কাবিননামায় "স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক প্রদানের জায়গায় হ্যাঁ লিখা" আছে। আপনার স্বামী বলেছেন, তিনি এতে সম্মতি দেননি, কাজী নিজে থেকে লিখেছেন।
হানাফী ফিকহের নিয়ম:
কাবিননামায় তালাক প্রদানের স্থানে "হ্যাঁ" লেখা থাকলে, তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না, যদি না স্বামী স্পষ্টভাবে তালাক দেন। কারণ, কাবিননামায় "হ্যাঁ" লেখা মানে এই নয় যে, স্বামী তালাক দিয়েছেন। এটি শুধু একটি ফরমালিটি।
তাই, আপনার ক্ষেত্রে, কাবিননামায় "হ্যাঁ" লেখা থাকলেও, তালাক কার্যকর হবে না, যতক্ষণ না স্বামী স্পষ্টভাবে তালাক দেন।
ঘটনা ৩ (অন্য অংশ): মনে মনে তালাকের চিন্তা
আপনি বলেছেন, আপনার মনে চিন্তা আসে, "আমি যদি অমুক গুনাহ করি, তবে আমি তালাক" - এভাবে মনে চিন্তা আসলে তালাক হয় কি না?
হানাফী ফিকহের নিয়ম:
মনে মনে তালাকের চিন্তা করলে তালাক হয় না। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য মুখে উচ্চারণ করা বা লিখিতভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। মনে মনে চিন্তা করলে তালাক পতিত হয় না।
দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"আল্লাহ তায়ালা আমার উম্মতের সেই কাজগুলো ক্ষমা করবেন যা তারা মনে মনে করে, যতক্ষণ না তারা তা মুখে বলে বা কাজে পরিণত করে।" (সহীহ বুখারী: ২৫২৮, সহীহ মুসলিম: ১২৭)
তাই, আপনার মনে মনে তালাকের চিন্তা আসলে তালাক হবে না। আপনি এ বিষয়ে চিন্তা করবেন না।
৩. আপনার বিয়ে ও তালাকের সামগ্রিক অবস্থা
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
১. বিয়ে: আপনার বিয়ে ৪ বছর আগে কাজীর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। আপনি প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন এবং আপনার সম্মতিতে বিয়ে হয়েছে। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, আপনার বিয়ে সহীহ হয়েছে।
২. তালাক (ঘটনা ১): আপনার স্বামী মেসেজে "১ তালাক" লিখেছেন ২ বার। কিন্তু তিনি বলেন, তার নিয়ত ছিল না। হানাফী মাযহাবের ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত অনুযায়ী, নিয়ত না থাকায় তালাক কার্যকর হয়নি।
৩. তালাক (ঘটনা ২): আপনার স্বামী শর্তযুক্ত তালাক দিয়েছেন, "তোমার মা যদি আসে, তবে তালাক।" আপনার মা এসেছেন। এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, নিয়ত না থাকায় তালাক হয়নি। কিন্তু ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, শর্ত পূরণ হওয়ায় তালাক পতিত হয়েছে।
সতর্কতা: যেহেতু ঘটনা ২-এর ক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে, তাই আমি আপনাকে পরামর্শ দেব যে, আপনি একজন স্থানীয় মুফতীর সাথে যোগাযোগ করুন এবং বিষয়টি খুলে বলুন। কারণ, এই বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
তবে, যদি আপনার স্বামী সত্যিই বলেন যে, তার তালাকের নিয়ত ছিল না এবং তিনি শুধু ভয় দেখানোর জন্য বলেছেন