সুদী ব্যাংকের সাথে জড়িত ব্যক্তির খাবার খাওয়ার বিধান
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী বোন,
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই:
প্রথমত: আপনার বোনের স্বামীর আয়ের উৎস আপনি বলেছেন, আপনার বোনের স্বামী জনতা ব্যাংকের জিএম ছিলেন। এখন তিনি অবসর নিয়েছেন এবং পেনশন পান। তিনি গাড়ি ও বাসের সাথে যুক্ত থেকে ব্যবসা করেন।
এখানে মূল বিষয় হলো:
- ব্যাংকে চাকরি করা নিজেই হারাম নয়, তবে সুদভিত্তিক লেনদেনে জড়িত থাকা হারাম।
- পেনশনের টাকা তার চাকরির প্রাপ্য অধিকার, যা হালাল হতে পারে যদি তার চাকরি সম্পূর্ণ হালাল উপায়ে হয়। তবে ব্যাংকের জিএম হিসেবে তিনি সুদভিত্তিক লেনদেনের সাথে জড়িত ছিলেন, যা একটি গুনাহের কাজ।
- এখন তিনি গাড়ি-বাসের ব্যবসা করেন, যা হালাল ব্যবসা হতে পারে। তবে সেই ব্যবসার টাকায় যদি সুদের মিশ্রণ থাকে, তাহলে সেটা সন্দেহযুক্ত (মুশতাবিহ) হবে।
দ্বিতীয়ত: আপনার করণীয় আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, তাদের বাড়িতে খাওয়া, পানি ব্যবহার করা ইত্যাদি জায়েজ হবে কি না?
এখানে ইসলামী নীতিমালা হলো:
- কোনো ব্যক্তির আয়ের উৎস যদি সম্পূর্ণ হারাম হয় (যেমন: শুধু সুদ, ঘুষ, চুরি), তাহলে তার দেওয়া খাবার খাওয়া বা তার সাথে লেনদেন করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
- কিন্তু যদি তার আয়ে হালাল ও হারাম উভয়ই মিশ্রিত থাকে, তাহলে সেটা "মুশতাবিহ" (সন্দেহযুক্ত) হিসেবে গণ্য হবে। এই অবস্থায় খাওয়া জায়েজ আছে, তবে তাকওয়া ও পরহেজগারির দৃষ্টিকোণ থেকে বিরত থাকা উত্তম।
তৃতীয়ত: আপনার বাবার অসুস্থতা আপনার বাবা অসুস্থ এবং তাকে ডাক্তার দেখানো জরুরি। এই অবস্থায় আপনি যদি তাদের বাড়িতে না গিয়ে অন্য কোনো ব্যবস্থা করতে পারেন (যেমন: অন্য কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে থাকা, হাসপাতালে ভর্তি করা, বা নিজ বাড়িতে থেকে চিকিৎসা করানো), তাহলে সেটাই উত্তম। কিন্তু যদি কোনো উপায় না থাকে এবং বাবার চিকিৎসার জন্যই সেখানে যাওয়া জরুরি হয়, তাহলে প্রয়োজনের তাগিদে সেখানে থাকা এবং খাওয়া জায়েজ হবে, ইনশাআল্লাহ।
চতুর্থত: আপনার করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা
১. বাবার চিকিৎসা: আপনার বাবার চিকিৎসা করানো আপনার জন্য জরুরি। যদি তাদের বাড়িতে যাওয়াই একমাত্র উপায় হয়, তাহলে আপনি যেতে পারেন। তবে চেষ্টা করুন অন্য কোনো ব্যবস্থা করার।
২. খাওয়া-দাওয়া: তাদের বাড়িতে খাওয়ার ব্যাপারে ইসলামী নীতি হলো—যদি আপনি নিশ্চিত না হন যে তাদের আয় সম্পূর্ণ হারাম, তাহলে খাওয়া জায়েজ। তবে উত্তম হলো, নিজে রান্না করে খাওয়া বা বাইরে থেকে খাবার আনা, যাতে সন্দেহ থেকে বাঁচা যায়।
৩. পানির ব্যবহার: পানি ব্যবহার করা (যেমন: অজু, গোসল, পানি পান) কোনো সমস্যা নেই, কারণ পানি সাধারণত পবিত্র ও হালাল।
৪. পরিবারের সাথে কথা বলা: আপনি যদি মনে করেন তাদের বাড়িতে যাওয়া আপনার জন্য সমস্যার কারণ হচ্ছে, তাহলে পরিবারের সাথে নরম ভাষায় কথা বলুন। তবে মনে রাখবেন, বাবার চিকিৎসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পঞ্চমত: একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনি বলেছেন, "বাবার অসুস্থ হুজুর গিরি দেখায়, কাদের কাছে পড়ি গোটা দেয়" — এটি একটি কুসংস্কার বা শিরকী কাজ হতে পারে। ইসলামে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। বাবার চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত। কোনো "হুজুর" বা "পীর" এর কাছে পড়ি-গোটা দেওয়া বা তাবিজ-কবজ ব্যবহার করা ইসলামসম্মত নয়, যদি তা কুসংস্কার বা শিরকের পর্যায়ে হয়।
সারসংক্ষেপে আপনার করণীয়:
১. বাবার চিকিৎসা করান — এটি সবচেয়ে জরুরি। ২. যদি তাদের বাড়িতে যাওয়া ছাড়া উপায় না থাকে, তাহলে যেতে পারেন। তবে চেষ্টা করুন নিজের খাবার নিজে রান্না করে খাওয়ার। ৩. তাদের আয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত না হলে খাওয়া জায়েজ, তবে তাকওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে সতর্ক থাকুন। ৪. কুসংস্কার ও শিরকী কাজ থেকে বিরত থাকুন এবং বাবার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। ৫. পরিবারের সাথে নরম ভাষায় কথা বলুন এবং তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার বাবাকে সুস্থতা দান করুন এবং আপনার পরিবারকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- সূরা আল-বাকারা: ২৭৫ (সুদের হারাম হওয়া প্রসঙ্গে)
- সূরা আল-মায়িদা: ৫ (হালাল-হারাম খাদ্য প্রসঙ্গে)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৯ম খণ্ড, ৪০৫-৪০৬ পৃষ্ঠা (মুশতাবিহ আয় সম্পর্কে)
- ফাতাওয়া উসমানী: ২য় খণ্ড, ৩৪৫ পৃষ্ঠা (সন্দেহযুক্ত আয়ের খাবার খাওয়া প্রসঙ্গে)
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): ১ম খণ্ড, ২৩০-২৩৫ পৃষ্ঠা (হালাল-হারাম প্রসঙ্গে)