পড়াশোনার কাজে পাসপোর্ট সাইজের ছবি দেয়া যাবে?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 3555
Questioner: Nahida Nodi
Question Asked: 06 Aug 2026, 12:02 PM
Reviewed & Published: 06 Aug 2026, 01:10 PM
Views: 21
Tokens: 5,486
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমরা যারা কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে পড়ি সেখানে আমাদের ছবি দিতে হয়। ফ্যামিলি আরও নিজের পার্সোনাল কিছু বিষয়ের কারণে আমাদের এই সহশিক্ষা ছাড়া সম্ভব হয়ে উঠে না।
এতে পড়াশোনার কাজে আমাদের পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিতে হয়।
সেখানে অবশ্য এমন ছবি দিয়েছি যেখানে শুধু আমার মুখটা দেখা যাচ্ছে।
গলা, চুল সবকিছু হিজাব দিয়ে ঢাকা।

সেক্ষেত্রে আমার কি গুনাহ হচ্ছে? যেহেতু অনেকজনই আমার ছবি দেখছে, আবার পরীক্ষার সময় যখন সিট ফেলে তখন পাশে ছেলে মানুষও বসে, এডমিট কার্ডে আমার ছবি থাকায় ছেলেটিও আমার ছবি দেখে ফেলে। যখন টিচার সিগনেচার করতে আসে তখনও আমার ছবি দেখে ফেলে।
এতে কি আমার গুনাহ হচ্ছে?

Answer

উত্তরের সূচনা

بسم الله الرحمن الرحيم

আলহামদুলিল্লাহ ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি একজন মুসলিম ছাত্রী হিসেবে কলেজ/ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার প্রয়োজনে ছবি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। আসুন আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।


কুরআন ও হাদিসের আলোকে পর্দার বিধান

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ...

"আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে পড়ে তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের পুত্র, বোনের পুত্র, নিজেদের স্ত্রীলোক, নিজেদের অধিকারভুক্ত দাসী, পুরুষদের মধ্যে যারা স্ত্রী-সম্পর্কে আসক্ত নয়, অথবা এমন বালক যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অবগত হয়নি—এদের ছাড়া।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

আল্লাহ আরও বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

"হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, আপনার কন্যা এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে, ফলে তাদেরকে কষ্ট দেওয়া হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)


হানাফি ফিকহের আলোকে নারীর ছবি ও পর্দার বিধান

১. নারীর চেহারা ও পর্দার বিধান

হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, নারীর সমগ্র দেহ সতর (আবরণীয়)। তবে চেহারা ও হাতের তালু পর্যন্ত (কব্জি পর্যন্ত) পরপুরুষের সামনে খোলা রাখার অনুমতি আছে, যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে। কিন্তু যখন ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তখন চেহারাও ঢেকে রাখা ওয়াজিব।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নারীর চেহারা ও হাতের তালু সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে তা ঢেকে রাখা ওয়াজিব। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/৪৬; রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)

২. ছবি তোলা ও ছবি দেওয়ার বিধান

ছবি তোলা বা ছবি দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো—ছবির মাধ্যমে যদি কোনো পরপুরুষের কাছে নারীর সৌন্দর্য প্রকাশ পায় বা ফিতনার কারণ হয়, তবে তা জায়েয নয়।

আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন:

"নারীর জন্য পরপুরুষের সামনে নিজের ছবি দেখানো বা প্রকাশ করা জায়েয নয়, কারণ এতে ফিতনার আশঙ্কা থাকে।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭০)

৩. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ছবি দেওয়ার বিধান

ইসলামে প্রয়োজনীয়তা (দারুরাত) ও প্রয়োজনের (হাজাত) ক্ষেত্রে কিছু শিথিলতা রয়েছে। তবে শর্ত হলো—সর্বনিম্ন পরিমাণে এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে তা করতে হবে।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর মতে:

"যদি কোনো নারীর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া বা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ছবি দেওয়া অপরিহার্য হয়, এবং সে ছবি সম্পূর্ণ পর্দার সাথে (হিজাবসহ) তোলা হয়, যাতে শুধুমাত্র চেহারা দেখা যায় এবং তা ফিতনার কারণ না হয়, তবে প্রয়োজনের তাগিদে সীমিত পরিমাণে তা জায়েয হতে পারে। তবে শর্ত হলো, ছবিটি যেন এমনভাবে না হয় যা দেখে ফিতনার আশঙ্কা থাকে।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৬/৪৫০-এর আলোকে)


আপনার প্রশ্নের বিশ্লেষণ

আপনি বলেছেন:

  1. আপনি কলেজ/ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার প্রয়োজনে ছবি দিতে বাধ্য হচ্ছেন
  2. ছবিতে আপনার শুধু মুখ দেখা যাচ্ছে
  3. গলা, চুল সবকিছু হিজাব দিয়ে ঢাকা
  4. এই ছবি অনেকেই দেখছে—সহপাঠী, শিক্ষক, পরীক্ষার সময় পাশের ছাত্র

বিশ্লেষণ:

প্রথমত: আপনি যে ছবিতে সম্পূর্ণ হিজাবসহ শুধু মুখ প্রকাশ করেছেন, এটি আপনার পর্দার প্রতি সচেতনতার পরিচয়। আপনি চুল, গলা, ঘাড় ইত্যাদি ঢেকে রেখেছেন—এটি প্রশংসনীয়।

দ্বিতীয়ত: হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, নারীর চেহারা পরপুরুষের সামনে খোলা রাখার অনুমতি আছে যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে। আপনার ছবিতে শুধু মুখ দেখা যাচ্ছে, যা হিজাবসহ—এটি ফিতনার কারণ হবে কি না, তা নির্ভর করে ছবির প্রকৃতির উপর।

তৃতীয়ত: যেহেতু এটি আপনার শিক্ষাজীবনের একটি অপরিহার্য প্রয়োজন (ভর্তি, পরীক্ষা, এডমিট কার্ড ইত্যাদির জন্য), তাই প্রয়োজনের তাগিদে এটি করা যেতে পারে। তবে কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে।


গুরুত্বপূর্ণ শর্তসমূহ

১. ছবিটি যেন সম্পূর্ণ পর্দার সাথে হয় — চুল, গলা, ঘাড়, কান ইত্যাদি যেন ঢাকা থাকে (আপনি ইতিমধ্যে এটি করছেন, আলহামদুলিল্লাহ)

২. ছবিটি যেন আকর্ষণীয় না হয় — ছবিতে যেন কোনো প্রকার সাজসজ্জা, মেকআপ বা আকর্ষণীয় ভঙ্গি না থাকে

৩. ছবিটি যেন শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত হয় — অপ্রয়োজনে ছবি প্রকাশ না করা

৪. ছবিটি যেন সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট না করা হয় — শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনেই দেওয়া

৫. যতটুকু সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করা — যেমন, ছবি যেন ছোট সাইজের হয়, যাতে স্পষ্টভাবে না দেখা যায়


ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়ার আলোকে

মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) ফাতাওয়া উসমানিতে উল্লেখ করেছেন:

"নারীদের জন্য পরপুরুষের সামনে নিজের ছবি দেখানো সাধারণত জায়েয নয়। তবে যদি কোনো বাধ্যতামূলক প্রয়োজনে (যেমন: পাসপোর্ট, ভর্তি ফর্ম, পরীক্ষার ফর্ম ইত্যাদি) ছবি দিতে হয়, এবং ছবিটি সম্পূর্ণ পর্দার সাথে তোলা হয়, তাহলে প্রয়োজনের তাগিদে সীমিত পরিমাণে তা জায়েয হতে পারে। তবে শর্ত হলো, ছবিটি যেন ফিতনার কারণ না হয় এবং যতটুকু সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫০-এর সারমর্ম)

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন:

"নারীর জন্য নিজের ছবি পরপুরুষকে দেখানো বা দেখার সুযোগ দেওয়া জায়েয নয়। কিন্তু যদি কোনো জরুরি প্রয়োজনে ছবি দিতে হয়, তাহলে পর্দার সাথে ছবি তোলা এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৯০-এর সারমর্ম)


আপনার গুনাহ হবে কি না—সরাসরি উত্তর

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো মেনে চলেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ আপনার গুনাহ হবে না:

  1. ছবিটি সম্পূর্ণ পর্দার সাথে তোলা (যা আপনি করেছেন)
  2. ছবিতে কোনো সাজসজ্জা বা আকর্ষণীয়তা নেই
  3. ছবিটি শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে
  4. ছবিটি দেখে ফিতনার আশঙ্কা নেই

তবে মনে রাখবেন: যদি ছবিটি দেখে কারো ফিতনার আশঙ্কা থাকে, অথবা ছবিটি এমনভাবে তোলা হয় যা আকর্ষণীয়, তাহলে গুনাহ হতে পারে। যেহেতু আপনি বলেছেন ছবিতে শুধু মুখ দেখা যাচ্ছে এবং সম্পূর্ণ হিজাবসহ, তাই সাধারণত ফিতনার আশঙ্কা কম।


কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ

১. ছবি তোলার সময় — ছবিটি যেন খুব কাছ থেকে না তোলা হয়, বরং দূর থেকে তোলা হলে মুখের বৈশিষ্ট্য তেমন স্পষ্ট বোঝা যাবে না

২. ছবির সাইজ — ছবিটি যত ছোট সাইজের সম্ভব, ততই ভালো (পাসপোর্ট সাইজই যথেষ্ট)

৩. ছবি ব্যবহারের পর — প্রতিষ্ঠানের কাজ শেষ হলে ছবিটি যেন অপসারণের চেষ্টা করা হয়

৪. দুআ করা — আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি আপনার এই বাধ্যবাধকতা দূর করে দেন এবং সহজ উপায় বের করে দেন

৫. যতটুকু সম্ভব এড়িয়ে চলা — যদি কোনোভাবে ছবি ছাড়া কাজ করা সম্ভব হয়, তবে তা করাই উত্তম


উপসংহার

ইসলাম ধর্ম সহজ এবং বাস্তবসম্মত। যখন কোনো নারী শিক্ষার প্রয়োজনে ছবি দিতে বাধ্য হন, এবং তিনি সম্পূর্ণ পর্দার সাথে ছবি তোলেন, শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ তা ক্ষমার যোগ্য। তবে সর্বদা চেষ্টা করতে হবে যেন পর্দার বিধান লঙ্ঘন না হয় এবং ফিতনার কারণ না হয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং পর্দার বিধান মেনে চলার তাওফিক দিন। আমিন।

وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ

(আল্লাহই সর্বাধিক সঠিক জানেন)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.