স্বামীর পছন্দ নয়, এমতাবস্থায় অনলাইনে দ্বীনি কোর্স করা কি যাবে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নকারী সম্মানিত বোন, আপনার দ্বীনি শিক্ষার আগ্রহ ও আন্তরিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়। আল্লাহ তাআলা আপনার এই ইলম অন্বেষণের নিয়তকে কবুল করুন এবং এতে বরকত দান করুন। আপনার স্বামীর দ্বীনের বুঝ থাকা সত্ত্বেও যদি তিনি আপনার অনলাইন কোর্স করতে নিষেধ করেন, তাহলে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
১. স্বামীর আনুগত্য ও স্ত্রীর দায়িত্ব
ইসলামে স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তবে এ আনুগত্য কেবলমাত্র সেসব বিষয়ে জরুরি, যা শরীয়তের বিধানের পরিপন্থী নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"কোনো সৃষ্টির আনুগত্য স্রষ্টার নাফরমানীতে জায়েয নয়।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৪০)
অর্থাৎ, স্বামী যদি স্ত্রীকে কোনো হারাম কাজের আদেশ দেন বা হালাল কাজ থেকে নিষেধ করেন, তাহলে তার আনুগত্য করা জরুরি নয় বরং সেটি জায়েয নয়।
২. ফরজে আইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা
ফরজে আইন ও কুরআন নাজেরা শিক্ষা করা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর জন্য মৌলিক কর্তব্য। বিশেষ করে কুরআন নাজেরা (সঠিকভাবে কুরআন তিলাওয়াত শেখা) হলো ফরজে আইন। হাদিসে এসেছে:
"তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি সেই, যে কুরআন শেখে এবং অন্যদের শেখায়।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭)
সুতরাং, এটি এমন একটি ইবাদত যা স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়াও জরুরি হতে পারে।
৩. স্বামীর নিষেধাজ্ঞার কারণ বিশ্লেষণ
আপনার স্বামী যদি শুধুমাত্র সময় (রাত ১০টার পর) বা অনলাইন মাধ্যমের প্রতি তার আপত্তি জানান, তাহলে এটি একটি যৌক্তিক উদ্বেগ হতে পারে। যেমন:
- রাতের বেলা নারীদের জন্য পৃথকভাবে বসে ক্লাস করা নিরাপত্তার দিক থেকে উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।
- স্বামী হয়তো চান যে আপনি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান বা আপনার অন্যান্য দায়িত্ব পালন করুন।
তবে স্বামীর এই আপত্তি যদি দ্বীনের প্রতি উদাসীনতা বা অমূলক অপছন্দের কারণে হয়, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু আপনাকে তার উদ্বেগ বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
৪. সমাধানের পথ
উপরোক্ত পরিস্থিতিতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারেন:
(ক) স্বামীর সাথে সমঝোতার চেষ্টা করুন:
তাকে বোঝান যে এই কোর্সগুলো আপনার ইমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তিনি যদি দ্বীনের বুঝ রাখেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ তিনি বুঝতে পারবেন। সময়ের ব্যাপারে যদি আপত্তি থাকে, তাহলে রাতের পরিবর্তে দিনের বেলায় ক্লাস করার চেষ্টা করুন।
(খ) রেকর্ডেড ক্লাস গ্রহণ করুন:
আপনার যদি রাত ১০টার পর ক্লাসে অংশ নেওয়াই একমাত্র উপায় হয়, তাহলে লাইভ ক্লাসের পরিবর্তে রেকর্ডেড ক্লাস করার ব্যবস্থা করুন। এটি স্বামীর আপত্তির সমাধান হতে পারে।
(গ) স্বামীর অনুমতি নিয়ে চলুন:
হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ 'রদ্দুল মুহতার' (খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৬৪) এবং 'ফাতাওয়া হিন্দিয়া' (খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৩৯) অনুযায়ী, স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘর থেকে বের হওয়া বা এমন কাজ করা যা স্বামীর অধিকারকে প্রভাবিত করে, তা জায়েয নয়। তবে এখানে শিক্ষাগ্রহণ স্বামীর অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তবুও উত্তম হলো স্বামীকে রাজি করিয়ে তার সন্তুষ্টির সাথে কোর্স চালিয়ে যাওয়া।
৫. স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও কোর্স করলে গুনাহ হবে কি?
যদি আপনার স্বামী অমূলক কারণে (যেমন: দ্বীনের বিরোধিতা না করে শুধু ব্যক্তিগত অপছন্দ) আপনাকে ফরজে আইন শিক্ষা থেকে বিরত রাখেন, তাহলে তার নিষেধ মান্য করা আপনার জন্য জরুরি নয়। তবে উত্তম হলো তার সাথে আলোচনা করে সমাধান বের করা। যদি তিনি স্পষ্টতই আপনাকে দ্বীনের শিক্ষা থেকে বিরত রাখতে চান এবং আপনি তার নিষেধ অমান্য করে শিক্ষা গ্রহণ করেন, তাহলে আশা করা যায় যে আপনার জন্য এটি গুনাহ হবে না। বরং আপনি দ্বীনের ফরজ পালনের সওয়াব পাবেন। তবে ঝগড়া বা সম্পর্কের অবনতি এড়াতে যতটা সম্ভব সৌহার্দ্যপূর্ণ উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
সারকথা:
- স্বামীর সাথে বিনীতভাবে আলোচনা করে তাকে দ্বীনি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝান।
- সময় পরিবর্তন বা রেকর্ডেড ক্লাসের মাধ্যমে তার আপত্তির সমাধান করুন।
- যদি তিনি অমূলক কারণে নিষেধ করেন এবং আপনার ফরজ পালনে বাধা দেন, তাহলে তার অনুমতি ছাড়াই কোর্স চালিয়ে যেতে পারেন, তবে সতর্কতা অবলম্বন করুন (যেমন: দিনের বেলা ক্লাস করা)।
- সম্পর্কের মধ্যে শান্তি বজায় রাখতে চেষ্টা করুন। ঝগড়ার চেয়ে ধৈর্য ও সদালাপের মাধ্যমে সমাধান খুঁজুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্বীনের পথে অটল রাখুন এবং আপনার স্বামীকে দ্বীনের গুরুত্ব বোঝার তাওফিক দান করুন। (আমিন)
রেফারেন্স:
- সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭
- সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৪০
- রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৬৪
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৩৯
- বাহিশতি জেওর, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২২-২৩