ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী ফুল, ফল, প্রাকৃতিক দৃশ্য, ক্রাফটিং ও টেক্সচার আর্ট করা জায়েজ কি না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
ফুল ফল বিভিন্ন দৃশ্য আকা বা ক্রাফিটিং করা বা টেক্সচার আর্ট করা কি হারাম?(প্রানীর ছবি বাদে)
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি জানতে চেয়েছেন ফুল, ফল, বিভিন্ন দৃশ্য আঁকা, ক্রাফটিং বা টেক্সচার আর্ট করা জায়েজ কি না (প্রাণীর ছবি বাদে)।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, প্রাণী বা মানুষের ছবি বাদে ফুল, ফল, গাছপালা, প্রাকৃতিক দৃশ্য, নিস্প্রাণ বস্তু ইত্যাদি আঁকা, ক্রাফটিং করা বা টেক্সচার আর্ট করা জায়েজ (বৈধ) এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। তবে শর্ত হলো, ছবিগুলো এমন না হতে হবে যা 'মূর্তি' বা 'প্রতিমা' হিসেবে পূজিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, এবং সেগুলো কোনো হারাম কাজে ব্যবহৃত না হয়।
বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:
১. কুরআন ও হাদিসের মূলনীতি: ইসলামে ছবি আঁকার যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তা মূলত প্রাণবন্ত প্রাণী (মানুষ ও প্রাণী) আঁকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ, হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি প্রাণবন্ত সত্তার ছবি আঁকে, তাকে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হবে "তুমি যা সৃষ্টি করেছ, তাতে প্রাণ দাও" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৫৭)।
তবে ফুল, ফল, গাছ, পাহাড়, নদী, সূর্য, চাঁদ, জাহাজ, ঘরবাড়ি ইত্যাদি নিস্প্রাণ বস্তু আঁকার ব্যাপারে হাদিসে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এগুলোকে আরবিতে "মা লা রূহা লাহু" (যার প্রাণ নেই) বলা হয়।
২. হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত:
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, প্রাণবন্ত প্রাণীর ছবি আঁকা হারাম, কিন্তু নিস্প্রাণ বস্তুর ছবি আঁকা জায়েজ।
-
ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, এমনকি প্রাণবন্ত প্রাণীর ছবিও যদি এমন জায়গায় থাকে যেখানে সম্মান দেখানো হয় না (যেমন: মেঝেতে, বালিশে, কার্পেটে), তাহলে তা মাকরুহে তানযিহি (অপছন্দনীয়) হবে, তবে হারাম নয়। কিন্তু দেয়ালে, পর্দায় বা উঁচু স্থানে ঝুলানো হারাম। (রদ্দুল মুহতার, ৬তম খণ্ড, ৩৭৯-৩৮০ পৃষ্ঠা)
-
ফাতাওয়া আলমগীরি (হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থ)-এ উল্লেখ আছে:
"যে ছবিতে প্রাণ নেই (যেমন: গাছ, ফুল, নদী ইত্যাদি) তা আঁকা বা তৈরি করা জায়েজ।" (ফাতাওয়া আলমগীরি, ৫ম খণ্ড, ৩৫৭ পৃষ্ঠা)
- ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ লিখেছেন:
"ফুল, ফল, গাছপালা, নিস্প্রাণ বস্তুর ছবি আঁকা সর্বসম্মতভাবে জায়েজ।" (রদ্দুল মুহতার, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩৭৯ পৃষ্ঠা)
৩. ফুল-ফল ও দৃশ্যের ছবি আঁকার বিধান: যেহেতু ফুল, ফল, প্রাকৃতিক দৃশ্য, টেক্সচার আর্ট ইত্যাদি প্রাণবন্ত সত্তা নয়, তাই এগুলো আঁকা, ক্রাফটিং করা, পেইন্টিং করা সম্পূর্ণ জায়েজ। এতে কোনো প্রকার গুনাহ নেই। বরং এটি একটি বৈধ শিল্প এবং পেশা হতে পারে।
৪. গুরুত্বপূর্ণ শর্তসমূহ: যদিও এগুলো জায়েজ, তবুও কিছু শর্ত মেনে চলা জরুরি:
- ছবিগুলো এমন জায়গায় ব্যবহার করা যাবে না যেখানে সেগুলোকে সম্মান বা পূজা করা হয়।
- ছবিগুলো এমন কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না যা শরিয়তে হারাম (যেমন: কোনো হারাম বিজ্ঞাপন, অশ্লীল শিল্প ইত্যাদি)।
- যদি ছবি আঁকার সময় ভুলবশত কোনো প্রাণীর ছবি তৈরি হয়ে যায়, তাহলে সেটা এড়িয়ে চলতে হবে।
- টেক্সচার আর্ট বা ক্রাফটিং-এ যদি এমন কিছু ব্যবহার করা হয় যা নাপাক বা হারাম (যেমন: শুকরের চামড়া, সোনার প্রলেপ ইত্যাদি), তাহলে সেটা জায়েজ হবে না।
৫. আধুনিক প্রেক্ষাপটে ফতোয়া: আধুনিক যুগের প্রখ্যাত হানাফি আলেম মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) এবং মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম)-এর মতে, ফুল, ফল, প্রাকৃতিক দৃশ্য, নিস্প্রাণ বস্তুর ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি করা, ক্রাফটিং করা সম্পূর্ণ জায়েজ। এমনকি ডিজিটাল আর্ট, গ্রাফিক ডিজাইন, টেক্সচার আর্ট ইত্যাদিও জায়েজ, যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে প্রাণবন্ত প্রাণীর ছবি না থাকে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪র্থ খণ্ড, ২৯৫ পৃষ্ঠা; ফাতাওয়া উসমানি, ২য় খণ্ড, ৪২৫ পৃষ্ঠা)
সারকথা: আপনি নিশ্চিন্তে ফুল, ফল, প্রাকৃতিক দৃশ্য, টেক্সচার আর্ট, ক্রাফটিং ইত্যাদি করতে পারেন। এটি সম্পূর্ণ জায়েজ এবং বৈধ। শুধু প্রাণবন্ত প্রাণী (মানুষ, পশু-পাখি) আঁকা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।