ইসলামে পর্দার বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। কুরআন-হাদিসের আলোকে পর্দার গুরুত্ব।

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 3521
Questioner: Amatullah
Question Asked: 05 Aug 2026, 01:29 PM
Reviewed & Published: 05 Aug 2026, 01:44 PM
Views: 11
Tokens: 5,147
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

পর্দা শুরু করতে চাওয়া একজন বোনের প্রশ্ন:

পর্দার বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই। কুরআন হাদিসের ব্যাখ্যাসহ। তাকওয়ার পর্দা কেমন হওয়া উচিত যেটা আল্লাহ তায়ালার কাছে হবে সবচেয়ে পছন্দীয়।

Answer

পর্দার বিধান: কুরআন-হাদিসের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা

প্রশ্নকারিণী: আমাতুল্লাহ
বিষয়: পর্দার বিধান ও তাকওয়ার পর্দা


ভূমিকা

পর্দা ইসলামের একটি মৌলিক বিধান এবং নারীর ইজ্জত-সম্মানের প্রতীক। এটি শুধুমাত্র একটি পোশাক-আশাকের বিষয় নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যা সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কুরআন ও হাদিসে পর্দার বিধান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।


কুরআনে পর্দার বিধান

১. সূরা আন-নূর (২৪:৩০-৩১)

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ

"মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। এটাই তাদের জন্য পবিত্রতম। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কাজ সম্পর্কে সম্যক অবগত।" (সূরা আন-নূর: ৩০)

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ ۖ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ ۚ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায় তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে (যাতে তাদের ঘাড়, বুক ও কান ঢাকা থাকে)। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের পুত্র, বোনের পুত্র, নিজেদের নারীদের, নিজেদের অধীনস্থ দাসীদের, পুরুষদের মধ্যে যারা স্ত্রী-কামনা করে না, অথবা শিশুদের যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অবগত নয়—এদের ছাড়া কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজেদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য জোরে পা না ফেলে। হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

২. সূরা আল-আহযাব (৩৩:৫৯)

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

"হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, আপনার কন্যাগণ এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে, ফলে তাদেরকে কষ্ট দেওয়া হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)

৩. সূরা আল-আহযাব (৩৩:৩৩)

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ

"আর তোমরা নিজ নিজ গৃহে অবস্থান কর এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের যুগের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন করো না।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)


হাদিসে পর্দার বিধান

১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتْ مِنْ بَيْتِهَا اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ

"নারী সম্পূর্ণরূপে গোপনীয় (সতর)। যখন সে ঘর থেকে বের হয়, তখন শয়তান তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।" (তিরমিজি: ১১৭৩)

২. হযরত উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত

إِذَا كَانَتْ لِإِحْدَاكُنَّ مُكَاتَبٌ وَكَانَ لَهُ مَا يُؤَدِّي فَلْتَحْتَجِبْ مِنْهُ

"যখন তোমাদের কারো মুকাতাব (ক্রয়মুক্তির চুক্তিতে আবদ্ধ দাস) থাকে এবং তার কাছে আদায়ের সামর্থ্য থাকে, তবে সে যেন তার থেকে পর্দা করে।" (আবু দাউদ: ৩৯৩৩)

৩. হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত

لَمَّا نَزَلَتْ آيَةُ الْحِجَابِ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا لِي وَلَكُمْ يَا بَنَاتَ الْبَحْرِ؟

"যখন পর্দার আয়াত নাজিল হলো, তখন নবী (সা.) বললেন: 'আমার সাথে তোমাদের কী সম্পর্ক, হে সমুদ্রের কন্যারা?'" (বুখারি)


তাকওয়ার পর্দা: সর্বোত্তম পর্দা

তাকওয়ার পর্দা বলতে বুঝায়—শুধুমাত্র বাহ্যিক পোশাক দিয়ে শরীর ঢাকা নয়, বরং অন্তরের পবিত্রতা, চরিত্রের পবিত্রতা এবং আল্লাহভীতির মাধ্যমে নিজেকে সংরক্ষণ করা।

তাকওয়ার পর্দার বৈশিষ্ট্য:

১. অন্তরের পর্দা: আল্লাহ তায়ালা বলেন:

يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ

"হে আদম সন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাজিল করেছি যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকে এবং সৌন্দর্যের জন্যও। আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম।" (সূরা আল-আ'রাফ: ২৬)

২. দৃষ্টির পর্দা:

  • চোখকে হারাম দৃষ্টি থেকে বিরত রাখা
  • অন্যদের প্রতি আকর্ষণীয় দৃষ্টি না দেওয়া
  • নিজের সৌন্দর্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বের না হওয়া

৩. আচরণের পর্দা:

  • কথা বলার সময় নম্র ও সংযত থাকা
  • অপ্রয়োজনে উচ্চস্বরে কথা না বলা
  • অন্যদের সাথে সীমিত ও শালীন আচরণ করা

৪. গৃহের পর্দা:

  • অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়া
  • বের হলে সম্পূর্ণ পর্দা মেনে চলা
  • গৃহে অবস্থানকে প্রাধান্য দেওয়া

হানাফি ফিকহের আলোকে পর্দার বিধান

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে:

নারীর সতর (ঢাকতে হবে এমন অংশ):

  • নামাজের ক্ষেত্রে: হাতের কব্জি, পায়ের পাতা এবং চেহারা ছাড়া সমগ্র শরীর
  • অমুসলিম নারীর সামনে: সমগ্র শরীর (চেহারা ও হাতের কব্জি ছাড়া)
  • বেগানা পুরুষের সামনে: সমগ্র শরীর (চেহারা ও হাতের কব্জি ছাড়া)

ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে:

  • বেগানা পুরুষের সামনে চেহারা ও হাতের কব্জি ঢাকাও আবশ্যক (ফিতনার আশঙ্কায়)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.)-এর মত:

রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:

وَفِي زَمَانِنَا صَارَ عَوْرَةَ الْمَرْأَةِ الْوَجْهُ وَالْكَفَّانِ لِكَثْرَةِ الْفِسْقِ

"আমাদের সময়ে নারীর চেহারা ও হাতের কব্জিও সতরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে, কারণ ফাসেকি ব্যাপকতা লাভ করেছে।" (রদ্দুল মুহতার, ২/৩৭৯)


পর্দার শর্তসমূহ

১. পোশাকের শর্ত:

  • সমগ্র শরীর ঢেকে রাখে এমন হওয়া
  • পাতলা ও স্বচ্ছ নয়
  • শরীরের গঠন প্রকাশ করে না
  • আকর্ষণীয় ও দৃষ্টি আকর্ষণকারী নয়
  • পুরুষের পোশাকের মতো নয়
  • সুগন্ধিযুক্ত নয় (বাইরে যাওয়ার সময়)

২. আচরণের শর্ত:

  • দৃষ্টি নত রাখা
  • কণ্ঠস্বর সংযত রাখা
  • অপ্রয়োজনে কথা না বলা
  • পুরুষের সাথে সীমিত ও শালীন আচরণ

৩. গতিবিধির শর্ত:

  • অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়া
  • বের হলে সম্পূর্ণ পর্দা মেনে চলা
  • এমন পথে চলা যা নিরাপদ

পর্দার উপকারিতা

১. আত্মসম্মান রক্ষা: পর্দা নারীর মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করে ২. সমাজে শান্তি: পর্দা সমাজে ফিতনা-ফাসাদ কমায় ৩. পারিবারিক স্থিতিশীলতা: পর্দা পারিবারিক বন্ধন মজবুত করে ৪. আধ্যাত্মিক উন্নতি: পর্দা তাকওয়া ও আল্লাহভীতি বৃদ্ধি করে ৫. নিরাপত্তা: পর্দা নারীকে হয়রানি ও নির্যাতন থেকে রক্ষা করে


পর্দা শুরু করার ব্যবহারিক পরামর্শ

১. ধীরে ধীরে অভ্যাস করুন: একদিনে সবকিছু পরিবর্তন করার চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে পর্দা মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলুন ২. নিয়ত শুদ্ধ করুন: আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই পর্দা করুন ৩. পরিবারকে জানান: পরিবারের সদস্যদের সাথে পর্দার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করুন ৪. সাহাবীদের জীবনী পড়ুন: সাহাবী ও সাহাবিয়াদের পর্দার আদর্শ সম্পর্কে জানুন ৫. দোয়া করুন: আল্লাহর কাছে পর্দা মেনে চলার তাওফিক প্রার্থনা করুন


উপসংহার

পর্দা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান যা কুরআন, হাদিস এবং ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। তাকওয়ার পর্দা হলো সেই পর্দা যা শুধুমাত্র শরীর ঢাকাই নয়, বরং অন্তর, দৃষ্টি, আচরণ ও চরিত্রকেও পবিত্র রাখে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ

"আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম।" (সূরা আল-আ'রাফ: ২৬)

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সঠিকভাবে পর্দা মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।


দলিলসমূহ:

  • সূরা আন-নূর: ৩০-৩১
  • সূরা আল-আহযাব: ৩৩, ৫৯
  • সূরা আল-আ'রাফ: ২৬
  • তিরমিজি: ১১৭৩
  • আবু দাউদ: ৩৯৩৩
  • রদ্দুল মুহতার: ২/৩৭৯
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া
  • বাহিশতি জেওর

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.