ইসলামী শরিয়তের আলোকে সৎ ভাই-বোনের সম্পর্ক।
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
একটি বিষয়ে শরিয়তের সঠিক বিধান জানতে চাই।
একজন মেয়ের মা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তার নতুন স্বামীর আগের সংসারের একজন ছেলে আছে। অর্থাৎ, ছেলে ও মেয়ের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক বা দুধ-সম্পর্ক নেই; তারা শুধু বাবা-মায়ের বিয়ের কারণে সৎ ভাই-বোন হিসেবে পরিচিত।
এছাড়া তাদের সঙ্গে আরও ৬ জন মহিলা কাজিন রয়েছে। অর্থাৎ, মোট ৮ জনের একটি দল—১ জন পুরুষ (উক্ত সৎ ভাই) এবং ৭ জন নারী (সৎ বোন ও ৬ জন মহিলা কাজিন)। সকল কাজিনই মেয়ে এবং তারা ওই ছেলের চেয়ে বয়সে বড়।
তারা সিলেট থেকে ঢাকা হয়ে কক্সবাজারে ট্যুরে যেতে চান।
এখানে একটি বিষয় হলো, ৭ জন নারীর মধ্যে শুধুমাত্র একজন (সৎ বোন) নিয়মিত পর্দা মেনে চলেন। বাকি ৬ জন কাজিন সাধারণভাবে পর্দা মেনে চলেন না। তবে সফরে কোনো অবাধ মেলামেশা, নির্জনে (খালওয়া) থাকা বা অনৈতিক কার্যকলাপের পরিকল্পনা নেই।
এ অবস্থায় জানতে চাই—
১. উক্ত সৎ ভাই কি শরিয়তের দৃষ্টিতে ওই মেয়ের মাহরাম, নাকি গায়রে মাহরাম?
২. তাদের মধ্যে বিয়ে কি শরিয়ত অনুযায়ী জায়েজ?
৩. এই পরিস্থিতিতে সিলেট–ঢাকা–কক্সবাজারের মতো দীর্ঘ সফরে একসঙ্গে যাওয়া কি জায়েজ হবে?
৪. যদি জায়েজ না হয়, তাহলে এর শরয়ি কারণ কী?
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
১. সৎ ভাই কি মাহরাম?
উত্তর: না, উক্ত সৎ ভাই ওই মেয়ের জন্য গায়রে মাহরাম (অ-মাহরাম)। ইসলামী শরিয়তে মাহরাম সম্পর্ক শুধুমাত্র রক্তের সম্পর্ক, দুধ-সম্পর্ক (রাদা'আ) এবং বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। সৎ ভাই (step-brother) এই তিনটি শ্রেণীর কোনোটিেই পড়ে না।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে মাহরামদের তালিকা উল্লেখ করেছেন:
"নিষিদ্ধ করা হলো তোমাদের জন্যে তোমাদের মাতা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের ভগ্নী, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভাইয়ের কন্যা, বোনের কন্যা, দুধ-মাতা, দুধ-বোন, স্ত্রীর মাতা..." (সূরা আন-নিসা: ২৩)
এই আয়াতে সৎ-ভাই বা সৎ-বোনের কথা উল্লেখ নেই। ইমাম ইবনে কাসির (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, মাহরাম কেবলমাত্র রক্ত সম্পর্ক, বৈবাহিক সম্পর্ক এবং দুধ সম্পর্কের মাধ্যমেই হয়।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন: "সৎ-ভাই বা সৎ-বোন মাহরাম নয়, কারণ আল্লাহ তা'আলা কুরআনে মাহরামদের তালিকা উল্লেখ করেছেন এবং সৎ-ভাই/বোনকে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করেননি।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ৩২/৪৫)
শায়খ ইবনে বায (রহঃ) বলেন: "যে ব্যক্তি কোনো নারীর মাকে বিয়ে করে, সে নারীর জন্য সে মাহরাম হয় না। বরং সে তার জন্য গায়রে মাহরাম, যতক্ষণ না তার সাথে তার (মেয়ের) বিয়ে হয় বা দুধ-সম্পর্ক থাকে।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায, ২২/৩০৫)
২. তাদের মধ্যে বিয়ে কি জায়েজ?
উত্তর: হ্যাঁ, সৎ ভাই ও সৎ বোনের মধ্যে বিয়ে জায়েজ। কারণ তারা রক্ত সম্পর্ক, দুধ-সম্পর্ক বা বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে মাহরাম নয়। কুরআনে যে সকল নারীকে বিয়ে করা হারাম করা হয়েছে, সৎ-বোন তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন: "সৎ-বোনকে বিয়ে করা জায়েজ, কারণ আল্লাহ তা'আলা কুরআনে যাদেরকে বিয়ে করা হারাম করেছেন তাদের তালিকায় সৎ-বোনকে উল্লেখ করেননি।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ৩২/৪৫)
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহঃ) বলেন: "সৎ-ভাই ও সৎ-বোনের মধ্যে বিয়ে জায়েজ, কারণ তারা পরস্পর মাহরাম নয়। তবে শর্ত হলো, তারা একসাথে বড় হওয়ার কারণে যদি তাদের মধ্যে কোনো দুধ-সম্পর্ক (রাদা'আ) প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলে তা ভিন্ন কথা।" (আশ-শারহুল মুমতি', ১২/২৪৫)
৩. দীর্ঘ সফরে একসঙ্গে যাওয়া কি জায়েজ?
উত্তর: না, এই সফর জায়েজ নয়। কারণ:
১. সৎ ভাই ও সৎ বোন পরস্পর গায়রে মাহরাম — তাদের একসাথে সফর করা জায়েজ নয়। ২. ৬ জন মহিলা কাজিনও গায়রে মাহরাম — তারা উক্ত পুরুষের জন্য মাহরাম নয়। ৩. সফরে একসাথে থাকা খালওয়া (একান্ত নির্জনতা) এর অন্তর্ভুক্ত — যদিও তারা দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করছে, তবুও একজন অ-মাহরাম পুরুষের সাথে অ-মাহরাম নারীদের একসাথে সফর করা শরিয়তে নিষিদ্ধ।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন কোনো মহিলার সাথে এমন অবস্থায় একাকী না থাকে যেখানে তার সাথে তার মাহরাম নেই। কারণ, তাদের তৃতীয়জন হলো শয়তান।" (সহীহ বুখারী: ৩০০৬; সহীহ মুসলিম: ১৩৪১)
শায়খ আল-আলবানী (রহঃ) বলেন: "মহিলার জন্য অ-মাহরাম পুরুষের সাথে সফর করা হারাম, যদিও সফরটি দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত হোক। কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'কোনো মহিলা যেন এমন অবস্থায় সফর না করে যেখানে তার সাথে মাহরাম নেই।'" (সিলসিলাতুল আহাদিস আস-সহীহাহ, ১/৪৪৩)
শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন: "মহিলার জন্য অ-মাহরাম পুরুষের সাথে সফর করা জায়েজ নয়, যদিও সফরটি ছোট হয়। কারণ নবী (ﷺ) বলেছেন, 'কোনো পুরুষ যেন কোনো মহিলার সাথে একাকী না থাকে এবং কোনো মহিলা যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে।'" (আল-মুনতাকা, ৫/৩৩০)
৪. যদি জায়েজ না হয়, তাহলে এর শরয়ি কারণ কী?
উত্তর: এর শরয়ি কারণ হলো:
ক. অ-মাহরামের সাথে সফর নিষিদ্ধ: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"কোনো মহিলার জন্য আল্লাহ ও আখিরাতের দিনের উপর ঈমান রেখে মাহরাম ছাড়া সফর করা হালাল নয়।" (সহীহ বুখারী: ১০৩৬; সহীহ মুসলিম: ১৩৩৯)
খ. খালওয়া (একান্ত নির্জনতা) নিষিদ্ধ: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"সাবধান! কোনো পুরুষ যেন কোনো মহিলার সাথে একাকী না থাকে, কারণ তাদের তৃতীয়জন শয়তান।" (সুনানে তিরমিযী: ২১৬৫; সহীহ)
গ. ফিতনার আশঙ্কা: অ-মাহরাম পুরুষ ও নারীর একসাথে সফর ফিতনার কারণ। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন: "অ-মাহরাম পুরুষ ও নারীর একত্রে সফর করা হারাম, কারণ এটি ফিতনার দরজা খুলে দেয় এবং শয়তানের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ১৫/৩৭৫)
ঘ. পর্দার বিধান লঙ্ঘন: আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের যুগের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন করো না।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
সমাধান
এই সফর জায়েজ হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে:
১. প্রতিটি নারীর সাথে তার নিজস্ব মাহরাম থাকতে হবে (যেমন: পিতা, ভাই, চাচা, মামা, স্বামী ইত্যাদি)। ২. সৎ ভাই এই দলে থাকলে, তার সাথে কোনো নারী একা থাকতে পারবে না। ৩. যদি সৎ ভাই না যায় এবং প্রতিটি নারীর নিজ নিজ মাহরাম থাকে, তাহলে সফর জায়েজ হতে পারে। ৪. মহিলাদের জন্য পর্দা (হিজাব) বাধ্যতামূলক — সফরে থাকা অবস্থায়ও।
মহিলাদের জন্য সফরের শর্ত: শায়খ ইবনে বায (রহঃ) বলেন: "মহিলার জন্য সফর জায়েজ নয়, যতক্ষণ না তার সাথে তার মাহরাম থাকে। এটি নবী (ﷺ) এর সুস্পষ্ট হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায, ২২/৩০৫)
উপসংহার: উক্ত পরিস্থিতিতে সৎ ভাই ও ৭ জন নারীর একসাথে সফর করা জায়েজ নয়। সৎ ভাই তাদের জন্য গায়রে মাহরাম। প্রতিটি নারীর নিজ নিজ মাহরাম ছাড়া এই সফর করা হারাম। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।